০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ হবে সারা বিশ্বের যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু

কক্সবাজার বিমানবন্দর বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রিফুয়েলিং হাব হিসেবে গড়ে উঠবে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দেশের ভৌগলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়। সেক্ষেত্রে, কক্সবাজার হবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সি-বিচ ও পর্যটন কেন্দ্র এবং অত্যন্ত আধুনিক শহর। যাতে আর্থিক ভাবেও আমাদের দেশ অনেক বেশি লাভবান হবে।’

তিনি আজ রোববার সকালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে রানওয়ে সমুদ্রে সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধন কালে এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, এই বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হলে পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে বা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে যত প্লেন যাবে তাদের রিফুয়েলিংয়ের জন্য সব থেকে সুবিধাজনক জায়গা হবে এই কক্সবাজার। কারণ, একেক সময় পৃথিবীর একেকটি জায়গা উঠে আসে। একসময় হংকং তারপর সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এখন দুবাই। কিন্তু আমি বলতে পারি যে ভবিষ্যতে কক্সবাজারটাই হবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কেননা, খুব স্বল্প সময়ে এখানে বিমান এসে নামতে এবং রিফুয়েলিং করে চলে যেতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমি মনে করি, আমরা যে ওয়াদা জনগণের কাছে দিয়েছিলাম সেটা আরও একটা ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

সমুদ্র তীরবর্তী জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করে নতুন ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে হবে— যার ফলে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৪ এর মতো বড় উড়োজাহাজগুলো এই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারবে এবং এখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করার পথ সুগম হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা সরাসরি কক্সবাজারে আসতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এই যে জলভাগের ওপর আমরা একটা রানওয়ে নির্মাণ করছি সেটাও দৃষ্টিনন্দন হবে এবং অনেকে এটাই দেখতে যাবে।

তিনি জলভাগের ওপর এই রানওয়ে নির্মাণের সাহস নিয়ে কাজ শুরু করতে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে জাতির পিতার যে স্বপ্ন ছিল সেই স্বপ্ন যেন আমরা পূরণ করতে পারি। তিনি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপকল্প ঘোষণা করেছিলাম ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে, সেখানে আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছি। এটাকে ধরে রেখে আমাদের উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইনশাল্লাহ আমরা সেটা করতে পারবো।’

অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এভিয়েশন অগ্রগতি সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়।

১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মে মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই এটি সম্পন্ন করা হবে এবং নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরের রানওয়ে হবে ১০ হাজার ৭০০ ফুট, যার মধ্যে ১ হাজার ৩০০ ফুট থাকবে সাগরের বুকে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দর হবে বিশ্বের সাগর উপকূলে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম এবং এটিই হবে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।

এর ফলে, বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহণ ক্ষমতাও বাড়বে, বাড়বে ফ্লাইট অপারেশনের সংখ্যা। ভবিষ্যতে কক্সবাজার সংলগ্ন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর বড় বড় উড়োজাহাজও অবতরণ করতে পারবে কক্সবাজারে। আগামী ৫০ বছরের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে এই প্রকল্প।

বাংলাদেশ থেকে যে সব আন্তর্জাতিক রুটে বিমান যাচ্ছে তার পাশাপাশি আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুট চালুর প্রচেষ্টা চলছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিউইয়র্ক, টরেন্টো, সিডনির মতো দূরত্বে চলতে আমাদের ড্রিমলাইনার ও অন্যান্য উড়োজাহাজ আছে। বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হলে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ হবে।

তিনি বলেন, আমরা শুধু পশ্চিমাদের দিকে মুখ করে থাকবো না। পাশাপাশি, আমরা অন্যান্য যে সব বন্ধুপ্রতীম দেশ আছে সেখানে আমাদের উড়োজাহাজ যাতে যায় ভবিষ্যতে সেই চেষ্টা করবো।

সরকার দেশের প্রত্যেকটা বিমানবন্দরের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমাদের আরও বেশি কাজ করা দরকার।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরকেও তার সরকার উন্নত করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে যেন উন্নত হয়, যাতে ভুটান, নেপাল বা ভারতের কয়েকটা রাজ্য এই বিমানবন্দরটা ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে এটাকে একটা আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে আমরা উন্নত করতে চাই। আর সিলেটেরটি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মেঘালয়, আসাম বা ভারতের অনেক রাজ্য থেকেও আমাদের এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটাও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেটিও ত্রিপুরা থেকে শুরু করে ভারতের অনেক প্রদেশ ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে একটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি করা এবং সেভাবে উন্নত করার চিন্তা আমাদের মাথায় রয়েছে।

