০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

নতুন সংকটে পোশাক শিল্প

বিশ্বের বড় রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করায় সেখানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। তবে রপ্তানি আদেশ বাড়তে থাকলেও পোশাকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দাম তো বাড়ছেই না, বরং ক্রেতা কম দর অফার করার পরও অর্ডার নিতে হচ্ছে কেবল লোকসানের পরিমাণ কমানোর জন্য। কম দরের এসব অর্ডার না নিলে শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হবে, তাতে লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (?বিজিএমইএ) পোশাকের দর কমে যাওয়ার তথ্য দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যের বরাত দিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, গত এক বছরে রপ্তানি হওয়া পোশাক পণ্যে প্রধান ২০টি পণ্যের দাম কমেছে সম্মিলিতভাবে পাঁচ শতাংশের ওপরে। আর গত পাঁচ বছরে দাম কমেছে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ। বিজিএমইএ’র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে ২০টি পোশাক আইটেমের মধ্যে ১৬টিরই দাম কমেছে, বেড়েছে বাদবাকী চারটির। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে ক্রমাগত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, এই সময়ে এ খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং বছর বছর ইনক্রিমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটির দাম বাড়ায় সার্বিকভাবে তা পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিএমইএ’র তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে পোশাকের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মজুরি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এর বাইরে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসসহ ইউটিলিটি ব্যয় এবং পরিবহন, ব্যাংক চার্জ, ল্যাব টেস্ট ইত্যাদি খাতে বেড়েছে ২৫ শতাংশ। তারা জানান, এর সঙ্গে নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে পোশাকের কাঁচামাল কটনের দর এবং শিপিং খরচ অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যাওয়া। বাড়তি ব্যয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বহন করার কথা থাকলেও এই ‘প্রাইস প্রেশার’ এর বেশিরভাগই চলে আসছে রপ্তানিকারকদের ওপর। এর ওপর গত প্রায় দেড় বছরব্যাপী করোনার ক্ষতির প্রভাব তো রয়েছেই। সবমিলিয়ে ব্যবসায়ে টিকে থাকতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির মেশিন কারখানায় স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও চলছে। বেশ কয়েকজন পোশাক খাতের উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ক্রয়াদেশ বাড়ছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন, এখনো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে অর্ডার নিতে হচ্ছে। এটি ক্রমাগত কমতির দিকে। অর্ডার নিতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাকেও দর পেছানোর কারণ বলে মনে করছেন তারা। ট্রাউজার জাতীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসিস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, ‘গত পাঁচ বছরের মধ্যে সাড়ে তিন থেকে চার বছর ধরেই পোশাকের দর কমতির দিকে’। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে কটনের দাম বাড়ার কারণে পোশাকের প্রধান কাঁচামাল ফেব্রিকের দাম বেড়ে গেছে। এটি এখনো বাড়তির দিকে। আবার ফ্রেইটসহ সার্বিকভাবে শিপিং চার্জ বেড়ে গেছে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ গুণ। এই ব্যয় আমদানিকারক দেওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। দর বৃদ্ধির এই চাপের বেশিরভাগই চলে আসছে আমাদের দিকে’। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ধরা যাক একটি টি শার্ট খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় দুই ডলারে। নতুন করে কটন ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ভার ক্রেতার নেওয়ার কথা। সে হিসেবে, একটি টি শার্টের দাম ২ ডলার ২০ হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো যাবে না, এজন্য তারা এই ভার বেশিরভাগই রপ্তানিকারকের ওপর দিচ্ছে’। বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণাধর্মী কাজ করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। টবিএসকে তিনি বলেন, ‘কারখানা মালিকপক্ষের এ বক্তব্যের সত্যতা রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন খরচ বাড়লেও পোশাকের দর কমতির দিকে’। বাংলাদেশ বড় আকারের পোশাক আমদানিকারক যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ব্র্যান্ডের বাংলাদেশ অফিসের প্রধান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, ‘কোভিডের সময় গত এক থেকে দেড় বছরে কেউ তো মুনাফা করেনি। স্টোরগুলোকে এক বছর ধরে লোকসান গুণতে হয়েছে’। