১০:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

শঙ্কায় আমদানি বাণিজ্য

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার শঙ্কায় পড়েছে দেশের আমদানি বাণিজ্য। করোনার প্রথম ধাক্কার প্রকোপ কমে যাওয়ার পরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় গত চার মাস ধরে পণ্য আমদানি বাড়লেও দ্বিতীয় ধাক্কায় আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে যেমন দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি আমদানি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশিল ব্যবসায়ী ও কর্মীবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যাংকগুলোর কমিশন আয় কমে যাবে।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি খাতে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম মাস জানুয়ারিতে গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এছাড়া, গত বছরের শেষ দুই মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৫ ও ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। চার মাসের এই প্রবৃদ্ধির কারণে অনেক দিন পর সার্বিক পণ্য আমদানিতে প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে বাংলাদেশ।
আমদানি-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট ৪০ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। এই অঙ্ক গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আমদানি ব্যয় শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ কম ছিল।
গত অর্থবছরে দেশে ৫৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। করোনার প্রথম ধাক্কার কারণেই আমদানিতে এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
আমদানি বাড়াকে অর্থনীতির জন্য ‘সুখবর’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমদানি বাড়া মানে বিনিয়োগ বাড়া, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হওয়া। এতেই প্রমাণিত হয়, কোভিড-১৯ এর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। তবে দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউয়ের কারণে আমদানি বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয়, তাহলে শিল্পকলকারখানায় উৎপাদন কমে যাবে। স্বাভাবিক কারণে আমদানিও কমবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত আমদানি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার আগে ২০২০ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৫৩৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। পরের দুই মাস ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আমদানি হয় যথাক্রমে ৪৭২ কোটি ৩৭ লাখ ও ৪২৭ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য। এরপরই লাগে মহামারির ধাক্কা। সেই ধাক্কার মধ্যে এপ্রিলে আমদানি ব্যয় ২৮৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে নেমে আসে, যা ছিল রেকর্ড সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২০ সালের মে মাসে ৩৫৩ কোটি ৩৪ লাখ ও জুন মাসে ৪৮০ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৪২২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়। আগস্টে হয় ৩৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আমদানি খাতে ব্যয় হয় যথাক্রমে ৪৬৫ কোটি ২৫ লাখ এবং ৪৩৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। নভেম্বরে তা ৪৮১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ডিসেম্বরে আমদানি খাতে খরচ হয়েছে ৫৩৮ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। জানুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৭২৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলারে পৌঁছায়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাসে সবচেয়ে বেশি আমদানি ব্যয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।
দেশের আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ হয় ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে। এর মানে, কাঁচামাল আমদানি করে ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রস্তুত করে রপ্তানি করা হয়। এ কারণে আমদানি বাড়লে রপ্তানিতে তার প্রভাব পড়ে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত মার্চে রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রফতানি আয় গতবছরের তুলনায় কম হয়েছে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ।
আমদানি বৃদ্ধির সময়ে রপ্তানি কম থাকলে সাধারণভাবে ডলারের ওপর চাপ তৈরির কথা। তবে প্রবাসী রেমিট্যান্সে মার্চ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় অপরিবর্তিত আছে। আর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ গত এক বছরে প্রায় ১১ বিলিয়নের বেশি বেড়ে ৭ এপ্রিল ৪৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, কোভিড-১৯ এর কারণে আমদানি অনেক কমে গিয়েছিল। এখন বাড়তে থাকায় স্বস্তি ফিরে আসছে। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের আমদানি কমে গিয়েছিল। এখন সবই বাড়তে শুরু করেছে। এটা একটা ভালো খবর। তবে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, চিনিসহ কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি খরচ কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

জামালপুরে ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

শঙ্কায় আমদানি বাণিজ্য

প্রকাশিত : ১২:০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার শঙ্কায় পড়েছে দেশের আমদানি বাণিজ্য। করোনার প্রথম ধাক্কার প্রকোপ কমে যাওয়ার পরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় গত চার মাস ধরে পণ্য আমদানি বাড়লেও দ্বিতীয় ধাক্কায় আমদানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে যেমন দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি আমদানি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশিল ব্যবসায়ী ও কর্মীবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যাংকগুলোর কমিশন আয় কমে যাবে।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি খাতে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম মাস জানুয়ারিতে গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এছাড়া, গত বছরের শেষ দুই মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৫ ও ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। চার মাসের এই প্রবৃদ্ধির কারণে অনেক দিন পর সার্বিক পণ্য আমদানিতে প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে বাংলাদেশ।
আমদানি-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট ৪০ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে। এই অঙ্ক গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি। জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আমদানি ব্যয় শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ কম ছিল।
গত অর্থবছরে দেশে ৫৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। করোনার প্রথম ধাক্কার কারণেই আমদানিতে এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
আমদানি বাড়াকে অর্থনীতির জন্য ‘সুখবর’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমদানি বাড়া মানে বিনিয়োগ বাড়া, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হওয়া। এতেই প্রমাণিত হয়, কোভিড-১৯ এর ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। তবে দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউয়ের কারণে আমদানি বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয়, তাহলে শিল্পকলকারখানায় উৎপাদন কমে যাবে। স্বাভাবিক কারণে আমদানিও কমবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত আমদানি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার আগে ২০২০ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৫৩৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। পরের দুই মাস ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আমদানি হয় যথাক্রমে ৪৭২ কোটি ৩৭ লাখ ও ৪২৭ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য। এরপরই লাগে মহামারির ধাক্কা। সেই ধাক্কার মধ্যে এপ্রিলে আমদানি ব্যয় ২৮৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে নেমে আসে, যা ছিল রেকর্ড সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২০ সালের মে মাসে ৩৫৩ কোটি ৩৪ লাখ ও জুন মাসে ৪৮০ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৪২২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়। আগস্টে হয় ৩৮০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আমদানি খাতে ব্যয় হয় যথাক্রমে ৪৬৫ কোটি ২৫ লাখ এবং ৪৩৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। নভেম্বরে তা ৪৮১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। ডিসেম্বরে আমদানি খাতে খরচ হয়েছে ৫৩৮ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। জানুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৭২৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলারে পৌঁছায়, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাসে সবচেয়ে বেশি আমদানি ব্যয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।
দেশের আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ হয় ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে। এর মানে, কাঁচামাল আমদানি করে ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রস্তুত করে রপ্তানি করা হয়। এ কারণে আমদানি বাড়লে রপ্তানিতে তার প্রভাব পড়ে। আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত মার্চে রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রফতানি আয় গতবছরের তুলনায় কম হয়েছে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ।
আমদানি বৃদ্ধির সময়ে রপ্তানি কম থাকলে সাধারণভাবে ডলারের ওপর চাপ তৈরির কথা। তবে প্রবাসী রেমিট্যান্সে মার্চ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় অপরিবর্তিত আছে। আর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ গত এক বছরে প্রায় ১১ বিলিয়নের বেশি বেড়ে ৭ এপ্রিল ৪৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, কোভিড-১৯ এর কারণে আমদানি অনেক কমে গিয়েছিল। এখন বাড়তে থাকায় স্বস্তি ফিরে আসছে। শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের আমদানি কমে গিয়েছিল। এখন সবই বাড়তে শুরু করেছে। এটা একটা ভালো খবর। তবে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল, চিনিসহ কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি খরচ কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।