বিমানের কর্মকর্তাদের কর্তব্যনিষ্ঠর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সততার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে এটা (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স) পরিচালনা করবেন। সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সবকিছু যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয় সেটা আপনারা দেখবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সাড়ে ১২ বছরে বোয়িং কোম্পানির ড্রিমলাইনারসহ মোট ১৬টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং-৭৭৭, দুটি বোয়িং-৭৩৭, চারটি বোয়িং-৭৮৭-৮, দুটিটি বোয়িং-৭৮৭-৯ ও চারটি ড্যাশ-৮।

প্রধানমন্ত্রী তার ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে বলেন, ‘আমরা রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকেও উন্নত করব। ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করব। কক্সবাজারকে সুপিরিয়র বিমান অবতরণে সক্ষম দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ কাজ তার সরকার সম্পন্ন করতে পারবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বলতেন বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানটা এমন যে, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। অর্থাৎ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ বাংলাদেশ রচনা করতে পারে। সেই সুযোগটা আমাদের রয়েছে। কারণ, ইন্টারন্যাশনাল এয়াররুট বাংলাদেশের ওপর দিয়ে, কক্সবাজারের ওপর দিয়ে যাচ্ছে।

কাজেই কক্সবাজারকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তুলতে এখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এ লক্ষ্যে এই বিমানবন্দরকে সুপরিসর বিমান চলাচল উপযোগী আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট থেকে ৯ হাজার ফুটে বর্ধিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই বিমানবন্দরের রানওয়েকে মহেশখালি চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট বর্ধিত করার লক্ষ্যে পেভমেন্ট, এয়ারফিল্ডলাইটিং সিস্টেম, জিওমেট্রিক ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ড্রইং ও ডকুমেন্ট প্রণয়ন করা হয়েছে।

কক্সবাজার জাতির পিতার খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তিনি কারাগারে না থাকলে প্রতি বছর সেখানে পরিবার নিয়ে একবার হলেও যেতেন এবং সেখানকার ঝাউবন জাতির পিতারই পরিকল্পনা বলে বঙ্গবন্ধু কন্যা অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন।

জাতির পিতা ১৯৭২ সালেই সকল বিমানবন্দরকে পুনর্গঠন করে চলাচলের উপযোগী করে তুলেছিলেন এবং ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এভাবেই তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলেছিলেন। একইসঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পুনস্থাপিত করতে পেরেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। নেদারল্যান্ড, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক উড়োজাহাজ চলাচল চুক্তি সই করেন। দেশ পরিচালনার জন্য জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। এর মধ্যেই তিনি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেছিলেন।

অথচ এরপর ২১ বছর বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ, যারা ক্ষমতায় ছিল তারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল। জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন তারা করেনি, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

বিমানের এক সময়ের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আকাশ পথে যেতে যেতে পানি পড়তো, এন্টারটেইনমেন্টের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ঝরঝরে ছিল প্লেনগুলো।

এই মান্ধাতার আমলের উড়োজাহাজ চালাতে পারায় তিনি সে সময়কার পাইলটদের দক্ষতার কদর করে বলেন, আমি আমাদের পাইলটদের বলতাম তাদেরকে আমাদের স্পেশাল পুরষ্কার দেওয়া উচিত।

বিমানে ভ্রমণের সময় অনুমতি নিয়ে শেখ হাসিনা ককপিটে গিয়ে পাইলটদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যার কথাও শুনতেন বলে বক্তব্যে জানান তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের প্রবাসে ১ কোটির কাছাকাছি মানুষ থাকেন। তারা কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্লেন পেলেই সেটাতেই চড়তে চায়। তাতে যত কষ্টই হোক। কিন্তু যেই অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হতো, বিমানে চড়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু তারপরও মনে হতো নিজের দেশের জাহাজে যাচ্ছি। এটাই সব থেকে বড় কথা ছিল।

অনুষ্ঠানে কক্সবাজারে বিদেশিদের জন্য একটি পৃথক স্পেশাল জোন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও পুনরায় সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।

জনপ্রিয়

নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর তা বাতিল, হস্তান্তর কিংবা ভাগাভাগি সম্ভব নয়

বাংলাদেশ হবে সারা বিশ্বের যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু

প্রকাশিত : ১২:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ অগাস্ট ২০২১

কক্সবাজার বিমানবন্দর বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রিফুয়েলিং হাব হিসেবে গড়ে উঠবে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দেশের ভৌগলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়। সেক্ষেত্রে, কক্সবাজার হবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সি-বিচ ও পর্যটন কেন্দ্র এবং অত্যন্ত আধুনিক শহর। যাতে আর্থিক ভাবেও আমাদের দেশ অনেক বেশি লাভবান হবে।’

তিনি আজ রোববার সকালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে রানওয়ে সমুদ্রে সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধন কালে এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, এই বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হলে পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে বা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে যত প্লেন যাবে তাদের রিফুয়েলিংয়ের জন্য সব থেকে সুবিধাজনক জায়গা হবে এই কক্সবাজার। কারণ, একেক সময় পৃথিবীর একেকটি জায়গা উঠে আসে। একসময় হংকং তারপর সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এখন দুবাই। কিন্তু আমি বলতে পারি যে ভবিষ্যতে কক্সবাজারটাই হবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কেননা, খুব স্বল্প সময়ে এখানে বিমান এসে নামতে এবং রিফুয়েলিং করে চলে যেতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমি মনে করি, আমরা যে ওয়াদা জনগণের কাছে দিয়েছিলাম সেটা আরও একটা ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

সমুদ্র তীরবর্তী জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করে নতুন ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে হবে— যার ফলে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৪ এর মতো বড় উড়োজাহাজগুলো এই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারবে এবং এখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করার পথ সুগম হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা সরাসরি কক্সবাজারে আসতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এই যে জলভাগের ওপর আমরা একটা রানওয়ে নির্মাণ করছি সেটাও দৃষ্টিনন্দন হবে এবং অনেকে এটাই দেখতে যাবে।

তিনি জলভাগের ওপর এই রানওয়ে নির্মাণের সাহস নিয়ে কাজ শুরু করতে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে জাতির পিতার যে স্বপ্ন ছিল সেই স্বপ্ন যেন আমরা পূরণ করতে পারি। তিনি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপকল্প ঘোষণা করেছিলাম ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে, সেখানে আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছি। এটাকে ধরে রেখে আমাদের উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইনশাল্লাহ আমরা সেটা করতে পারবো।’

অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এভিয়েশন অগ্রগতি সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়।

১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মে মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই এটি সম্পন্ন করা হবে এবং নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সরকার প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরের রানওয়ে হবে ১০ হাজার ৭০০ ফুট, যার মধ্যে ১ হাজার ৩০০ ফুট থাকবে সাগরের বুকে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দর হবে বিশ্বের সাগর উপকূলে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম এবং এটিই হবে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে।

এর ফলে, বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহণ ক্ষমতাও বাড়বে, বাড়বে ফ্লাইট অপারেশনের সংখ্যা। ভবিষ্যতে কক্সবাজার সংলগ্ন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইন্সগুলোর বড় বড় উড়োজাহাজও অবতরণ করতে পারবে কক্সবাজারে। আগামী ৫০ বছরের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে এই প্রকল্প।

বাংলাদেশ থেকে যে সব আন্তর্জাতিক রুটে বিমান যাচ্ছে তার পাশাপাশি আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুট চালুর প্রচেষ্টা চলছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিউইয়র্ক, টরেন্টো, সিডনির মতো দূরত্বে চলতে আমাদের ড্রিমলাইনার ও অন্যান্য উড়োজাহাজ আছে। বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হলে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ হবে।

তিনি বলেন, আমরা শুধু পশ্চিমাদের দিকে মুখ করে থাকবো না। পাশাপাশি, আমরা অন্যান্য যে সব বন্ধুপ্রতীম দেশ আছে সেখানে আমাদের উড়োজাহাজ যাতে যায় ভবিষ্যতে সেই চেষ্টা করবো।

সরকার দেশের প্রত্যেকটা বিমানবন্দরের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমাদের আরও বেশি কাজ করা দরকার।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরকেও তার সরকার উন্নত করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে যেন উন্নত হয়, যাতে ভুটান, নেপাল বা ভারতের কয়েকটা রাজ্য এই বিমানবন্দরটা ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে এটাকে একটা আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে আমরা উন্নত করতে চাই। আর সিলেটেরটি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মেঘালয়, আসাম বা ভারতের অনেক রাজ্য থেকেও আমাদের এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটাও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেটিও ত্রিপুরা থেকে শুরু করে ভারতের অনেক প্রদেশ ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে একটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি করা এবং সেভাবে উন্নত করার চিন্তা আমাদের মাথায় রয়েছে।