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তুলার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বাড়তি দর দিচ্ছেন দাবি করে তিনি বলেন, অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের পোশাকে তারা ৪০ থেকে ৫০ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তি দর আর অন্য পোশাকের ক্ষেত্রে ছয় থেকে ১০ সেন্ট বাড়তি দিচ্ছেন। অবশ্য গত পাঁচ বছরে সব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দাম কমায়নি বলে জানিয়েছেন আমদানিকারক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা। ইউরোপভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের প্রতিনিধি জানান, তারা পোশাকের দর কমান নি।
পোশাকের মূল্যে কী পরিবর্তন : বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রধানত ২০ ধরণের পোশাক পণ্য রপ্তানি করে। এ তালিকায় রয়েছে ৬ ধরণের ট্রাউজার ও প্যান্ট, দুই ধরণের টি শার্ট (পোলো শার্টসহ), তিন ধরণের সোয়েটার, দুই ধরণের এমএমএফ ওভেন কোট যা জ্যাকেট নামে পরিচিত এবং পুরুষদের শার্ট। মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি এই পণ্য গুলোর দখলে। গত পাঁচ বছরে বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটাদাগে এই পাঁচটি পণ্যের মধ্যে গত পাঁছ বছরে দাম কমেছে চারটির। কেবল বেড়েছে জ্যাকেটের দাম। পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের মে মাসে রপ্তানি হওয়া ট্রাউজার জাতীয় পোশাকের গড়ে দাম ছিল প্রতি কেজি ১৪ দশমিক ৩৬ ইউএস ডলার, যা গত মে মাসে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ১৭ ডলারে। অর্থাৎ এই পোশাক রপ্তানিতে কেজি প্রতি দাম কমেছে সাড়ে সাত শতাংশের বেশি। একইভাবে পোলো শার্ট ও টি শার্টের দাম কমেছে প্রায় তিন শতাংশ, সোয়েটারের প্রায় ১৫ শতাংশ, শার্টের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দাম বেড়েছে কেবল জ্যাকেটের, ১.৮৮ শতাংশ। বিজিএমইএর পরিচালক ও লায়লা স্টাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরানুর রহমান বলেন, ‘অর্ডার ধরার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজেরাই দাম কমাচ্ছি’। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে দর কমানো ঠেকানোর উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপাতত কোন উপায় নেই। কারণ যার মাথা যত বড়, তার ব্যথাও তত বেশি। যে কারখানার মাসে ৮ কোটি টাকা খরচ, অর্ডার না নিলে তো তার পুরোই লস। এজন্য লোকসান কম করতে গিয়ে কম দরের অর্ডারও নেয়া হচ্ছে’।
উদ্যোক্তারা টিকে আছেন কীভাবে : ক্রমাগত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে আবার পণ্যের দাম কমছে – তাহলে উদ্যোক্তারা ব্যবসায়ে টিকে রয়েছেন কীভাবে? এমন প্রশ্নে বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই জানান, মূলত ব্যাংক ঋণের ওপর ভর করে তারা টিকে আছেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এপারেলস এর সিইও ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘কিছু উচ্চমূল্যের মেশিন সংযোজনের ফলে কারখানায় সার্বিকভাবে উৎপাদনশীলতা কিছুটা বেড়েছে। তবে বেশিরভাগ উদ্যোক্তারই ব্যাংক ঋণ বেড়েছে’। মেসিস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিনও জানান, ‘ব্যাংকে দায় বাড়িয়ে উদ্যোক্তারা টিকে রয়েছেন। নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি পণ্যের উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ১২ ডলার কিন্তু রপ্তানি করতে হচ্ছে ১০ ডলারে। এই গ্যাপ পূরণ করা হচ্ছে নতুন মেশিন সংযোজনের মাধ্যমে কিছুটা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এবং কিছু ওভারহেড ব্যয় কমিয়ে। পকেট জয়েনিং, কাটিং মেশিন উৎপাদন লাইনে যুক্ত হওয়ায় সহযোগীর প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। কিন্তু মেশিন আমদানির জন্য ব্যাংক ঋণ বেড়েছে’।
