০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অনন্য নজির

বৈশ্বিক মহামারি করোনা কালে বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত প্রায় সকল দেশের স্বাস্থ্য, চিকিৎসার ভঙ্গুর ও দৈন্যদশা বিশ্বাবাসির সামনে ফুটে ওঠেছে। অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, অপর্যাপ্ত শয্যা, অপর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেনের সংকট সর্বত্র কমবেশী লক্ষ্য করা গেছে। করোনায় আক্রান্ত এবং তাদের স্বজনরা এই দৈন্যদশা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। বাংলাদেশও এই সময়ের স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা নিয়ে নানান মত রয়েছে। তবুও উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোন কোন ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। এ পর্যায়ে রাজধানীর কয়েকটি বিশেষায়াতি হাসাপাতালের পরিবেশ, রোগীদের চিকিৎসা-সেবায় অনন্য উজ¦ল দৃষ্টান্ত রয়েছে। এসব হাসপাতাল এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের ওপর রোগীদের আস্থা ও ভরসা বেড়েছে। অবশ্য হাসপাতালের চিকিৎসা, পরিবেশসহ নানা রকম অব্যবস্থার খবর প্রায়শই পত্রিকার শিরোনাম হতে দেখা গেলেও তার সব টুকুই যে সত্য তা হলফ করে বলা যাবেনা। কারণ কোন একটি হাসপাতালে রোগীর স্বাস্থ্য সেবা বাস্তবে কতটুকু রোগী বান্ধব তা একমাত্র চিকিৎসা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনারা অনুধাবন করতে পারেন। নিজে যখন হ্নদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাসপাতাল নিয়ে.চিকিৎসক, নার্স নিয়ে তথা ঐ হাসপাতালের পুরোস্বাস্থ্য সেবাকে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মাত্রায় উপলব্দি করার সুযোগ হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারী রাজধানীর জাতীয় হ্নদরোগ ইনস্টিটিটিউট ও হাসাপাতালে ভর্তি হয়ে একটানা ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮ দিনের চিকিৎসায় এ সম্পর্কে বিগত দিনের নেতিবাচক ধারনার অনেকটাই উল্টো চিত্র ফুটে ওঠেছে। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা যে কোন রোগী রোগ নিরাময়ের প্রত্যাশা নিয়েই ভর্তি হয়। এ ক্ষেত্রে মুমুর্ষ রোগী হলেও আশ্ াকরে সুস্থ্য হয়ে ফিরবে বাড়ি। কিন্তু এ অবস্থায় কোন মুমুর্ষ রোগীও যদি মৃত্যুবরন করে তাহলে তার স্বজনদের কাছে সেটা প্রত্যাশিত থাকেনা, তারা বিক্ষুদ্ধ মর্মাহত হন এবং তাদের এ অনুভব হওয়াই স্বাভাবিক।
ঢাকার শেরে বাংলানগরে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এ হাসপাতালে হার্টেও প্রায় সব ধরনের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ইনন্টিটিউিট প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশে হার্টের চিকিৎসায় ডা. আব্দুল মালিক ছিলেন মহীরূহের মতো। এ ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর অবদান অনেক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সময়কে ‘এ জার্নি বাই হ্নদরোগ হাসপাতাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। দীর্ঘ এই জার্নিতে আমার চিকিৎসা সেবা চলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা.মীর জামাল উদ্দীনের অধীনে। তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট হ্নদরোগ বিশেষজ্ঞ নয় একই সাথে সুদক্ষ প্রশাসক, একজন মানবিক, উদার, রোগী বান্ধব, সেবায় অনন্য একজন ডাক্তারও। ক্যাথল্যাবে রোগীকে আন্তরিক ব্যবহার দিয়ে রোগীর মনে যাতে ভীতিকর, শংকা না আসে সে জন্য গল্প করতে করতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে হার্টের রিং পরানোসহ সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন করার কৌশল সত্যিই ডাক্তার জামালের মানবিকতা, সেবার ও আন্তরিকতার বহি:প্রকাশ। তাঁর সুদক্ষ নের্তৃত্ব, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ যাবতীয় কার্যক্রম মনিটরিং, রোগীদের স্বাস্থ্যের হালনাগাদ খোঁজখবর চলে। এখানে স্থান সংকুলান না হলেও বারান্দায় বেড দিয়ে আগত রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে কেবিন, পেইং বেডসহ প্রতিদিন গড়ে এগারশ থেকে বারশ এবং বহি:বিভাগে প্রায় হাজার রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। আসছে জুন নাগাদ নব নির্মিত সম্প্রসারিত ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে কেবিন, পেইং বেড, নন পেইং বেড সহ শর্য্যা সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৫০ এ। বর্তমানে এখানে ৪৫০ ডাক্তার, প্রায় এক হাজার নার্স চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
হাসপাতালে খাবারের মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় নেতবাচক সংবাদ চোখে পড়ে। কিন্তু এ হাসাপাতালে খাবারের তালিকায় সকালে পাওয়া রুটি, জেলি, কলা, ডিম দুপরে ভাতের সাথে ডাল, সব্জি মাছ অথবা মুরগির মাংস, রাতে ডায়বেটিস রোগীর জন্য রুটি, ডাল, সব্জি মুরগির মাংস অথবা মাছ সঙ্গে ল্যাকক্সাস বিস্কুট এক প্যাকেট। সাধারণ রোগীর জন্য রুটি ছাড়া ভাতের সঙ্গে উরোক্ত ম্যানু সমান ভাবে পরিবেশন করা হয়। সাধারণত বাসা বাড়িতে যেরকম তেল, মসল্লা দিয়ে মাছ মাংস রান্না হয় হাসপাতালে রোগীর জন্য সে রকম হয়না। কাজেই হাসপাতালের খাবারের স্বাদে কিছুটা কমতি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এ খাবারকে নিন্ম মানের বলা যাবেনা।
২০১৯ সালের ২৫ জুলাই তিনি পরিচালক পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এ হাসপাতালকে রোগীদের আস্থা, বিশ্বাস ও অন্যতম ভরসার স্থলে পরিণত করতে নিত্য নতুন পরিকল্পনা, আধুনিক চিকিৎসা সরাঞ্জাম সংগ্রহ এবং অধিক রোগীর সেবা দিতে পরিচালনা করছেন নতুন ভবন নির্মাণ কাজ। এ হাসপাতালে হ্নদরোগের চিকিৎসা সেবায় নিবেদিত রয়েছেন একঝাঁক মেধাবী, দক্ষ, মানবিক, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিয়োজিত টেকনেশিয়ান, প্যাথলজিস্ট। রাত দিন পালা ক্রমে তারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ পর্যায়ে পরিচালক ডা.মীর জামাল উদ্দীনের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। তাঁর সহজ সরল, আন্তরিক, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সেবা সুলভ মানসিকতা, শত কাজের ব্যবস্থর মধ্যেও রোগীর সেবা পরম ধর্ম, পবিত্রতম দায়িত্ব হিসেবে প্রতিটি কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সূচারু রুপে সম্পন্ন করার গৌরবও তাঁর। ঠিক একই মানসিকতা, মানবিকতা ও সেবার ব্রত পালনে তিনি উজ্জীবিত করেছেন তার টীমের অন্য চিকিৎসক, নাসসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারির মধ্যে।
হাসপাতালের ৭ নং ওয়ার্ডের ৩১ নম্বর বেড়ে ১৮ দিবস রজনী চিকিৎসা গ্রহন কালে মনে হয়েছে পারিবারিক পরিবেশে বন্ধু স্বজন বেষ্ঠিত হয়ে ছিলাম। রোগীর এ্যাটেনডেন্টস হিসেবে রোগীর সাথে তাদের নিকটজন থেকেছেন, অথবা প্রায়শই দেখা করতে এসেছেন। আমার স্ত্রী, ছেলে মেয়েসহ বন্ধু, সতীর্থ, আত্মীয়স্বজনের অনেকেই এসেছেন, কেউ কেউ থেকেছেন। এসময় এক রোগীর সাথে অন্য রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আলাপচারিতা, নিজেদের সুখ, দু:খ শেয়ার করা, রোগীর জন্য বাসা থেকে আনা ভাল খাবার, ফল, ফলাদি অন্য রোগীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেয়ার এক মহতী উদ্যোগে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। হাসপাতালের বাইরে কোন রোগী বা তার স্বজন কিছু কিনতে গেলে বের্ডের অন্য রোগীদের কিছু আনতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করে তার ব্যবস্থা করা সত্যি পারিবারিক পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ পর্যায়ে ৩৪ নম্বর বেডের শ্রী স্বপন চন্দ্র দেবনাথ, ৩৬ নম্বরের মো: রিপন, ৩২ নম্বরের চিরকুমার মামুন কবীর হীরা, ৩৩ নম্বরের গিয়াস উদ্দিন (তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা বন্ধুবর জাহাঙ্গীর আলমের ভগ্নিপতি। হাসপাতাল থেকে রিলিজের কয়েকদিন পর নিজ বাসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন)। এদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে বিদায় বেলায় একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায়ের আবেগঘন দৃশ্য আপনজনকে বিদায় জাননোর কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয় যেন যেন এরা একে অন্যের কত আপনজন, কতটা কাছের মানুষ। হাসপাতালে একই সঙ্গে স্বজ্জন পরিবেষ্টিত পরিবেশ সৃষ্টির অনন্য নজির এটি। এরকম স্বজ্জন, অত্যন্ত আপনজনের ভ‚মিকায় এখানে ভর্তি, চিকিৎসা, বেড পাওয়া, ক্যাথল্যাবে নেয়া, সেখানে এনজিও গ্রাম ও হার্টের রিং পরানো শেষে সিসিইউতে স্থানান্তর পরবর্তীতে এখান থেকে রিলিজ হওয়া পর্যন্ত অত্র হাসাপাতালে কর্মরত সিনিয়র টেকনোলজিষ্ট সর্বদা পরোপকারি সেলিম মোল্লার নিরন্তর শ্রম ও আন্তরিক উদ্যোগ আমাকে বিমোহিত করেছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে বর্তমান পরিচালকের নের্তৃত্বে স্বাস্থ্য সম্মত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরো বেশী দৃষ্টি দেবেন। তাহলেই জনগনের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে একই সঙ্গে দেশের হ্নদরোগীদের আস্থা এবং ভরসার জায়গায় পরিণতম হবে এই হাসপাতাল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: প্রধান উপদেষ্টা

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অনন্য নজির

প্রকাশিত : ০৩:০২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ মে ২০২১

বৈশ্বিক মহামারি করোনা কালে বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত প্রায় সকল দেশের স্বাস্থ্য, চিকিৎসার ভঙ্গুর ও দৈন্যদশা বিশ্বাবাসির সামনে ফুটে ওঠেছে। অপর্যাপ্ত হাসপাতাল, অপর্যাপ্ত শয্যা, অপর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেনের সংকট সর্বত্র কমবেশী লক্ষ্য করা গেছে। করোনায় আক্রান্ত এবং তাদের স্বজনরা এই দৈন্যদশা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। বাংলাদেশও এই সময়ের স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা নিয়ে নানান মত রয়েছে। তবুও উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোন কোন ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। এ পর্যায়ে রাজধানীর কয়েকটি বিশেষায়াতি হাসাপাতালের পরিবেশ, রোগীদের চিকিৎসা-সেবায় অনন্য উজ¦ল দৃষ্টান্ত রয়েছে। এসব হাসপাতাল এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের ওপর রোগীদের আস্থা ও ভরসা বেড়েছে। অবশ্য হাসপাতালের চিকিৎসা, পরিবেশসহ নানা রকম অব্যবস্থার খবর প্রায়শই পত্রিকার শিরোনাম হতে দেখা গেলেও তার সব টুকুই যে সত্য তা হলফ করে বলা যাবেনা। কারণ কোন একটি হাসপাতালে রোগীর স্বাস্থ্য সেবা বাস্তবে কতটুকু রোগী বান্ধব তা একমাত্র চিকিৎসা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনারা অনুধাবন করতে পারেন। নিজে যখন হ্নদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাসপাতাল নিয়ে.চিকিৎসক, নার্স নিয়ে তথা ঐ হাসপাতালের পুরোস্বাস্থ্য সেবাকে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মাত্রায় উপলব্দি করার সুযোগ হয়েছে। গত ২১ জানুয়ারী রাজধানীর জাতীয় হ্নদরোগ ইনস্টিটিটিউট ও হাসাপাতালে ভর্তি হয়ে একটানা ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮ দিনের চিকিৎসায় এ সম্পর্কে বিগত দিনের নেতিবাচক ধারনার অনেকটাই উল্টো চিত্র ফুটে ওঠেছে। কারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা যে কোন রোগী রোগ নিরাময়ের প্রত্যাশা নিয়েই ভর্তি হয়। এ ক্ষেত্রে মুমুর্ষ রোগী হলেও আশ্ াকরে সুস্থ্য হয়ে ফিরবে বাড়ি। কিন্তু এ অবস্থায় কোন মুমুর্ষ রোগীও যদি মৃত্যুবরন করে তাহলে তার স্বজনদের কাছে সেটা প্রত্যাশিত থাকেনা, তারা বিক্ষুদ্ধ মর্মাহত হন এবং তাদের এ অনুভব হওয়াই স্বাভাবিক।
ঢাকার শেরে বাংলানগরে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এ হাসপাতালে হার্টেও প্রায় সব ধরনের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ইনন্টিটিউিট প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশে হার্টের চিকিৎসায় ডা. আব্দুল মালিক ছিলেন মহীরূহের মতো। এ ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর অবদান অনেক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সময়কে ‘এ জার্নি বাই হ্নদরোগ হাসপাতাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। দীর্ঘ এই জার্নিতে আমার চিকিৎসা সেবা চলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা.মীর জামাল উদ্দীনের অধীনে। তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট হ্নদরোগ বিশেষজ্ঞ নয় একই সাথে সুদক্ষ প্রশাসক, একজন মানবিক, উদার, রোগী বান্ধব, সেবায় অনন্য একজন ডাক্তারও। ক্যাথল্যাবে রোগীকে আন্তরিক ব্যবহার দিয়ে রোগীর মনে যাতে ভীতিকর, শংকা না আসে সে জন্য গল্প করতে করতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে হার্টের রিং পরানোসহ সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন করার কৌশল সত্যিই ডাক্তার জামালের মানবিকতা, সেবার ও আন্তরিকতার বহি:প্রকাশ। তাঁর সুদক্ষ নের্তৃত্ব, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ যাবতীয় কার্যক্রম মনিটরিং, রোগীদের স্বাস্থ্যের হালনাগাদ খোঁজখবর চলে। এখানে স্থান সংকুলান না হলেও বারান্দায় বেড দিয়ে আগত রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে কেবিন, পেইং বেডসহ প্রতিদিন গড়ে এগারশ থেকে বারশ এবং বহি:বিভাগে প্রায় হাজার রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। আসছে জুন নাগাদ নব নির্মিত সম্প্রসারিত ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে কেবিন, পেইং বেড, নন পেইং বেড সহ শর্য্যা সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৫০ এ। বর্তমানে এখানে ৪৫০ ডাক্তার, প্রায় এক হাজার নার্স চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
হাসপাতালে খাবারের মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় নেতবাচক সংবাদ চোখে পড়ে। কিন্তু এ হাসাপাতালে খাবারের তালিকায় সকালে পাওয়া রুটি, জেলি, কলা, ডিম দুপরে ভাতের সাথে ডাল, সব্জি মাছ অথবা মুরগির মাংস, রাতে ডায়বেটিস রোগীর জন্য রুটি, ডাল, সব্জি মুরগির মাংস অথবা মাছ সঙ্গে ল্যাকক্সাস বিস্কুট এক প্যাকেট। সাধারণ রোগীর জন্য রুটি ছাড়া ভাতের সঙ্গে উরোক্ত ম্যানু সমান ভাবে পরিবেশন করা হয়। সাধারণত বাসা বাড়িতে যেরকম তেল, মসল্লা দিয়ে মাছ মাংস রান্না হয় হাসপাতালে রোগীর জন্য সে রকম হয়না। কাজেই হাসপাতালের খাবারের স্বাদে কিছুটা কমতি হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে এ খাবারকে নিন্ম মানের বলা যাবেনা।
