এ যেন এক যুদ্ধ। তাদের কোনো রাত-দিন নেই। শীত-বর্ষা-গ্রীষ্ম এমনকি রোদ-বৃষ্টিকে থোড়াই কেয়ার। নেই করোনা অতিমারিতে আতঙ্কনীল হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ। আছে শুধু কাজ শেষ করার অদম্য ক্ষুধা। স্বপ্নে সঞ্জীবিত কর্মীরা নিরলস, যেন ব্রতে ব্যাপৃত। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে ইতিহাসের অংশ হওয়ার অঙ্গীকার সবার। তাদের কারো চোখে-মুখে নেই ক্লান্তির ছাপ। আছে আনন্দের ঝিলিক আর অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার বুকভরা সাহস। মেহনতি ঘাম ও নিষ্ঠার গাঁথুনি যেন বহুমুখী এই সেতুকে আরও বেশি মজবুত করে তুলছে। প্রমত্তা পদ্মার ওপর প্রায় এক যুগ ধরে চলা মহাসেতু নির্মাণের মহাযজ্ঞ দেখতে গত ১ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর বাড্ডার অফিস থেকে যাত্রা শুরু করে।
যাত্রাবাড়ীর পর ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকে যেন চোখের পলকেই চলে গেল পদ্মা সেতু এলাকায়। যে সেতু চালু হলে ৫৫ কিলোমিটারের এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাত্রাবাড়ীর হানিফ ফ্লাইওভার সংলগ্ন গোলচত্বর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড় যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪০-৪৫ মিনিট। সরকারের প্রত্যাশা, এই সেতু হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়বে।
সেতু বললে আসলে যে ছবি আমাদের মনে ভাসে সেই ছবি দিয়ে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব নয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবকাঠামোকে। প্রমত্তা পদ্মায় দ্বিতল এই সেতুর ওপর দিয়ে চার লেনে চলবে গাড়ি, নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুর তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশে অনুমোদিত যেকোনো ধরনের নৌযান চলাচল করতে পারবে অনায়াসে। সেতুর নিচতলা দিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের পাইপলাইন, যে লাইন দিয়ে গ্যাস পৌঁছাবে এই জনপদসহ আশপাশের অনেক জেলায়।
২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতু ও নদীশাসন কাজ উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি শুরু হয় নকশা ও পুনর্বাসন কাজ।
পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে পদ্মা নদীর দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতু অবকাঠামো প্রকল্প। কড়া নিরাপত্তা আর পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিন-রাত তিন শিফটে কাজ করছেন দেশি-বিদেশি শ্রমিক-প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা।
সেদিন সকাল ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তের সংযোগ সড়কের নিচে পৌঁছায়। নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে সেতুর নিচ দিয়ে ঢুকতেই নজরে পড়ে কর্মীদের ব্যস্ততা। দেখা যায় বড় বড় ক্রেন, নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি এবং নানা আকৃতির ব্লক।
স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা
সামনে এগোতেই সেতু কর্তৃপক্ষের একজন প্রতিনিধি আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি সেতু পরিদর্শনের নিয়ম সম্পর্কে ‘সচেতন বার্তা’ দেন।
মোহাম্মদ ইরফান নামের এই প্রতিনিধি জানান, মূল সেতুতে উঠতে হবে ১ নম্বর পিলারসংলগ্ন লোহার সিঁড়ি দিয়ে, যে সিঁড়ি প্রায় ১২ তলা সমান উঁচু। সেতুতে উঠে বাংলাদেশি শ্রমিক ছাড়া বিদেশি কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না বলে সতর্ক করে দেন তিনি।
ইরফান বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা আর যাই করি, চীনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীর সঙ্গে যেন কোনো ধরনের কথা বলার চেষ্টা না করি।’এরপর ইরফানের দেখানো সিঁড়ি বেয়ে মূল সেতুতে ওঠে ।
তখন সকাল সাড়ে ১০টা। সেতুর ওপরে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়েছে। সেতুর দুই পাশে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন শ্রমিকরা। তাদের সবার মাথায় সবুজ রঙের হেলমেট, মুখে মাস্ক। কেউ কেউ সেতুর রেলিংয়ের কাজ করছেন। কেউ কেউ রড কাটছেন। আবার কেউ কেউ প্যারাপেট ওয়াল বসানোর কাজে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যেই তাদের কর্মকাণ্ড চীনের কর্মকর্তারা তদারকি করছেন।