রপ্তানি আদেশের পরিস্থিতি : পোশাক রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, গত এক মাস ধরে রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। বিশেষত ওভেন পোশাকের ক্রয়াদেশ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। অন্যতম বড় ওভেন পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘গত এক মাস থেকে রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ অর্ডার বেশি, যদিও তা করোনার আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় এখনো কম। তবে আমরা সবগুলো লাইন সচল করতে পেরেছি। এভাবে অর্ডার আসতে থাকলে আগামীতে হয়তো কিছু কাজ সাব-কন্ট্রাক্টিংয়েও করাতে হবে’। ইউরোপ-আমেরিকায় মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রকোপ বেড়ে যাওয়া এবং মিয়ানমারে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে বিদেশী ক্রেতারা সেখানে ক্রয়াদেশ কিছুটা সরিয়ে নেওয়ায় এ সুবিধা বাংলাদেশ পাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। তবে অবশ্য রপ্তানি আদেশ বাড়লেও ক্রয়াদেশের ধরন পরিবর্তন হওয়ায় অনেক সময় লিড টাইম (ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর থেকে পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত সময়) খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। ছোট ছোট লটে অর্ডার আসছে। অনেক সময় কাঁচামাল বিমানে আনতে হয় বলে জানান রপ্তানিকারকরা। দেশের খ্যাতনামা পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি এম এ রহিম ফিরোজ টিবিএসকে বলেন, তার নিজের প্রতিষ্ঠানেও ক্রয়াদেশ বাড়ছে। তবে কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে। রপ্তানি আদেশ বাড়ানোর বিষয়টি জানিয়েছেন ইউরোপভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সম্প্রতি তার প্রতিষ্ঠান টি-শার্ট, পোলো শার্টের মতো কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে ক্রয়াদেশের ধরনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। বড় পরিমাণের পরিবর্তে স্বল্প পরিমাণ এবং কম লিড টাইমে পণ্য সরবরাহ নিচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে কাঁচামালের প্রাপ্যতার ঘোষণা বা ইউটিলিটি ডিক্লারেশনও (ইউডি) রপ্তানি আদেশ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজিএমইএর হিসাবে, গত মে মাসে আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় ইউডি নেওয়ার হার বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। ইউডির মাধ্যমে পরবর্তী মাসগুলোতে রপ্তানির ‘ট্রেন্ড’ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ শুরুর বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করেছিলো ২৭.৯৬ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে গতবারের রপ্তানিকে ছাড়িয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ২৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি হয়েছিলো ৩৪.১৩ বিলিয়ন ডলার।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি’র ১০০০তম বোর্ড সভা

নতুন সংকটে পোশাক শিল্প

প্রকাশিত : ১২:০১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১

বিশ্বের বড় রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করায় সেখানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। তবে রপ্তানি আদেশ বাড়তে থাকলেও পোশাকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দাম তো বাড়ছেই না, বরং ক্রেতা কম দর অফার করার পরও অর্ডার নিতে হচ্ছে কেবল লোকসানের পরিমাণ কমানোর জন্য। কম দরের এসব অর্ডার না নিলে শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হবে, তাতে লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (?বিজিএমইএ) পোশাকের দর কমে যাওয়ার তথ্য দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যের বরাত দিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, গত এক বছরে রপ্তানি হওয়া পোশাক পণ্যে প্রধান ২০টি পণ্যের দাম কমেছে সম্মিলিতভাবে পাঁচ শতাংশের ওপরে। আর গত পাঁচ বছরে দাম কমেছে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ। বিজিএমইএ’র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে ২০টি পোশাক আইটেমের মধ্যে ১৬টিরই দাম কমেছে, বেড়েছে বাদবাকী চারটির। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে ক্রমাগত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, এই সময়ে এ খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং বছর বছর ইনক্রিমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটির দাম বাড়ায় সার্বিকভাবে তা পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিএমইএ’র তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে পোশাকের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মজুরি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এর বাইরে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসসহ ইউটিলিটি ব্যয় এবং পরিবহন, ব্যাংক চার্জ, ল্যাব টেস্ট ইত্যাদি খাতে বেড়েছে ২৫ শতাংশ। তারা জানান, এর সঙ্গে নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে পোশাকের কাঁচামাল কটনের দর এবং শিপিং খরচ অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যাওয়া। বাড়তি ব্যয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বহন করার কথা থাকলেও এই ‘প্রাইস প্রেশার’ এর বেশিরভাগই চলে আসছে রপ্তানিকারকদের ওপর। এর ওপর গত প্রায় দেড় বছরব্যাপী করোনার ক্ষতির প্রভাব তো রয়েছেই। সবমিলিয়ে ব্যবসায়ে টিকে থাকতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির মেশিন কারখানায় স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও চলছে। বেশ কয়েকজন পোশাক খাতের উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি ক্রয়াদেশ বাড়ছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন, এখনো উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে অর্ডার নিতে হচ্ছে। এটি ক্রমাগত কমতির দিকে। অর্ডার নিতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাকেও দর পেছানোর কারণ বলে মনে করছেন তারা। ট্রাউজার জাতীয় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসিস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, ‘গত পাঁচ বছরের মধ্যে সাড়ে তিন থেকে চার বছর ধরেই পোশাকের দর কমতির দিকে’। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে কটনের দাম বাড়ার কারণে পোশাকের প্রধান কাঁচামাল ফেব্রিকের দাম বেড়ে গেছে। এটি এখনো বাড়তির দিকে। আবার ফ্রেইটসহ সার্বিকভাবে শিপিং চার্জ বেড়ে গেছে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ গুণ। এই ব্যয় আমদানিকারক দেওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। দর বৃদ্ধির এই চাপের বেশিরভাগই চলে আসছে আমাদের দিকে’। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ধরা যাক একটি টি শার্ট খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় দুই ডলারে। নতুন করে কটন ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ভার ক্রেতার নেওয়ার কথা। সে হিসেবে, একটি টি শার্টের দাম ২ ডলার ২০ হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো যাবে না, এজন্য তারা এই ভার বেশিরভাগই রপ্তানিকারকের ওপর দিচ্ছে’। বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণাধর্মী কাজ করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। টবিএসকে তিনি বলেন, ‘কারখানা মালিকপক্ষের এ বক্তব্যের সত্যতা রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন খরচ বাড়লেও পোশাকের দর কমতির দিকে’। বাংলাদেশ বড় আকারের পোশাক আমদানিকারক যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ব্র্যান্ডের বাংলাদেশ অফিসের প্রধান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, ‘কোভিডের সময় গত এক থেকে দেড় বছরে কেউ তো মুনাফা করেনি। স্টোরগুলোকে এক বছর ধরে লোকসান গুণতে হয়েছে’। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তুলার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বাড়তি দর দিচ্ছেন দাবি করে তিনি বলেন, অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের পোশাকে তারা ৪০ থেকে ৫০ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তি দর আর অন্য পোশাকের ক্ষেত্রে ছয় থেকে ১০ সেন্ট বাড়তি দিচ্ছেন। অবশ্য গত পাঁচ বছরে সব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দাম কমায়নি বলে জানিয়েছেন আমদানিকারক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা। ইউরোপভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের প্রতিনিধি জানান, তারা পোশাকের দর কমান নি।
পোশাকের মূল্যে কী পরিবর্তন : বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রধানত ২০ ধরণের পোশাক পণ্য রপ্তানি করে। এ তালিকায় রয়েছে ৬ ধরণের ট্রাউজার ও প্যান্ট, দুই ধরণের টি শার্ট (পোলো শার্টসহ), তিন ধরণের সোয়েটার, দুই ধরণের এমএমএফ ওভেন কোট যা জ্যাকেট নামে পরিচিত এবং পুরুষদের শার্ট। মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি এই পণ্য গুলোর দখলে। গত পাঁচ বছরে বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটাদাগে এই পাঁচটি পণ্যের মধ্যে গত পাঁছ বছরে দাম কমেছে চারটির। কেবল বেড়েছে জ্যাকেটের দাম। পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের মে মাসে রপ্তানি হওয়া ট্রাউজার জাতীয় পোশাকের গড়ে দাম ছিল প্রতি কেজি ১৪ দশমিক ৩৬ ইউএস ডলার, যা গত মে মাসে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ১৭ ডলারে। অর্থাৎ এই পোশাক রপ্তানিতে কেজি প্রতি দাম কমেছে সাড়ে সাত শতাংশের বেশি। একইভাবে পোলো শার্ট ও টি শার্টের দাম কমেছে প্রায় তিন শতাংশ, সোয়েটারের প্রায় ১৫ শতাংশ, শার্টের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দাম বেড়েছে কেবল জ্যাকেটের, ১.৮৮ শতাংশ। বিজিএমইএর পরিচালক ও লায়লা স্টাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরানুর রহমান বলেন, ‘অর্ডার ধরার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজেরাই দাম কমাচ্ছি’। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে দর কমানো ঠেকানোর উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপাতত কোন উপায় নেই। কারণ যার মাথা যত বড়, তার ব্যথাও তত বেশি। যে কারখানার মাসে ৮ কোটি টাকা খরচ, অর্ডার না নিলে তো তার পুরোই লস। এজন্য লোকসান কম করতে গিয়ে কম দরের অর্ডারও নেয়া হচ্ছে’।
