কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই গত বছর প্রায় ছয় মাস ধরে টানা বেড়ছে বিমা খাতের সবগুলো শেয়ারের দাম। এই সময়ে প্রতিটি বিমা কোম্পানির শেয়ারমূল্য দুইগুণ থেকে আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। লকডাউনের মধ্যে পুঁজিবাজারে যে এবার চাঙাভাব, তার পেছনে আছে সেই বিমা খাতের সাধারণ বিমার শেয়ার। পুরো খাতের শেয়ারদর বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিমা খাতের শেয়ার নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। বীমা খাতের শেয়ার নিয়ে কী হচ্ছে তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।
গত বছর বিমা কোম্পানির শেয়ারে দরবৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু গুজব কাজ করছিল। এজেন্টের কমিশন কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ ও গাড়ির তৃতীয় প¶ের বিমা বাতিল করে প্রথম প¶ের বিমা চালু হলে আয় বাড়বে, লভ্যাংশ বাড়বে, এমন কথা বলাবলি হয়। এরপর আলোচনায় আসে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় বড় প্রকল্প বিমার আওতায় আসছে। এগুলোর ঝুঁকি একেবারেই কম; কোম্পানির লাভ হবে ভালো। তবে পরে জানানো হয়, মেট্রোরেল সরকারি সাধারণ বিমা করপোরেশনের আওতায় থাকবে। এটি পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত নয়। আবার ১০ বছর আগের একটি সার্কুলার সামনে এনে স্যোশাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হয় যেখানে বলা ছিল, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ থাকতে হবে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। এমনটি হলে বিমা কোম্পানির শেয়ার মালিকদের নিজেদেরই কিনতে হবে। কিন্তু আয় বা লভ্যাংশ বাড়ার গুজব সত্য প্রমাণ হয়নি। পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ নিজেদের হাতে রাখার যে আইন করার কথা বলা হয়েছে, সেটিও কার্যকর হয়নি। তবু আবার ঢালাও দাম বৃদ্ধিতে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। টানা দুই-তিন দিন দর বাড়ার পর কিছুটা মূল্য সংশোধন। তারপর আবার উত্থান। এভাবে লকডাউনে চলছে বিমার শেয়ারের লেনদেন।
আবার দাম বাড়ার ¶েত্রে আরও কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। মৌলভিত্তির শক্তিশালী কোম্পানি হিসেবে পরিচিত, প্রতিবছর ভালো মুনাফা করে আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দেয়া কোম্পানির তুলনায় দাম বেশি হচ্ছে দুর্বল কোম্পানির, যেগুলোর মুনাফা দেয়ার হার কখনো ভালো ছিল না। ৫২ টাকা ৬০ পয়সা সম্পদমূল্য আর গত পাঁচ বছরে কখনো ২৫ শতাংশের কম লভ্যাংশ না দেয়া রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের দাম ৫৭ টাকা ৪০ পয়সা। গত পাঁচ বছরে এই কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় সর্বনিম্ন ছিল ৪ টাকা ৪৩ পয়সা। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরের মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়া প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের দাম এখন ১২৫ টাকা ৬০ পয়সা। এটি আবার ১৭ শতাংশ বোনাস শেয়ার সমন্বয়ের পর। এই কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ১৯ টাকার কম। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি সদ্য সমাপ্ত বছরেই শেয়ারপ্রতি সর্বোচ্চ আয় করেছে ৩ টাকা ১০ পয়সা। গত ছয় বছরের মধ্যে পাঁচ বছরে একবার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়ে এবার ২০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করা প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের দাম এখন ১০৫ টাকা ২০ পয়সা। অথচ এর সম্পদমূল্য রিলায়েন্সের অর্ধেকও না।
ফেব্রুয়ারিতে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪৬ টাকা ৫০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৩৩ টাকা ২০ পয়সা। এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ৫৩ টাকা ৩০ পয়সা। এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩৭.৭১ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ১৩৮ টাকা ৯০ পয়সা। মার্চে দর কমে দাঁড়িয়েছিল ৯৪ টাকায়। এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ১০৫.৫ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটর শেয়ারদর বেড়েছে ১০৯ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৯২ টাকা ৮০ পয়সা। মার্চে দর কমে দাঁড়িয়েছিল ৫০ টাকা ৯০ পয়সা। এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৭১ টাকা ৩ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে বিজিআইসির দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪৬ টাকা ৫০ পয়সা। সেটির দর মার্চে কমে দাঁড়িয়েছিল ৩৭ টাকা ৮০ পয়সা। এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৪২ টাকা ৯০ পয়সা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১১.৮৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে বিএনআইসিএলের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৭৫ টাকা ৯০ পয়সা। মার্চে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমে দাঁড়িয়েছিল ৩৭ টাকা ৮০ পয়সা। শতকরা হিসাবে কোম্পানিটি দর হারিয়েছিল ৫০.১৯ শতাংশ। এপ্রিলে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ১০৯ টাকায়। ফলে এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৬৫.৩২ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৬৭ টাকা ৪০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৫৮ টাকা ৩০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৬০ টাকা ৪০ পয়সা। এক মাসে শতকরা হিসাবে দর বেড়েছে ৩.৪৭ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৩৫ টাকা ৮০ পয়সা। মার্চে দর কমে দাঁড়িয়েছিল ২৩ টাকায়। এপ্রিলে এসে লেনদেন হচ্ছে ২৮ টাকা ৮০ পয়সা। এক মাসে শতকরা হিসাবে দর বেড়েছে ২০.১৩ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৬৪ টাকা ৯০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৩০ টাকা ৩০ পয়সায়। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৪৪ টাকা ৩০ পয়সা। এক মাসে শতকরা হিসাবে দর বেড়েছে ৩১.৬০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৩৪ টাকা ১০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৫২ টাকা ৩০ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির শতকরা শেয়ারদর বেড়েছে ৩৪.৭৯ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৬১ টাকা ৫০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৩৯ টাকা ৮০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৬২ টাকা ৪০ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর শতকরা বেড়েছে ৩৫.৯৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ১১৯ টাকা ৮০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৯০ টাকায়। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ১১৬ টাকা ১০ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির দর বেড়েছে ২২.৪৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪৩ টাকা ৮০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ২৭ টাকা ৩০ পয়সায়। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা। এক মাসে শতকরা হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ১৮.৭৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪৫ টাকা ৯০ পয়সা। মার্চে সে কোম্পানির শেয়ারদর কমে হয়েছিল ২৪ টাকা ৩০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৩৩ টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ২৬.৩৬ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৩০ টাকা ৯০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ১৮ টাকা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ২৭ টাকা ৬০ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৩৪.৭৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে গোবাল ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৬৯ টাকা ৫০ পয়সা। মার্চে দর কমে হয়েছিল ৩০ টাকা ২০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৪১ টাকা ১০ পয়সা। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৬.৫২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৭৩ টাকা ৪০ পয়সা। মার্চে শেয়ারদর কমে হয়েছিল ৫৫ টাকা ৭০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৫৬ টাকা ১০ পয়সা। এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের দর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪৭ টাকা ৭০ পয়সা। মার্চে শেয়ারদর কমে হয়েছিল ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা। এপ্রিলে লেনদেন হচ্ছে ৫১ টাকায়। এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৮.৪৩ শতাংশ।
এভাবেই বিমা খাতের প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে।





















