ভালো নাই গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার মৃৎ শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররা। ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে নিপুণ হাতের কারুকাজের মাধ্যমে মাটি দিয়ে শিল্পীরা তৈরি করে থাকেন নানান তৈজসপত্র।তাদের জীবন-জীবিকার হাতিয়ার হচ্ছে মাটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে তাদের ভালোবাসার জীবিকা বিলুপ্তি হতে চলেছে।দিন যতই যাচ্ছে ততই বাড়ছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়,চাহিদা হারাচ্ছে মাটির তৈরি শিল্পপণ্য। একসময় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের প্রচুর চাহিদা ছিল।কিন্তু এখন মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা হারিয়ে স্থান দখল করে নিয়েছে এ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈরি পণ্য। এসবের দাম বেশিহলেও টেকসই হওয়ায় সবাই ঝুঁকছে সেই দিকেই। আর তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছে বাপ-দাদার ধরে রাখা এই পেশা।
কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় মাটির সামগ্রী প্রায় বিলুপ্তি হলেও এখনও কিন্তুু কিছু মৃৎশিল্পরা ধরে রেখেছে মাটির তৈরির ঐতিহ্য তৈজসপত্র।
সরেজমিনে বুধবার (২৯ এপ্রিল) সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের রসুলপুর (পালপাড়া) গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাটির পণ্য থালা-বাটি, সরা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, প্রভৃতি জিনিসপত্র তৈরির চিত্র। জানা যায়, দেড় দশক আগে রসুলপুরের পালপাড়া এলাকাস্থ প্রায় ২শ পরিবারের একমাত্র পেশা ছিল মাটির পণ্যসামগ্রী তৈরি। এ পেশা দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। চলছিল তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় কদর কমেছে এ শিল্পের। যার ফলে এ পেশা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে অধিকাংশ পরিবার। এখন মাত্র ৭টি পরিবার কোনোমতে ধরে রেখেছে তাদের বাপ-দাদার পেশাটি। মৃৎশিল্পের কারিগররা জানান, বিভিন্ন স্থান থেকে দোআঁশ মাটি সংগ্রহ করতে হয়। এসব মাটিও কিনতে হয় টাকা দিয়ে। এক ভ্যান মাটির দাম ৫’শ টাকা। এসব মাটি দিয়ে থালা-বাটি, সরা-বাসন,বাটনা, পুতুল, পাট,টবসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে থাকেন। একটি চাকের মাধ্যমে কাদামাটিতে বানানো হয় পণ্যসামগ্রী। এরপর রোদে শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো হয় ভাটায়। সেখান থেকে বের করে রং তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলায় বিশেষ পণ্যগুলো। সেগুলো বাজারজাতে নিতে আসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় নিজেরাই ভ্রাম্যমাণভাবে বিক্রি করে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এতে যেটুকু আয়-রোজগার আসে, তা দিয়ে চলে তাদের সংসার। মাটির পণ্য তৈরির কারিগর তপন চন্দ্র পাল জানায়, অতীতে গ্রাম-গঞ্জে মাটির তৈরি পণ্যসামগ্রীর কদর ছিল অনেক বেশি। এসব পণ্য শোভা পেত প্রত্যেক বাড়িতে। এছাড়া গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিমা, প্রতিকৃতি, ফুলের টপসহ অসংখ্য জিনিস আজও তৈরি করে ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আরেক মৃৎ কারিগর আনন্দ চন্দ্র পাল বলেন, আমাদের এ গ্রামে প্রবেশ পথটি কাঁচা হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা একদম করুণ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে শত শত গর্তে পরিণত হয়। আর বর্ষাকালে সৃষ্টি হয় হাঁটুকাদা। যার কারণে তৈরি করা সামগ্রীগুলো বাজারজাত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া টানা এক বছরে করোনার থাবায় থমকে গেছে পণ্যসামগ্রী বানানোর কাজ। বিদ্যমান পরিস্থিতির শিকার হলেও, কোনো ধরনের প্রণোদনার সুবিধা আমাদের কপালে জোটেনি। তাই বাজার-জাত মূল্যের সাথে টিকে থাকতে না পাড়ায় অনেকেই আর এ পেশায় কাজ করতে আগ্রহ নেই। তারা নানা পেশায় জরিয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, এখন এটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত জরুরি। কেননা, সরকার যদি মৃৎশিল্প গোষ্ঠীকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে সহায়তা দিতে পারে, তাহলে এ শিল্পে টিকে থাকা সম্ভব। রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান রবিউল করিম দুলা বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে মৃৎশিল্পীরা এ পেশা থেকে ছিটকে পড়ছে। এরই মধ্যে করোনার প্রণোদনার বরাদ্দ পেলে তাদের সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর




