ব্যস্ত এই শ্রমিকদের একজন মো. শাহীন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কাজের শুরু থেকেই কাজ করছি। আগে নিচে করেছি, এখন সেতুর ওপরে উঠেছি। বসেরা যখন যে কাজ দেন, তাই করি। এখন করছি রেলিংয়ের কাজ।’
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) কর্মকর্তারা বলছেন, সেতুর দুই পাশে রেলিং, প্যারাপেট ওয়াল ও ডিভাইডারের কাজ এগিয়ে চলছে। মাওয়া-জাজিরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে মাসিক বেতনের চুক্তিতে কাজ করছেন।
একজন শ্রমিক বলেন, এই কাজ করার সময় মাঝেমধ্যেই ভারী যন্ত্রপাতির আঘাত পান তারা। তাদের মধ্যে কারও কারও হাত, কারও কারও পা থ্যাঁতলে গেছে। তারপরও নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রকল্পে প্রায় ৮ বছর ধরে কাজ করছেন গাইবান্ধার মো. শরিফ। প্রথমে করেছেন ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। এখন তিনি ফোরম্যান। তার অধীনে ছয়জন কর্মী সেতুর রড, বিদ্যুৎ, পিলার ও স্ল্যাবের যেকোনো কাজে পারদর্শী। কথা বলার সময় তিনি করছিলেন স্ল্যাবের কাজ। শরিফ বলেন, ‘প্রথম দিকে চাইনিজদের ভাষা বুঝতে কষ্ট হয়েছে। কাজেও ভুল ছিল। এখন কোনো কষ্ট নেই। ওদের ভাষা বুঝি। কাজও পারি। ওরা প্রশংসা করে।’
প্রকল্পে ৫ বছর ধরে কাজ করছেন মাওয়ার বাসিন্দা শান্ত মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘চাইনিজ ছাড়াও জার্মান, মালয়েশিয়ান ও ভারতীয়রা এই সেতুর কাজ করে। এরা সবাই বস। তবে মালয়েশিয়ানদের চেয়ে জার্মানির কর্মকর্তারা বড়। যখন কোনো বড় ধরনের প্রবলেম হয় তখন ওরা খালি চেক দেয়ার জন্য আসে। ইন্ডিয়ানরা আসে ওপরের যেসব রিস্কি কাজ থাকে সেগুলা করার জন্য। যেমন টাওয়ারের কাজ।’
মূল সেতুর এক নম্বর পিলারের পাশেই কাজ করছিলেন শাহীন নামের আরেক শ্রমিক। তিনি জানান, প্রত্যেক পিলারকে কেন্দ্র করে একেকজন ফোরম্যানের অধীনে ভিন্ন ভিন্ন দল সেতুর ভিন্ন ভিন্ন কাজে যুক্ত। পি ওয়ান পিলারের কাছে পাঁচজন ফোরম্যান কাজ করছেন। তাদের অধীনে ১১০-১২০ জন কর্মী রয়েছেন।
সেতুর ওপরের শ্রমিকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলতে বলতে টিম হাঁটতে থাকে জাজিরা প্রান্তের দিকে। কাজের প্রায় একই দৃশ্য দেখতে দেখতে ৮ নম্বর পিলারের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে ১ নম্বর পিলারে। এরপর টিম নিচে নামে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে রেল সেতুর কাজ দেখতে। সেখানেও দলে দলে ভাগ হয়ে অনেক শ্রমিককে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়।
সেতুতে ‘ফেরির ধাক্কা’ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে কর্তৃপক্ষ সব ধরনের ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় মাওয়া প্রান্তের মাছবাজার ঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যায়। দুপুর ২টার দিকে কাঁঠালবাড়ী পৌঁছে দেখা যায় প্রাণহীন ঘাট। ঘাটের বেশিরভাগ হোটেল খোলা থাকলেও কোনো মানুষ কিংবা যাত্রী দেখা যায়নি।
কাঁঠালবাড়ী থেকে অটোরিকশায় চড়ে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের উদ্দেশে রওনা দেয়। ১৫ থেকে ২০ মিনিট যাওয়ার পর দূর থেকেই পদ্মা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক, সংযোগ সেতু দেখা যায়। সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডের অনুমতি নিয়ে মেঠোপথ ধরে ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্ত যায়। মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর পিলার থেকে জাজিরা প্রান্তের এই ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্তই মূল সেতু।
৪২ নম্বর পিলার এলাকায় যেতে যেতে দেখা যায়, সেতুর নিচ দিয়ে বড় বড় ব্লক নিয়ে নদী শাসনের কাজের ব্যস্ততা। এ সময় সেতুর ওপর থেকে ভেসে আসছিল টুং-টাং শব্দ। ৪২ নম্বর পিলারের গোড়ায়ও আছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকরা ওঠানামা করছেন। চাইনিজ সিকিউরিটিজ সার্ভিসের সদস্যরা পিলারের ওপরে ওঠার সিঁড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। নদীর তীর ঘেঁষে টহল দিচ্ছেন সেনা সদস্যরা।
কয়েকজন শ্রমিক জানান, ওপরে রেল ও সড়ক সেতুর কাজ চলছে। রোডওয়ে স্ল্যাব ও রেল স্ল্যাব বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রেলিং ও প্যারাপেট ওয়াল তৈরিসহ পিচ ঢালাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