বিমানের কর্মকর্তাদের কর্তব্যনিষ্ঠর সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সততার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে এটা (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স) পরিচালনা করবেন। সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সবকিছু যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয় সেটা আপনারা দেখবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সাড়ে ১২ বছরে বোয়িং কোম্পানির ড্রিমলাইনারসহ মোট ১৬টি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং-৭৭৭, দুটি বোয়িং-৭৩৭, চারটি বোয়িং-৭৮৭-৮, দুটিটি বোয়িং-৭৮৭-৯ ও চারটি ড্যাশ-৮।

প্রধানমন্ত্রী তার ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে বলেন, ‘আমরা রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকেও উন্নত করব। ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করব। কক্সবাজারকে সুপিরিয়র বিমান অবতরণে সক্ষম দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ কাজ তার সরকার সম্পন্ন করতে পারবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বলতেন বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানটা এমন যে, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। অর্থাৎ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ বাংলাদেশ রচনা করতে পারে। সেই সুযোগটা আমাদের রয়েছে। কারণ, ইন্টারন্যাশনাল এয়াররুট বাংলাদেশের ওপর দিয়ে, কক্সবাজারের ওপর দিয়ে যাচ্ছে।

কাজেই কক্সবাজারকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তুলতে এখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এ লক্ষ্যে এই বিমানবন্দরকে সুপরিসর বিমান চলাচল উপযোগী আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট থেকে ৯ হাজার ফুটে বর্ধিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই বিমানবন্দরের রানওয়েকে মহেশখালি চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট বর্ধিত করার লক্ষ্যে পেভমেন্ট, এয়ারফিল্ডলাইটিং সিস্টেম, জিওমেট্রিক ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ড্রইং ও ডকুমেন্ট প্রণয়ন করা হয়েছে।

কক্সবাজার জাতির পিতার খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তিনি কারাগারে না থাকলে প্রতি বছর সেখানে পরিবার নিয়ে একবার হলেও যেতেন এবং সেখানকার ঝাউবন জাতির পিতারই পরিকল্পনা বলে বঙ্গবন্ধু কন্যা অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন।

জাতির পিতা ১৯৭২ সালেই সকল বিমানবন্দরকে পুনর্গঠন করে চলাচলের উপযোগী করে তুলেছিলেন এবং ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এভাবেই তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলেছিলেন। একইসঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পুনস্থাপিত করতে পেরেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। নেদারল্যান্ড, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক উড়োজাহাজ চলাচল চুক্তি সই করেন। দেশ পরিচালনার জন্য জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। এর মধ্যেই তিনি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেছিলেন।

অথচ এরপর ২১ বছর বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ, যারা ক্ষমতায় ছিল তারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল। জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন তারা করেনি, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

বিমানের এক সময়ের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আকাশ পথে যেতে যেতে পানি পড়তো, এন্টারটেইনমেন্টের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ঝরঝরে ছিল প্লেনগুলো।

এই মান্ধাতার আমলের উড়োজাহাজ চালাতে পারায় তিনি সে সময়কার পাইলটদের দক্ষতার কদর করে বলেন, আমি আমাদের পাইলটদের বলতাম তাদেরকে আমাদের স্পেশাল পুরষ্কার দেওয়া উচিত।

বিমানে ভ্রমণের সময় অনুমতি নিয়ে শেখ হাসিনা ককপিটে গিয়ে পাইলটদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যার কথাও শুনতেন বলে বক্তব্যে জানান তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের প্রবাসে ১ কোটির কাছাকাছি মানুষ থাকেন। তারা কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্লেন পেলেই সেটাতেই চড়তে চায়। তাতে যত কষ্টই হোক। কিন্তু যেই অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হতো, বিমানে চড়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু তারপরও মনে হতো নিজের দেশের জাহাজে যাচ্ছি। এটাই সব থেকে বড় কথা ছিল।

অনুষ্ঠানে কক্সবাজারে বিদেশিদের জন্য একটি পৃথক স্পেশাল জোন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও পুনরায় সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।