২০১৯ সালের ২৫ জুলাই তিনি পরিচালক পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এ হাসপাতালকে রোগীদের আস্থা, বিশ্বাস ও অন্যতম ভরসার স্থলে পরিণত করতে নিত্য নতুন পরিকল্পনা, আধুনিক চিকিৎসা সরাঞ্জাম সংগ্রহ এবং অধিক রোগীর সেবা দিতে পরিচালনা করছেন নতুন ভবন নির্মাণ কাজ। এ হাসপাতালে হ্নদরোগের চিকিৎসা সেবায় নিবেদিত রয়েছেন একঝাঁক মেধাবী, দক্ষ, মানবিক, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিয়োজিত টেকনেশিয়ান, প্যাথলজিস্ট। রাত দিন পালা ক্রমে তারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ পর্যায়ে পরিচালক ডা.মীর জামাল উদ্দীনের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। তাঁর সহজ সরল, আন্তরিক, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সেবা সুলভ মানসিকতা, শত কাজের ব্যবস্থর মধ্যেও রোগীর সেবা পরম ধর্ম, পবিত্রতম দায়িত্ব হিসেবে প্রতিটি কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সূচারু রুপে সম্পন্ন করার গৌরবও তাঁর। ঠিক একই মানসিকতা, মানবিকতা ও সেবার ব্রত পালনে তিনি উজ্জীবিত করেছেন তার টীমের অন্য চিকিৎসক, নাসসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারির মধ্যে।
হাসপাতালের ৭ নং ওয়ার্ডের ৩১ নম্বর বেড়ে ১৮ দিবস রজনী চিকিৎসা গ্রহন কালে মনে হয়েছে পারিবারিক পরিবেশে বন্ধু স্বজন বেষ্ঠিত হয়ে ছিলাম। রোগীর এ্যাটেনডেন্টস হিসেবে রোগীর সাথে তাদের নিকটজন থেকেছেন, অথবা প্রায়শই দেখা করতে এসেছেন। আমার স্ত্রী, ছেলে মেয়েসহ বন্ধু, সতীর্থ, আত্মীয়স্বজনের অনেকেই এসেছেন, কেউ কেউ থেকেছেন। এসময় এক রোগীর সাথে অন্য রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আলাপচারিতা, নিজেদের সুখ, দু:খ শেয়ার করা, রোগীর জন্য বাসা থেকে আনা ভাল খাবার, ফল, ফলাদি অন্য রোগীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেয়ার এক মহতী উদ্যোগে নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। হাসপাতালের বাইরে কোন রোগী বা তার স্বজন কিছু কিনতে গেলে বের্ডের অন্য রোগীদের কিছু আনতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করে তার ব্যবস্থা করা সত্যি পারিবারিক পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ পর্যায়ে ৩৪ নম্বর বেডের শ্রী স্বপন চন্দ্র দেবনাথ, ৩৬ নম্বরের মো: রিপন, ৩২ নম্বরের চিরকুমার মামুন কবীর হীরা, ৩৩ নম্বরের গিয়াস উদ্দিন (তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা বন্ধুবর জাহাঙ্গীর আলমের ভগ্নিপতি। হাসপাতাল থেকে রিলিজের কয়েকদিন পর নিজ বাসায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন)। এদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে বিদায় বেলায় একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায়ের আবেগঘন দৃশ্য আপনজনকে বিদায় জাননোর কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয় যেন যেন এরা একে অন্যের কত আপনজন, কতটা কাছের মানুষ। হাসপাতালে একই সঙ্গে স্বজ্জন পরিবেষ্টিত পরিবেশ সৃষ্টির অনন্য নজির এটি। এরকম স্বজ্জন, অত্যন্ত আপনজনের ভ‚মিকায় এখানে ভর্তি, চিকিৎসা, বেড পাওয়া, ক্যাথল্যাবে নেয়া, সেখানে এনজিও গ্রাম ও হার্টের রিং পরানো শেষে সিসিইউতে স্থানান্তর পরবর্তীতে এখান থেকে রিলিজ হওয়া পর্যন্ত অত্র হাসাপাতালে কর্মরত সিনিয়র টেকনোলজিষ্ট সর্বদা পরোপকারি সেলিম মোল্লার নিরন্তর শ্রম ও আন্তরিক উদ্যোগ আমাকে বিমোহিত করেছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে বর্তমান পরিচালকের নের্তৃত্বে স্বাস্থ্য সম্মত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরো বেশী দৃষ্টি দেবেন। তাহলেই জনগনের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে একই সঙ্গে দেশের হ্নদরোগীদের আস্থা এবং ভরসার জায়গায় পরিণতম হবে এই হাসপাতাল।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।