উদ্যোক্তারা টিকে আছেন কীভাবে : ক্রমাগত উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে আবার পণ্যের দাম কমছে – তাহলে উদ্যোক্তারা ব্যবসায়ে টিকে রয়েছেন কীভাবে? এমন প্রশ্নে বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই জানান, মূলত ব্যাংক ঋণের ওপর ভর করে তারা টিকে আছেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এপারেলস এর সিইও ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘কিছু উচ্চমূল্যের মেশিন সংযোজনের ফলে কারখানায় সার্বিকভাবে উৎপাদনশীলতা কিছুটা বেড়েছে। তবে বেশিরভাগ উদ্যোক্তারই ব্যাংক ঋণ বেড়েছে’। মেসিস গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান তুহিনও জানান, ‘ব্যাংকে দায় বাড়িয়ে উদ্যোক্তারা টিকে রয়েছেন। নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি পণ্যের উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ১২ ডলার কিন্তু রপ্তানি করতে হচ্ছে ১০ ডলারে। এই গ্যাপ পূরণ করা হচ্ছে নতুন মেশিন সংযোজনের মাধ্যমে কিছুটা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এবং কিছু ওভারহেড ব্যয় কমিয়ে। পকেট জয়েনিং, কাটিং মেশিন উৎপাদন লাইনে যুক্ত হওয়ায় সহযোগীর প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। কিন্তু মেশিন আমদানির জন্য ব্যাংক ঋণ বেড়েছে’।
রপ্তানি আদেশের পরিস্থিতি : পোশাক রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, গত এক মাস ধরে রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। বিশেষত ওভেন পোশাকের ক্রয়াদেশ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। অন্যতম বড় ওভেন পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘গত এক মাস থেকে রপ্তানি আদেশ বাড়ছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ অর্ডার বেশি, যদিও তা করোনার আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় এখনো কম। তবে আমরা সবগুলো লাইন সচল করতে পেরেছি। এভাবে অর্ডার আসতে থাকলে আগামীতে হয়তো কিছু কাজ সাব-কন্ট্রাক্টিংয়েও করাতে হবে’। ইউরোপ-আমেরিকায় মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রকোপ বেড়ে যাওয়া এবং মিয়ানমারে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে বিদেশী ক্রেতারা সেখানে ক্রয়াদেশ কিছুটা সরিয়ে নেওয়ায় এ সুবিধা বাংলাদেশ পাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। তবে অবশ্য রপ্তানি আদেশ বাড়লেও ক্রয়াদেশের ধরন পরিবর্তন হওয়ায় অনেক সময় লিড টাইম (ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর থেকে পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত সময়) খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। ছোট ছোট লটে অর্ডার আসছে। অনেক সময় কাঁচামাল বিমানে আনতে হয় বলে জানান রপ্তানিকারকরা। দেশের খ্যাতনামা পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি এম এ রহিম ফিরোজ টিবিএসকে বলেন, তার নিজের প্রতিষ্ঠানেও ক্রয়াদেশ বাড়ছে। তবে কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে। রপ্তানি আদেশ বাড়ানোর বিষয়টি জানিয়েছেন ইউরোপভিত্তিক একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সম্প্রতি তার প্রতিষ্ঠান টি-শার্ট, পোলো শার্টের মতো কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে ক্রয়াদেশের ধরনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। বড় পরিমাণের পরিবর্তে স্বল্প পরিমাণ এবং কম লিড টাইমে পণ্য সরবরাহ নিচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের রপ্তানি আদেশের বিপরীতে কাঁচামালের প্রাপ্যতার ঘোষণা বা ইউটিলিটি ডিক্লারেশনও (ইউডি) রপ্তানি আদেশ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজিএমইএর হিসাবে, গত মে মাসে আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় ইউডি নেওয়ার হার বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। ইউডির মাধ্যমে পরবর্তী মাসগুলোতে রপ্তানির ‘ট্রেন্ড’ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ শুরুর বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করেছিলো ২৭.৯৬ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে গতবারের রপ্তানিকে ছাড়িয়েছে, রপ্তানি হয়েছে ২৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি হয়েছিলো ৩৪.১৩ বিলিয়ন ডলার।