১২:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ১৭ জনের মৃত্যু, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম

টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা হয়। মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) থেকে বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) টানা দিন তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এসময়ে পানিতে তলিয়ে তিন উপজেলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ভেসে যায় ফসলের খেত এবং মাছের প্রজেক্ট। স্রোতের তোড়ে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেসে যাওয়া এবং সড়কে বড় বড় গর্তের কারণে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম আকার ধারণ করছে বন্যা কবলিত এলাকায়।

বন্যায় তিন দিন পানির নিচে ছিল প্রায় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম। ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এই বন্যা হলেও নেপথ্যে আরো কারণ আছে। নদী খনন না হওয়া, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ করতে গিয়ে জলাধার বন্ধ এবং পার্বত্য এলাকায় বন উজাড়কে এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

বান্দরবানে অবৈধ পাথর ব্যবসার পাশাপাশি নদী ও অনেক খাল ভরাট করায় সমস্যা প্রকট হয়েছে বলেও স্থানীয়রা মনে করছে।

চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতে জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে ১৪টি উপজেলায় এখনও কিছু কিছু এলাকায় বন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। জেলার সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী উপজেলায় এখনও হাজার হাজার বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়।

চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ মজুমদার বলেন, ‘বন্যায় চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় ১৭ জন পানিতে ভেসে মারা গেছেন। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় ছয়, লোহাগাড়ায় চার, চন্দনাইশে দুই, রাউজানে এক, বাঁশখালীতে এক ও মহানগরীতে একজন মারা গেছেন। প্রাথমিকভাবে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ‘জেলার সন্দ্বীপ ছাড়া বাকি ১৪ উপজেলায় কমবেশি বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী।’

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘বন্যায় সাতকানিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পানি নামছে। অনেক মাটির ও সেমিপাকা ঘর ধসে পড়েছে। রাস্তাঘাট, কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশুর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাতকানিয়ায় এখন পর্যন্ত বন্যায় মারা যাওয়া ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন তিন জন। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।’

লোহাগাড়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাজাহান বলেন, ‘লোহাগাড়ায় বন্যার পানি অনেকাংশ নেমে গেছে। চার জন মারা গেছেন। তাদের লাশ পাওয়া গেছে। রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, মৎস্য, সবজি, গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৩০০-৪০০ মাটির ঘর বন্যায় ভেঙে গেছে। তবে কী পরিমাণ এ বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তালিকা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ১৪টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ১২টি পারিবারের ছয় লাখ ৩৫ হাজার ১৩০ জন লোক বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

এর মধ্যে মীরসরাই উপজেলার চারটি ইউনিয়নের পাঁচ হাজার ৯০ পরিবারের ২০ হাজার ৩৬০ জন, ফটিকছড়ির এক ইউনিয়নের ৯০ পরিবারের ৪৫০ জন, সীতাকুণ্ডে ৯ ইউনিয়নের দুই হাজার ৮৬২ পরিবারের ১৫ হাজার ২৬০ জন, হাটহাজারীতে ১৫ ইউনিয়নের ৫০ হাজার পরিবারের দুই লাখ, রাউজানে ১৪ ইউনিয়নের ১৯ হাজার পরিবারের ৭৫ হাজার, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫ ইউনিয়নের ২৫০ পরিবারের এক হাজার ২০০, বোয়ালখালীতে ৬ ইউনিয়নের ৫৫০ পরিবারের দুই হাজার ৭৫০, পটিয়ায় ১৮ ইউনিয়নের ১৬ হাজার ৫৯৫ পরিবারের ৫৩ হাজার ৩১০, কর্ণফুলী উপজেলার ৫ ইউনিয়নের এক হাজার ৮৫০ পরিবারের ৯ হাজার ২৫০, আনোয়ারায় ১১ ইউনিয়নের এক হাজার ৪২৫ পরিবারের ৮ হাজার ৫০, চন্দনাইশে ১০ ইউনিয়নের পাঁচ হাজার পরিবারে ২৫ হাজার, সাতকানিয়ায় ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ২২ হাজার ৫০০ পরিবারে ৯০ হাজার জন, লোহাগাড়ায় ৯ ইউনিয়নের চার হাজার পরিবারের মধ্যে ৮০ হাজার, বাঁশখালীতে ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে ১০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার ৫০০ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৮০০ পরিবারের চার হাজার জন পানিবন্দি ছিলেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

হিন্দুদের নিরাপত্তা কোনো দল নয়, রাষ্ট্র দেবে: ড. আতিক মুজাহিদ

চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ১৭ জনের মৃত্যু, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম

প্রকাশিত : ০৭:০৫:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৩

টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা হয়। মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) থেকে বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) টানা দিন তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এসময়ে পানিতে তলিয়ে তিন উপজেলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ভেসে যায় ফসলের খেত এবং মাছের প্রজেক্ট। স্রোতের তোড়ে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেসে যাওয়া এবং সড়কে বড় বড় গর্তের কারণে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম আকার ধারণ করছে বন্যা কবলিত এলাকায়।

বন্যায় তিন দিন পানির নিচে ছিল প্রায় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম। ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এই বন্যা হলেও নেপথ্যে আরো কারণ আছে। নদী খনন না হওয়া, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ করতে গিয়ে জলাধার বন্ধ এবং পার্বত্য এলাকায় বন উজাড়কে এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

বান্দরবানে অবৈধ পাথর ব্যবসার পাশাপাশি নদী ও অনেক খাল ভরাট করায় সমস্যা প্রকট হয়েছে বলেও স্থানীয়রা মনে করছে।

চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতে জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে ১৪টি উপজেলায় এখনও কিছু কিছু এলাকায় বন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। জেলার সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী উপজেলায় এখনও হাজার হাজার বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায়।

চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ মজুমদার বলেন, ‘বন্যায় চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় ১৭ জন পানিতে ভেসে মারা গেছেন। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় ছয়, লোহাগাড়ায় চার, চন্দনাইশে দুই, রাউজানে এক, বাঁশখালীতে এক ও মহানগরীতে একজন মারা গেছেন। প্রাথমিকভাবে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ‘জেলার সন্দ্বীপ ছাড়া বাকি ১৪ উপজেলায় কমবেশি বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী।’

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘বন্যায় সাতকানিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পানি নামছে। অনেক মাটির ও সেমিপাকা ঘর ধসে পড়েছে। রাস্তাঘাট, কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশুর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাতকানিয়ায় এখন পর্যন্ত বন্যায় মারা যাওয়া ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন তিন জন। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।’

লোহাগাড়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাজাহান বলেন, ‘লোহাগাড়ায় বন্যার পানি অনেকাংশ নেমে গেছে। চার জন মারা গেছেন। তাদের লাশ পাওয়া গেছে। রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, মৎস্য, সবজি, গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৩০০-৪০০ মাটির ঘর বন্যায় ভেঙে গেছে। তবে কী পরিমাণ এ বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তালিকা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ১৪টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ১২টি পারিবারের ছয় লাখ ৩৫ হাজার ১৩০ জন লোক বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

এর মধ্যে মীরসরাই উপজেলার চারটি ইউনিয়নের পাঁচ হাজার ৯০ পরিবারের ২০ হাজার ৩৬০ জন, ফটিকছড়ির এক ইউনিয়নের ৯০ পরিবারের ৪৫০ জন, সীতাকুণ্ডে ৯ ইউনিয়নের দুই হাজার ৮৬২ পরিবারের ১৫ হাজার ২৬০ জন, হাটহাজারীতে ১৫ ইউনিয়নের ৫০ হাজার পরিবারের দুই লাখ, রাউজানে ১৪ ইউনিয়নের ১৯ হাজার পরিবারের ৭৫ হাজার, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫ ইউনিয়নের ২৫০ পরিবারের এক হাজার ২০০, বোয়ালখালীতে ৬ ইউনিয়নের ৫৫০ পরিবারের দুই হাজার ৭৫০, পটিয়ায় ১৮ ইউনিয়নের ১৬ হাজার ৫৯৫ পরিবারের ৫৩ হাজার ৩১০, কর্ণফুলী উপজেলার ৫ ইউনিয়নের এক হাজার ৮৫০ পরিবারের ৯ হাজার ২৫০, আনোয়ারায় ১১ ইউনিয়নের এক হাজার ৪২৫ পরিবারের ৮ হাজার ৫০, চন্দনাইশে ১০ ইউনিয়নের পাঁচ হাজার পরিবারে ২৫ হাজার, সাতকানিয়ায় ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ২২ হাজার ৫০০ পরিবারে ৯০ হাজার জন, লোহাগাড়ায় ৯ ইউনিয়নের চার হাজার পরিবারের মধ্যে ৮০ হাজার, বাঁশখালীতে ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে ১০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার ৫০০ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৮০০ পরিবারের চার হাজার জন পানিবন্দি ছিলেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh