করোনার কারণে গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দুই মাস আগে থেকে ঈদ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বড় প্রস্তুতি নিয়েছে পোশাক-জুতাসহ স্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো। তবে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সরকারের লকডাউন ঘোষণায় বড় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন স্থানীয় এসব উদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে এবার ঋণ করে বৈশাক ও ঈদের বাজার কেন্দ্রীক বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। তবে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং এর প্রেক্ষিতে লকডাউন সহ উৎবের পরবেশ ছোট হয়ে আসায় তাদের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠাতো সম্ভবই হবে না, উল্টো তারা আরও গভীর খাদে পড়ে যাবেন। বাংলাদেশে স্থানীয় ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর বাজারের আকার ৩০ হাজার কোটি টাকার বড়। এই বাজারের ৭৫ শতাংশ বেচা-কেনা হয় ঈদ ও পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রীক। গতবছর করোনা মহামারির কারণে সারাদেশে অঘোষিত লকডাউন থাকায় এই বাজার ধরেত পারেননি উদ্যোক্তারা। পুঁজি হারিয়ে অনেককে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। এবারও উৎসবগুলোর আগ মুহূর্তেই করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং সরকারকে লকডাউনসহ কঠোর বিধিনিষেধের পথে হাটতে হচ্ছে। যে কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ফ্যাশন খাতের স্থানীয় উদ্যোক্তারা। সারাদেশে বিক্রিত স্থানীয় পোশাকের ৭০-৮০ শতাংশের যোগান দেয় ঢাকার কেরানীগঞ্জসহ বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকার উৎপাদকরা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মূল পরিকল্পনা থাকে রোজার ইদকে ঘিরেই। উৎপাদিত পোশাকের ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় ইদ-উল ফিতরে। এখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইদের সময় দুই মাসের ব্যবসায় সব ক্ষতি পুষিয়ে একবছর চলার অবলম্বন পান তারা। করোনার কারণে গত বছর ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কারখানা-শো রুমের ভাড়া, শ্রমিকদের বেতন, মেশিনারি ও কাঁচামাল ক্রয় এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে বিপাকে পড়েছেন তারা। কেরানীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটে নিজের কারখানার জিন্সপ্যান্ট পাইকারি বিক্রি করেন গোলেনুর গার্মেন্টেসের মালিক মুক্তার দেওয়ান। ২০১৯ সালের ইদে আড়াই কোটি টাকার জিন্স প্যান্ট বিক্রি করলেও গত বছর তা ছিল মাত্র ২৫ লাখ টাকা। এবার ঈদের জন্য ৩ কোটি টাকার পোশাক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেন তিনি। মোক্তার দেওয়ান বলেন, ‘গত বছর বিক্রি করতে না পারায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ও মূলধন ভেঙ্গে শ্রমিকদের বেতন দিয়েছি, পরিবারের খরচ চালিয়েছি। অনেক কষ্টে কারখানার ও শো-রুমের ভাড়া পরিশোধ করে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। পহেলা বৈশাখ ও ঈদের আগের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আবারও যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে তাতে আমাদের বুঝি বেঁচে থাকার আর পথ থাকলো না। মোক্তার দেওয়ানের মতোই এখানকার প্রায় ১০ হাজার ব্যবসায়ী ও ৫ হাজারের বেশি কারখানার কারখানা মালিকের কারখানা ও বিক্রয় কেন্দ্রে ব্যবসার গতি কমে এসেছে। স্থানীয় পোশাক উৎপাদনের বড় প্রতিষ্ঠান মুসলিম কালেকশনের স্বত্তাধিকারী ও কেরাণীগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মুসলিম ঢালী জানান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও গত বছরের লোকসান কাটাতে এবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখানকার সব কারখানায় শ্রমিকরা রাত-দিন কাজ করছেন। তবে সরকারের ঘোষিত লকডাউনের মেয়াদ যদি বাড়ে তাহলে আমাদের ব্যবসায়ীদের মাঠে মারা যেতে হবে। দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিও বাড়ে ইদ ও পহেলা বৈশাখের সময়। গত বছরের তুলনায় এবারের প্রস্তুতি বেশি বলে জানিয়েছে প্রায় সবগুলো ব্র্যান্ড। ইয়েলোর হেড অব রিটেইল অপারেশন হাদি চৌধুরী জানান, করোনার কারণে মানুষ গত এক বছর সেভাবে পোশাক-আশাকের পেছনে ব্যয় করেননি। তাই এবার প্রত্যাশা বেশি ছিল। সে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশি পরিমাণে পোশাক তৈরি করেছে। এখন সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ও সরকারের পক্ষ থেকে লকডাউনের ঘোষণা আসায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায় আমরা বুঝতে পারছি না। করোনা মহামারির কারণে গত বছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখ ও ইদ-উল ফিতরের উৎসব সীমিত হয়ে গেলে ফ্যাশন হাউসগুলো ৬-৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ফ্যাশন ডিজাইনার অ্যসোসিয়েশনের সভাপতি ও অঞ্জনস শোরুমের স্বত্তাধিকারী শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এ বছর অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করা। ঈদেও ৪/৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এসব পণ্য উৎপাদনে কয়েক মাস আগেই প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এখন করোনা পরিস্থিতির কারণে উৎসব বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা সীমিত হয়ে গেলে দেশিয় উদ্যোক্তারা অস্তিত্বের সংকটে পড়বেন। দেশিয় উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে সরকারকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে কার্যকরি উদ্যোগ নিতে হবে। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সাথে দেশে অত্যন্ত ২৫ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। পহেলা বৈশাখে তাদের প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতিবছর পুরো দেশজুড়ে নববর্ষের মেলা হয়। তবে মহামারির কারণে মেলা আয়োজনের নিষেধাজ্ঞা এখনো উঠিয়ে নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বাংলা একাডেমিতে ১০ দিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ওই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় শতাধিক উদ্যোক্তা স্টল দিয়ে বসেন। ওই ১০ দিনে একজন উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা পর্যন্তও মুনাফা করেন। কিন্তু গত বছরের মতো এবারও মেলা বাতিল হলে বড় ধরণের ক্ষতির মধ্যে পড়বেন বুটিক থেকে শুরু করে জামদানি শাড়ি, ফার্নিচার, জুতাসহ স্থানীয় ফ্যাশন সামগ্রী বিক্রি করা কয়েক লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।
০২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
আতঙ্কে ফ্যাশন খাতের উদ্যোক্তারা
-
এ. আর আকাশ - প্রকাশিত : ১২:০১:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ এপ্রিল ২০২১
- 51
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















