নিজ পরিবারেই এখন আর সুরক্ষিত নেই মানুষ। মানবিক অবক্ষয় এত তলানিতে পৌঁছেছে যে পরিবারে এক সদস্যের হাতে নিহত হচ্ছে আর একজন। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে, বাবা ছেলেকে, ছেলে বাবাকে; এমনকি মেয়ে তার বাবা মাকে হত্যা করছে ঠাণ্ডা মাথায়। গত দু’মাসে এরকম পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বেশ কয়েকটি। এসকল হত্যাকাণ্ড সকল নৃশংসতা ছাপিয়ে গেছে। পেশাদার কিলারদেরও এতো নৃশংসভাবে হত্যা করতে দেখা যায় না, অথচ সেটাই পরিবারের আপনজন করছে অবলীলায়। পেশাদার কিলার না হয়েও হঠাৎ একজন মানুষ কীভাবে আপনজনকে এতো নিষ্ঠুরভাবে খুন করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারে প্রতিটি মানুষ দুটি বিষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকেন, একটি ভালোবাসা অপরটি ঘৃণা। ভালোবাসায় বন্ধন অটুট হয়, আর ঘৃণায় সংকট তৈরি হতে থাকে। এই থেকেই এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় হত্যাকারী দীর্ঘদিন ধরে ভালোবাসা ও ঘৃণা মাপতে থাকেন। শেষমেশ পরিবারের প্রতি তার ঘৃণার জয় হয়, তখন সে হত্যাকাণ্ড ঘটনায়। এসব হত্যাকাণ্ডে সবসময় একজনই জড়িত থাকে। খুবই কম ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি সম্পৃক্ত হয়। এসব ঘটনার সময় অপরাধী কখনও পরিণতির কথা চিন্তা করে না। কেবল তার পরিবারের সদস্যদের তিনি বেঁচে থাকার অন্তরায় মনে করেন। গত রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকার লাল মিয়া সরকার রোডের বাসায় মেহজাবিন ইসলাম মুন তার বাবা মা বোনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সে পেশাদার কোন অপরাধী না। কিন্তু তারপরও সে-ই সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়ে পুলিশকে ফোন দিয়েছে। হত্যাকারীর এমন আচরণের বিষয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’র (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। পরিবারের কোন সদস্য যখন মনে করে তার বেঁচে থাকার অন্তরায় ওই পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন সে ধীরে ধীরে পরিকল্পনা করতে থাকে। প্রথমে সে ভালোবাসা ও ঘৃণার হিসাব করে। ভালোবাসা ও ঘৃণার দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। একসময় ঘৃণার জয় হয়, তখন সে এরকম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। তখন তার মাথায় ভালো চিন্তা ও অনুভূতি কাজ করে না। হত্যার সময়ে সে অতীতের বঞ্চনা ও ঘৃণার কথা মনে করে আরও নৃশংস হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধী পালিয়ে যায় না। সে নিজে একটা পৈশাচিক আনন্দ পায়। কখনও কখনও সে হাসে, অন্যভাবে তার নৃশংস মনের অনুভূতি প্রকাশ করে।’এসব হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই অপরাধ স্বীকার করে। সে এক ধরনের জয় খুঁজে পায় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। আসলে এটি একটি অসুস্থ মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের হিসাব।
দুই মাসে ১৭ পারিবারিক হত্যাকাণ্ড : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ১৭টি পরিকল্পিত পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এক সময় দেশের কিলার গ্রুপগুলো পরিকল্পনা করে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখন পরিবারের মধ্যে প্রবেশ করেছে। মূলত সামাজিক অবক্ষয়, বিভিন্ন গেম ও সিরিয়াল মানুষকে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের দিকে উস্কে দিচ্ছে। করোনাকালে পারিবারিক সম্পর্কগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে সংকটে পড়ায় এটি আরও তীব্র হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কদমতলীর মেহজাবিন ইসলাম মুন ইতোমধ্যে তার বাবা, মা ও বোনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। সে পুলিশকে জানিয়েছে, তার মা তাদের দু’বোনকে অসামাজিক কার্যকলাপ করতে বাধ্য করায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই সে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মুন প্রাথমিকভাবে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তাকে আরও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’গত ১৯ জুন সিলেটের গোয়াইনঘাটে এক নারী ও তার দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় ওই নারীর স্বামী হিফজুর রহমানকে। সিলেট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানান, হিফজুর নিজেই তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে। এর ঠিক এক মাস আগে, গত ১৯ মে রাজধানীতে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। মহানগরীর দক্ষিণখানের সরদার বাড়ি জামে মসজিদের সেপটিক ট্যাংক থেকে আজহারুল (৪০) নামে এক গার্মেন্টসকর্মীর ছয় টুকরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে জানা যায় আজহারুলের স্ত্রী আসমার সঙ্গে মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমানের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে পরিকল্পনা করে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। এই ঘটনায় র্যাব আসমা বেগম ও আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। এর আগে, গত ২৯ এপ্রিল মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জামির্তা ইউনিয়নের চন্দনপুর গ্রামে ছেলে কাউছার হোসেন তারা বাবা সেলিম হোসেন খোকনকে পিটিয়ে হত্যা করে। ১৪ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হয়। গত ২৬ এপ্রিল মাদারীপুরে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে নিজের ছেলেকে হত্যা করে নিজেও বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। নারায়ণগঞ্জের গত ২৬ মে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করে এক স্বামী। ময়মনসিংহের ত্রিশালে গত ২২ মে ‘ডাকাত বাবাকে’ কুপিয়ে হত্যা করে তার ছেলেরা। ১ জুন বরিশালের গৌরনদীতে পরিচ্ছন্নকর্মী এক স্বামীর হাতে তার স্ত্রী খুন হন। গত ১৯ জুন রংপুরের তাজহাটে অসুস্থ বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করে তার ছেলে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে নৃশংসতায় : গত দুই মাসে কদমতলীর ঘটনাসহ সারাদেশে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে নারীদের বিরুদ্ধে যেসব হত্যার অভিযোগ ও মামলা হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই তাদের স্বামীদের হত্যার অভিযোগ। কখনও কখনও নারীদের বিরুদ্ধে সন্তানকে হত্যার অভিযোগ ওঠে, তবে সেসব ক্ষেত্রে নারী নিজেও আত্মহত্যা করেন বা করার চেষ্টা করেন। গত ৩০ এপ্রিল সিলেটের কোতোয়ালী নিজ বাসায় আনোয়ার হোসেন (৪২) নামে এক আইনজীবী নিহত হন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী শিপা বেগম (৩৫) স্বজনদের জানায়, ডায়াবেটিসের কারণে আনোয়ারের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরবর্তীতে পুলিশ তদন্তে জানা যায়, শিপার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে স্বামীকে সে নিজেই পরিকল্পনা করে হত্যা করে। এ ছাড়াও গত ১৫ এপ্রিল রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ১৪ বছরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক এক কিশোরী স্ত্রীর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে ওই স্ত্রীর হাতে খুন হন তার স্বামী। গত ৩১ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এহসান ওরফে দুলাল (৩০) নামে এক ব্যক্তিকে আয়েশা আক্তার নামে এক তার স্ত্রী অটো রিকশা থেকে কাভার্ডভ্যানের নীচে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দক্ষিণখানে আজহারুল ইসলাম হত্যার নেপথ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে থাকাসহ অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় ওঠে এসেছে পুলিশ তদন্তে। দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘এই হত্যার উদ্দেশ্য, মোটিভ সব স্পষ্ট। আসামি দু’জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে দেওয়া পুলিশের অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছাড়াও মাদকাসক্তি, সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা এবং পারিবারিক সুবিধা পাওয়া-না পাওয়া নিয়েও হত্যাকাণ্ড হচ্ছে।
ঐশীর পরে মুন: ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে তাদের মেয়ে ঐশী রহমান নিজেই রাজধানীর চামেলীবাগের বাসায় খুন করে। ঘটনার প্রায় দু’দিন পর ১৬ আগস্ট মাহফুজ ও তার স্ত্রীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৭ আগস্ট ঐশী পল্টন থানায় নিজেই আত্মসমর্পণ করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে গৃহপরিচারিকা সুমি ও তার বন্ধু মিজানুর রহমান ওরফে রনিকে আটক করে পুলিশ। এই ঘটনায় বিচারিক আদালতে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন প্রদান করে। ঐশী বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। ঐশী তার বাবা মাকে যেভাবে হত্যা করেছিল, কদমতলীর মুনও ঠিক সেভাবে তার বাবা মাকে হত্যা করে। ঐশী তার বাবা মাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। তবে ছোটভাই ঐহিকে হত্যা করেনি ঐশী। অপরদিকে মুন পরিবারের সবাইকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর শ্বাসরোধ করে বাবা মা ও ছোটবোনকে করে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘পারিবারিক আস্থার অভাব, অসম্মান করার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা ও হিংসাত্মক মনোভাবের কারণেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের সম্পর্কগুলো যখন সমাজের সামনে চলে আসে তখন আরও অনেক মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ে।’
০৮:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
পরিবারেই বেশি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০১:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুন ২০২১
- 48
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