৪২ নম্বর পিলারের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার পর এগিয়ে যায় পদ্মা নদীর পাড়ে। সেখান দেখা যায়, দুই চরের মাঝ দিয়ে মাওয়ার দিকে চলে গেছে পদ্মা সেতু। সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করছে নানা ধরনের নৌযান। পার ধরে টহল দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
সূর্য ডোবার পর প্রকল্প এলাকা থেকে বেরিয়ে যায়। গনির মোড় এলাকায় কথা হয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে, যারা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তারা বলেন, স্বপ্নের এই সেতুর জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু সেতুর সঙ্গে শরীয়তপুরের কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেতু ঘিরে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে তার সবই হচ্ছে মাদারীপুরকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচরকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ, ক্ষোভও আছে তাদের মধ্যে।
কাছাকাছি প্রতিক্রিয়া জানান সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শরীয়তপুরের সভাপতি আহসান উল্লাহ ইসমাইলী ও আইনজীবী আজিজুর রহমান রোকন। তাদের কথার সূত্র ধরে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা শুনিয়েছেন পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. পারভেজ হাসান মনে করেন, এই সেতুর কারণে শরীয়তপুরের বাসিন্দাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনোজাগতিক উন্নয়ন হবে। কোনোটা খুব দ্রুত, কোনোটা ধীরে ধীরে। সবমিলে হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে শরীয়তপুরে।
উপহাস আর ষড়যন্ত্রের কথা
দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বাঙালি জাতির স্বপ্ন এখন বাস্তব। পদ্মা সেতু যাতে না হয় সে জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এ দেশের কয়েকটি সংবাদপত্র, যেগুলো দিনের পর দিন পদ্মা সেতুর কল্পিত দুর্নীতি নিয়ে মনগড়া গল্প চালিয়ে গেছে। শতসহস্র এসব গল্প উড়িয়ে দিয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত বলেছে, এই মামলায় যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে, তা অনুমানভিত্তিক, গালগল্প এবং গুজবের বেশি কিছু নয়।
দুর্নীতির এই অভিযোগ নিয়েই টানাপোড়েনের জের ধরে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। পরে নিজস্ব অর্থায়নেই বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে।
পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার জানিয়েছেন, এই সেতু নিয়ে ৯০ দশকের আন্দোলন এবং আন্দোলনের কারণে অনেক মানুষের টিটকারী, হাসি-তামাশার শিকার হওয়ার কথা। অনেকেই তাকে পাগলও বলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে শরীয়তপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা খোকা শিকদার জানিয়েছেন, আন্দোলনের এই পুরো সময়ে ক্ষমতায় ছিল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। তারপর বিএনপি সরকার এসে সেটা ভেঙে ফেলে। তারপরের ইতিহাস সবাই জানেন। সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা নিজেদের টাকা দিয়ে নিজেই পদ্মা সেতু করলেন।’ সঙ্গে কথা বলার সময় পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন কমিটির বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি, নানা ধরনের উপহাস আর ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ তোলেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম।
উপমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। যুক্ত হই ছাবেদুর রহমান খোকা শিকদারের নেতৃত্বাধীন পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন কমিটিতে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এই সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নেই। সে সময় এই সেতুর কথা বলে আজকের বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা পর্যন্ত উপহাস করেছিলেন। ‘নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন পদ্মা সেতু ঠেকাতে। কিন্তু দেশপ্রেমে বলীয়ান শেখ হাসিনাকে কেউ দমাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদী পার হয়ে জাজিরায় গেছেন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অধিকার আদয়ের জন্য চষে বেরিয়েছেন এই জনপদ। আজ সেই নদীর বুক চিরে পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে যেন বঙ্গবন্ধুকেই কুর্নিশ করছে। এই সেতুর ফলে এখানকার জনপদে উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।’
প্রকল্পের কর্মীদের তথ্য
সে এক মহাযজ্ঞ। ২২ বছর ধরে ২০ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক তাজমহল। তাহলে পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞে কত শ্রমঘণ্টা যুক্ত হয়েছে তা জানার কৌতূহল আমাদের। কিন্তু সেতু কর্তৃপক্ষ এমন সুনির্দিষ্ট হিসাব দিতে পারেনি। তবে কত শ্রমিক কাজ করছে তার একটি হিসাব পাওয়া গেল।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি নকশা ও পুনর্বাসনের কাজ শুরুর সময়ই ৫০০ কর্মী ছিলেন। এরপর কাজের সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মী। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের সময় ১২০০ থেকে ২০০০ কর্মী ছিলেন।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ২০ হাজার কর্মী কাজ করেছেন। এরপর কাজের চাপ কমে যাওয়ায় কর্মীর সংখ্যাও কমতে থাকে। ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাসে সাড়ে ৪ হাজার কর্মী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার জনই বাংলাদেশি। বাকি ৫০০ কর্মী ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের ২২টি দেশের নাগরিক।
দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, কলম্বিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নেপাল এবং আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া। বিদেশি কর্মী-কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে চীনের।
বিদেশিদের মাসিক বেতন সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৮০ হাজার। বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে শ্রমিক থেকে ফোরম্যান পর্যন্ত বেতন ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত।
দেশি-বিদেশি উপকরণ
বিবিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর পিলার ও স্ল্যাব তৈরির জন্য স্টোন চিপ আনা হয়েছে দুবাই ও ভারত থেকে। যে রড সিমেন্ট বালু লেগেছে তার সবই দেশি। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, সেতু তৈরির প্রধান প্রধান উপকরণের মধ্যে বাংলাদেশের এমএস রড, বালু ও সিমেন্টই ব্যবহার হয়েছে। অন্যান্য প্রধান সব উপকরণই বিদেশ থেকে আনা হয়। সেতুর আলোকস্জ্জার কাজ দেশি বা বিদেশি যেকোনো কোম্পানিই পেতে পারে বলেও জানান প্রকল্প পরিচালক।
৬ থেকে ৩৮ নম্বর পিলারের মধ্য দিয়ে চলবে নৌযান
বিবিএ কর্মকর্তারা জানান, মূল সেতুর ৬ নম্বর থেকে ৩৮ নম্বর পিলারগুলোর যেকোনো ফাঁকা জায়গা দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারবে। এর প্রত্যেকটি পিলারের পাইল ক্যাপ থেকে সেতু পর্যন্ত উচ্চতা ১৮ দশমিক ৩ মিটার। দুই পিলারের মাঝের দূরত্ব ১৩১ মিটার। বর্ষা মৌসুমে পানির স্তর পাইল ক্যাপের নিচেই থাকে। আর ১৮ দশমিক ৩ মিটার উচ্চতার বেশি কোনো নৌযান নেই বাংলাদেশে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ও মেয়াদ
২০০৭ সালের আগস্টে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। ২০১৫ সালে ৭ নম্বর পিলার বসানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। এই জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই সেতুর কাজ। তবে করোনা মহামারি ও প্রবল বন্যায় কাজের ব্যাঘাত হওয়ায় আরও দুই বছর বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদ।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৭.৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে মূল সেতুর অগ্রগতি হয়েছে ৯৪.৫০ শতাংশ। নদী শাসনের কাজ হয়েছে ৮৪.৭৫ শতাংশ।
কবে নাগাদ সেতু যান চলাচলের উপযোগী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হচ্ছে ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা। এর মধ্যেই যান চলাচলের উপযোগী করা। কবে কোন গাড়ি দিয়ে উদ্বোধন করা হবে, তা ঠিক করবে সরকার।’
সেতুর টোল ও নিরাপত্তা
বিবিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন কোম্পানি (কেইসি) সেতুর ওপর চলাচলকারী যানবাহনের টোল আদায়ের কাজ পেতে পারে। আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিটির সঙ্গে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমি শুনেছি, সেতু কর্তৃপক্ষ কেইসির সঙ্গে আলোচনা করছে। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘সেতুর নিরাপত্তা দেখভাল করবে সেতু কর্তৃপক্ষই। সেনাবাহিনী সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করবে। দূর থেকে তারা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবেন।’
অর্থনৈতিক প্রভাব
বিবিএ বলছে, সেতুটি দক্ষিণের ১৯ জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন নিশ্চিত করবে। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে বেনাপোল স্থলবন্দরেরও। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে রুট অঐ-১ এর অংশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
এসব যোগাযোগের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়ার যে আশা করা হচ্ছে সে প্রসঙ্গে কথা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায় না গেলাম, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি, তাহলেও দক্ষিণ বাংলার যে ২১ জেলা আছে সেখানে ২ শতাংশ জিডিপি বাড়বে। আর পুরো দেশের জিডিপি কম করে হলেও ১ শতাংশ বাড়বে, এর বেশিও বাড়তে পারে।’
রেল সংযোগ প্রকল্পে ইলেকট্রিক ট্রেন
পদ্মা সেতু প্রকল্পের অধীনে যান চলাচল ও ট্রেনের লাইন হচ্ছে। দুই পারের সঙ্গে রেল সংযোগ করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প (পিবিআরএলপি)।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বৃহত্তম এই প্রকল্পের অধীনে রাজধানী ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেললাইন হচ্ছে। প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি ২৪৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের সময় দুই বছর বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন সরকারের ঋণের অর্থে এই প্রকল্প জি টু জি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড (সিআরইসি)। প্রকল্পে ঢাকার মেট্রোরেলের মতো ইলেকট্রিক ট্রেনের প্রযুক্তি থাকবে।
এই রেললাইনের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে জাতীয় ও আন্ত দেশীয় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। রেলপথটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৩টি জেলায় প্রথম রেলসংযোগ স্থাপন করবে। ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি ৪৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।
রেল প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। রেলমন্ত্রীর এই সফরের সঙ্গী। রেলমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আগামী বছরের জুনে পদ্মা সেতু দিয়ে একসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও ট্রেন চলাচল শুরু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতু কর্তৃপক্ষ পদ্মা সেতুতে রেলপথ স্থাপনের অংশ রেলওয়েকে বুঝিয়ে না দিলে এ কাজ যথাসময়ে অর্থাৎ জুনের মধ্যে শেষ হবে না। এতে করে জুনে পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু করা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নদী শাসন ৮৫% শেষ
পদ্মা সেতুর জন্য নদী শাসন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ কাজ পেয়েছে চীনের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। চুক্তি হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এ পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (নদী শাসন) মো. শরফুল ইসলাম সরকার। আগামী জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ার কথা। তার আগে স্বাধীনতা দিবস বা অন্য কোনো জাতীয় দিবসে এই সেতু উদ্বোধন হতে পারে, এমন জল্পনা-কল্পনা আছে। তবে মার্চ বা জুন যখনই হোক স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন নন্দিত বাস্তবতা।
সেতুমন্ত্রীর আশা
সরকার আশা করছে, ২০২১ সালের মধ্যেই দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করবে। স্বস্তির মধ্য দিয়ে শুরু হবে ২০২২ সাল। তারপর জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, আগামী বছর ইনশাল্লাহ তিনটি মেগা প্রজেক্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। এর মধ্যে আগামী বছরের জুনে পদ্মা সেতু, এরপর কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং ডিসেম্বরে এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায় মেট্রোরেল উদ্বোধন করা হবে।’আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘সমালোচকরা সমালোচনা করবে, অপপ্রচার করবে, কিন্তু আমরা জবাব দেবো কাজ দিয়ে। আমরা মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী টানেল দিয়ে জবাব দেবো।’





















