০১:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

হার না মানা আকলিমা ‘কৃষি কাজ’ করে-ই বাঁচতে চান

তিন সন্তানের মা আকলিমা। বয়ষ ৪০। বিয়ে হয়েছে ২০ বছর আগে। ১৫ বছরের সংসার করা শেষে স্বামীর সঙ্গে ৫ বছর আগে বিচ্ছেদ ঘটে। যখন বিচ্ছেদ ঘটে তখন মাথার ঠাঁই জোটে ভাইয়ের জায়গায়। স্বামী ছাড়া আর সন্তানসহ সংসারে হা-বু-ডু-বু অবস্থা। প্রথমে দিনমজুরী করে সংসার চলে। পরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে আজ কৃষি কাজে সফল হয়েছেন। বর্গা নেয়া জমিতে করছেন নানান ধরণের কৃষি কাজ। তাড়িয়েছেন অভাবকে। পড়াচ্ছেন দু’জন ছেলে মেয়েকে। কৃষি অফিস সুত্র জানায়,চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫ হেক্টর( প্রতি হেক্টর সাড়ে ৭ বিঘা) জমিতে চাষিরা বাদামের চাষাবাদ করছেন। তার মধ্যে আকলিমার আছে দেড় বিঘা। আকলিমার বেগমের বাড়ী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়ের চরপেঁচাই গ্রামে।

আকলিমা শোনালেন তার নিজের অতীত জীবনের ঘটনা। স্বামী তহিদুল দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালালেও অভাব ছিল তাদের নিত্য সঙ্গী। অভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় সময় ঝগড়া-বিবাদ চলতো। একদিন হঠাৎ স্বামী তহিদুল উধাও। টানা ৬ মাস পার হয়, তহিদুল ফেরেনও না- খোঁজ খবরও নেন না। এক সময় আকলিমা জানতে পারেন, স্বামী তহিদুল ইসলাম অন্য জায়গায় বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। কি আর করা,অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার সামাল দেন আকলিমা। এভাবেই চলে ৫ টি বছর। এরপর আকলিমা স্বামীর ভিটা ছেড়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানদেরকে নিয়ে একই এলাকার ছোট ভাই শহিদুলের বাড়ীতে ওঠেন।

আকলিমা বেগম ভাইয়ের সহযোগীতায় চরপেঁচাই চরাঞ্চল হওয়ায় অল্প দামে জমি বর্গা নেন। এলাকায় অন্যের জমি বর্গা (কন্ট্রাক) নিয়ে বাদাম, ভুট্টা ও ধানের চাষাবাদ শুরু করেন। এবার বাদাম করেছেন দেড় বিঘা (৩৩ শতাংশে এক বিঘা) আর ধান করেছেন দেড় বিঘা জমিতে। কৃষি কাজের পাশাপাশি তিনি হাঁস, মুরগী,ছাগল পালন করেন। সফলও হন ধীরে ধীরে। সেই সাথে তাড়িয়েছেন অভাব নামের অভিশাপকে। আকলিমার বড় ছেলে রায়হান (১৮) অভাবের তাড়নায় ৭ম শ্রেনী পড়েই পড়ালেখা শেষ করেছেন। কিন্তু হার না মানা আকলিমা পড়াচ্ছেন দ্বিতীয় ছেলে রাকিবুল হাসানকে- ৫ম শ্রেণিতে আর ছোট মেয়ে তানিয়াকে- প্রথম শ্রেণিতে।

আকলিমা বেগম সবার দোয়া চেয়ে জানান, বড় ছেলেসহ তিনি ক্ষেতে কাজ করে ছোট ছেলে ও মেয়ের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বপ্ন দেখেন, যেন দুই সন্তানকে পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ করতে পারেন। আকলিমা দুঃখ প্রকাশ করে জানান, এখন তার স্বামী না আসলেও সমস্যা নেই। ভাইয়েরা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখন সবাই খোঁজ খবর নেয়। আকলিমা নিজের প্রতি আস্থা রেখে বলেন,“এভাবেই আজীবন কৃষি কাজ করে সন্তাদেরকে মানুষ করে বেঁচে থাকতে চাই”।
আকলিমার বড়ভাই ফজর আলী জানান, আকলিমা খুবই পরিশ্রমী। তিন বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলায়। কোন দিনমজুরকে নেয় না। সব কাজ সে নিজেই করে বর্গা নেয়া জমিতে। কৃষি কাজের উপর তিন সন্তান নিয়ে নিয়ে জীবীকা নির্বাহ করছেন। এভাবেই লড়াই করেই যাচ্ছে আকলিমা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন জানান, নারীরা কৃষি কাজে এগিয়ে আসলে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। সেই সাথে কৃষি প্রধান দেশে নারীদের যেমন কৃষির উপর আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হবে,তেমনই বাড়বে কৃষি উৎপাদনশীলতাও। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, কৃষি বিভাগ থেকে আকলিমাকে প্রয়োজনীয় সব ধরণের সহায়তা দেয়া হবে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব

জনপ্রিয়

এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা শুরু ১ ডিসেম্বর, দুই বিষয়ে সুযোগ

হার না মানা আকলিমা ‘কৃষি কাজ’ করে-ই বাঁচতে চান

প্রকাশিত : ১২:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অক্টোবর ২০২২

তিন সন্তানের মা আকলিমা। বয়ষ ৪০। বিয়ে হয়েছে ২০ বছর আগে। ১৫ বছরের সংসার করা শেষে স্বামীর সঙ্গে ৫ বছর আগে বিচ্ছেদ ঘটে। যখন বিচ্ছেদ ঘটে তখন মাথার ঠাঁই জোটে ভাইয়ের জায়গায়। স্বামী ছাড়া আর সন্তানসহ সংসারে হা-বু-ডু-বু অবস্থা। প্রথমে দিনমজুরী করে সংসার চলে। পরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে আজ কৃষি কাজে সফল হয়েছেন। বর্গা নেয়া জমিতে করছেন নানান ধরণের কৃষি কাজ। তাড়িয়েছেন অভাবকে। পড়াচ্ছেন দু’জন ছেলে মেয়েকে। কৃষি অফিস সুত্র জানায়,চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫ হেক্টর( প্রতি হেক্টর সাড়ে ৭ বিঘা) জমিতে চাষিরা বাদামের চাষাবাদ করছেন। তার মধ্যে আকলিমার আছে দেড় বিঘা। আকলিমার বেগমের বাড়ী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়ের চরপেঁচাই গ্রামে।

আকলিমা শোনালেন তার নিজের অতীত জীবনের ঘটনা। স্বামী তহিদুল দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালালেও অভাব ছিল তাদের নিত্য সঙ্গী। অভাবের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় সময় ঝগড়া-বিবাদ চলতো। একদিন হঠাৎ স্বামী তহিদুল উধাও। টানা ৬ মাস পার হয়, তহিদুল ফেরেনও না- খোঁজ খবরও নেন না। এক সময় আকলিমা জানতে পারেন, স্বামী তহিদুল ইসলাম অন্য জায়গায় বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। কি আর করা,অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার সামাল দেন আকলিমা। এভাবেই চলে ৫ টি বছর। এরপর আকলিমা স্বামীর ভিটা ছেড়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানদেরকে নিয়ে একই এলাকার ছোট ভাই শহিদুলের বাড়ীতে ওঠেন।

আকলিমা বেগম ভাইয়ের সহযোগীতায় চরপেঁচাই চরাঞ্চল হওয়ায় অল্প দামে জমি বর্গা নেন। এলাকায় অন্যের জমি বর্গা (কন্ট্রাক) নিয়ে বাদাম, ভুট্টা ও ধানের চাষাবাদ শুরু করেন। এবার বাদাম করেছেন দেড় বিঘা (৩৩ শতাংশে এক বিঘা) আর ধান করেছেন দেড় বিঘা জমিতে। কৃষি কাজের পাশাপাশি তিনি হাঁস, মুরগী,ছাগল পালন করেন। সফলও হন ধীরে ধীরে। সেই সাথে তাড়িয়েছেন অভাব নামের অভিশাপকে। আকলিমার বড় ছেলে রায়হান (১৮) অভাবের তাড়নায় ৭ম শ্রেনী পড়েই পড়ালেখা শেষ করেছেন। কিন্তু হার না মানা আকলিমা পড়াচ্ছেন দ্বিতীয় ছেলে রাকিবুল হাসানকে- ৫ম শ্রেণিতে আর ছোট মেয়ে তানিয়াকে- প্রথম শ্রেণিতে।

আকলিমা বেগম সবার দোয়া চেয়ে জানান, বড় ছেলেসহ তিনি ক্ষেতে কাজ করে ছোট ছেলে ও মেয়ের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বপ্ন দেখেন, যেন দুই সন্তানকে পড়াশুনা করে মানুষের মত মানুষ করতে পারেন। আকলিমা দুঃখ প্রকাশ করে জানান, এখন তার স্বামী না আসলেও সমস্যা নেই। ভাইয়েরা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখন সবাই খোঁজ খবর নেয়। আকলিমা নিজের প্রতি আস্থা রেখে বলেন,“এভাবেই আজীবন কৃষি কাজ করে সন্তাদেরকে মানুষ করে বেঁচে থাকতে চাই”।
আকলিমার বড়ভাই ফজর আলী জানান, আকলিমা খুবই পরিশ্রমী। তিন বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলায়। কোন দিনমজুরকে নেয় না। সব কাজ সে নিজেই করে বর্গা নেয়া জমিতে। কৃষি কাজের উপর তিন সন্তান নিয়ে নিয়ে জীবীকা নির্বাহ করছেন। এভাবেই লড়াই করেই যাচ্ছে আকলিমা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন জানান, নারীরা কৃষি কাজে এগিয়ে আসলে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। সেই সাথে কৃষি প্রধান দেশে নারীদের যেমন কৃষির উপর আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হবে,তেমনই বাড়বে কৃষি উৎপাদনশীলতাও। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, কৃষি বিভাগ থেকে আকলিমাকে প্রয়োজনীয় সব ধরণের সহায়তা দেয়া হবে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব