০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বন্ধ করা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন

সারাদেশে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন। রাজধানীর এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে প্রতিদিন রাতের আঁধারে পলিথিন উৎপাদন করে বাজারে পাঠানো হয়। অথচ দিনের বেলা এসব এলাকায় থাকে সুনসান নীরবতা। তবে সাধারণ মানুষের অগোচরে সেখানে সারাক্ষণ রাখা হয় পাহারাদারও। প্রশাসনের কারও পা পড়ার সম্ভাবনা থাকলেই তার সংকেতে লুকিয়ে পড়ে অবৈধ পলিথিন কারখানার মালিকরা।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের কাছে এমনই একটা এলাকা হচ্ছে কয়লাঘাট। এখানে গলি-ঘুপচির ভেতরে গড়ে উঠেছে পলিথিনের এমন অসংখ্য কারখানা। অথচ এমন অবস্থায় পরিবেশ অধিদফতর এখনও রয়েছে সচেতনতামূলক প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ নিয়েই। রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর কয়লাঘাট এলাকায় রীতিমত পাহারা বসিয়ে চালানো হয় বেশ কিছু পলিথিন কারখানা। তবে এসব কারখানায় উৎপাদনের কাজ শুরু হয় রাত ১১টার পরে। জনবহুল এলাকার ভেতরে অনেকটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে এসব কারখানায় তৈরি হয় নিষিদ্ধ পলিথিন। সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর পার ঘেঁষে এই এলাকায় ছোট ছোট অনেকগুলো সরু গলি রয়েছে।

এইসব গলির ভেতরে না ঢুকলে বোঝার উপায় নেই যে এখানে বাসা-বাড়ির পাশাপাশি পলিথিনের কারখানাও আছে। অনুসন্ধানে জানা যায়,এসব ফ্যাক্টরির দরজা জানালা দিনের বেলা বন্ধ থাকে। কারখানার ভেতরে কেউ যাওয়া আসাও করে না, কারণ ভেতরে নানারকম রাসায়নিক দ্রব্য থাকে। যেসব লাইনে পলিথিনের ফ্যাক্টরি আছে সেইসব গলির মোড়ে চেয়ার নিয়ে একজন পাহারাদার বসে থাকে। তিনি খেয়াল রাখেন প্রশাসনের কেউ আসে কিনা কিংবা এলাকায় নতুন কারও আনাগোনা আছে কিনা। বুঝতে পারলেই সঙ্গে সঙ্গে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে দেয় মালিকের কাছে। স্থানীয়রা বলছেন ভোর বেলা আজানের পরপর দেখা যায় ভ্যান গাড়ি দিয়ে মাল নিয়ে যেতে।

কখনও কখনও পিকআপে কিংবা ছোট ট্রাকেও দেখা যায় টিস্যুব্যাগের সঙ্গে পলিথিন নিয়ে যেতে। কয়লাঘাট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, ‘রাতের বেলা এলে পলিথিনের কাহিনী দেখতে পারবেন। এই এলাকা দিনে ঘুমায় রাতে সজাগ থাকে।’ অনুসন্ধানে আরও জানা যায় এসব এলাকায় উৎপাদিত পলিথিন মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় বুড়িগঙ্গার ওপারে স্থানীয় বাজারে। যার মধ্যে চকবাজার অন্যতম। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গা বিশেষ করে সাভার, মানিকগঞ্জ, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ,নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এসব পলিথিনের উৎপাদন মূল্য কম হওয়ায় চাহিদা এবং বিক্রি বেশি বলে জানা যায়। ২০০২ সালে আইন করে পলিথিনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন এবং বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হলেও দেড় যুগে এই আইনের বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদফতর এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে তাতে উল্লেখ করে পরিবেশের জন্য পলিথিনের নানাবিধ ক্ষতিকর বিষয় বিবেচনা করে সরকার গত ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল থেকে সারাদেশে সব ধরনের পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু, সে আইনের বাস্তবায়ন আদৌ হয়নি। এখনও বাজারে পণ্য কিনলে দোকানদাররা পলিথিনের ব্যাগেই তা ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন। ক্রেতাও কোনও রকম প্রশ্ন ছাড়া পলিথিনের ব্যাগে করেই বহন করছেন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য। পলিথিন ব্যাগ এখন বিভিন্ন রূপে শপিং ব্যাগ হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। এটা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধিত ২০১০ এর ৬ ক ধারা লঙ্ঘন করে।

পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, আমদানি ও বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আইনে রাখা হয়েছে বলেও জানা যায় গণবিজ্ঞপ্তিতে। কিন্তু তার পরেও বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না পলিথিনের উৎপাদন এবং বিক্রি। ঢাকার চকবাজারে গিয়ে নিষিদ্ধ পলিথিনের শপিং ব্যাগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। নানা সাইজের ব্যাগে সয়লাব চকবাজার। এই এলাকায় পলিথিনের সামগ্রী বিক্রি করার আলাদা একটি মার্কেট রয়েছে গলির ভেতরে। এখানে পলিথিনের শপিং ব্যাগের অবাধ বিক্রি চলে। খুচরা বিক্রেতারা রাস্তায় বসেই পলিথিনের ব্যাগ বিক্রি করছে। আর পাইকারি বিক্রেতারা পরিচিত ক্রেতা না হলে পলিথিনের ব্যাগ বিক্রির কথা এড়িয়ে যায়। আবার বেশি পরিমাণে চাহিদার কথা শুনলে বিক্রেতারা পলিথিনের ব্যাগ বিক্রির আগ্রহ দেখায়।

সেক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আলাপের কথা বলে থাকে। চকবাজার এলাকার খুচরা বিক্রেতা কামাল (ছদ্মনাম) বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, প্রশাসনের লোক এলেই পলিথিনের ব্যাগ সরিয়ে ফেলে সবাই। তাছাড়া সারা বছরই এখানে পাওয়া যায়। ছোট ব্যাগের চাহিদা রোজার মাসে বেশি। কারণ ইফতারের জন্য লাগে। চকবাজারের বিভিন্ন দোকানে পলিথিন বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা হলেও তা নিয়ে দ্বিধায় আছে পুলিশ প্রশাসন। তাদের দ্বিধা কোনটি বৈধ পলিথিন আর কোনটি অবৈধ এ নিয়ে। চকবাজার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. সিরাজুল ইসলাম বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, কোনটা বৈধ পলিথিন আর কোনটা অবৈধ এটাই বলা মুশকিল। আপনাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে আমাদের জানান। আমরা ব্যবস্থা নেবো।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলোর মাধ্যমে ড্রেন,নালা-নর্দমা,খাল,ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ পলিথিনের হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শপিং মল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর,কাপড়ের দোকান,জুতার দোকান,ফ্যাশন হাউজ,বিভিন্ন কোম্পানিসহ সারা দেশের বাণিজ্যিক বিতানগুলো টিস্যু ব্যাগ ব্যবহার করছে।

নিষিদ্ধ পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ফলে কাগজ,পাট ও কাপড়ের ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে হাজার হাজার ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং লাখ লাখ শ্রমিক বিশেষ করে নারী-শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে পলিথিনের বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতি জোর দিয়ে সরকার নতুন সমাধানের পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সরোয়ার ইমতিয়াজ হাসমী। তিনি বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে আমরা আগামী ৬ জুন একটা মিটিং করবো,সেখানে পলিথিনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কীভাবে এগুনো যায় সে বিষয়ে আলাপ করবো। সেখানে পলিথিনের বিকল্প জিনিস যারা প্রস্তুত করেন তারা থাকবেন।

প্রাথমিকভাবে শপিং মল থেকে প্রচারণার কাজ শুরু করতে পারি। আমরা এখন পলিথিনের বিকল্প জিনিসের ওপর জোর দিচ্ছি,যাতে সবাই পলিথিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। অন্যদিকে, পরিবেশবাদীদের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন,পলিথিনের বিকল্প যেই সব জিনিস আছে এগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এগুলো নিয়ে কোনও প্রচারণা হচ্ছে না, মানুষকে জানানো যাচ্ছে না। পাটের তৈরি জিনিস আছে,কাগজের তৈরি নানা জিনিস আছে এগুলো ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানুষ যদি সচেতন হয়,পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে ধারণা পায় তাহলে পলিথিনের ব্যহার কমে আসবে আর উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে।

ট্যাগ :

ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তপু রায়হানের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় দায়িত্ববোধ, উত্তরাধিকার ও নাগরিক প্রত্যাশার রাজনীতি

বন্ধ করা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন

প্রকাশিত : ১০:৫২:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ মে ২০১৮

সারাদেশে নিয়মিত অভিযান চালিয়েও বন্ধ করা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন। রাজধানীর এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে প্রতিদিন রাতের আঁধারে পলিথিন উৎপাদন করে বাজারে পাঠানো হয়। অথচ দিনের বেলা এসব এলাকায় থাকে সুনসান নীরবতা। তবে সাধারণ মানুষের অগোচরে সেখানে সারাক্ষণ রাখা হয় পাহারাদারও। প্রশাসনের কারও পা পড়ার সম্ভাবনা থাকলেই তার সংকেতে লুকিয়ে পড়ে অবৈধ পলিথিন কারখানার মালিকরা।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের কাছে এমনই একটা এলাকা হচ্ছে কয়লাঘাট। এখানে গলি-ঘুপচির ভেতরে গড়ে উঠেছে পলিথিনের এমন অসংখ্য কারখানা। অথচ এমন অবস্থায় পরিবেশ অধিদফতর এখনও রয়েছে সচেতনতামূলক প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ নিয়েই। রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর কয়লাঘাট এলাকায় রীতিমত পাহারা বসিয়ে চালানো হয় বেশ কিছু পলিথিন কারখানা। তবে এসব কারখানায় উৎপাদনের কাজ শুরু হয় রাত ১১টার পরে। জনবহুল এলাকার ভেতরে অনেকটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে এসব কারখানায় তৈরি হয় নিষিদ্ধ পলিথিন। সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর পার ঘেঁষে এই এলাকায় ছোট ছোট অনেকগুলো সরু গলি রয়েছে।

এইসব গলির ভেতরে না ঢুকলে বোঝার উপায় নেই যে এখানে বাসা-বাড়ির পাশাপাশি পলিথিনের কারখানাও আছে। অনুসন্ধানে জানা যায়,এসব ফ্যাক্টরির দরজা জানালা দিনের বেলা বন্ধ থাকে। কারখানার ভেতরে কেউ যাওয়া আসাও করে না, কারণ ভেতরে নানারকম রাসায়নিক দ্রব্য থাকে। যেসব লাইনে পলিথিনের ফ্যাক্টরি আছে সেইসব গলির মোড়ে চেয়ার নিয়ে একজন পাহারাদার বসে থাকে। তিনি খেয়াল রাখেন প্রশাসনের কেউ আসে কিনা কিংবা এলাকায় নতুন কারও আনাগোনা আছে কিনা। বুঝতে পারলেই সঙ্গে সঙ্গে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে দেয় মালিকের কাছে। স্থানীয়রা বলছেন ভোর বেলা আজানের পরপর দেখা যায় ভ্যান গাড়ি দিয়ে মাল নিয়ে যেতে।

কখনও কখনও পিকআপে কিংবা ছোট ট্রাকেও দেখা যায় টিস্যুব্যাগের সঙ্গে পলিথিন নিয়ে যেতে। কয়লাঘাট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, ‘রাতের বেলা এলে পলিথিনের কাহিনী দেখতে পারবেন। এই এলাকা দিনে ঘুমায় রাতে সজাগ থাকে।’ অনুসন্ধানে আরও জানা যায় এসব এলাকায় উৎপাদিত পলিথিন মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় বুড়িগঙ্গার ওপারে স্থানীয় বাজারে। যার মধ্যে চকবাজার অন্যতম। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গা বিশেষ করে সাভার, মানিকগঞ্জ, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ,নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। এসব পলিথিনের উৎপাদন মূল্য কম হওয়ায় চাহিদা এবং বিক্রি বেশি বলে জানা যায়। ২০০২ সালে আইন করে পলিথিনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন এবং বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হলেও দেড় যুগে এই আইনের বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদফতর এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে তাতে উল্লেখ করে পরিবেশের জন্য পলিথিনের নানাবিধ ক্ষতিকর বিষয় বিবেচনা করে সরকার গত ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল থেকে সারাদেশে সব ধরনের পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু, সে আইনের বাস্তবায়ন আদৌ হয়নি। এখনও বাজারে পণ্য কিনলে দোকানদাররা পলিথিনের ব্যাগেই তা ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন। ক্রেতাও কোনও রকম প্রশ্ন ছাড়া পলিথিনের ব্যাগে করেই বহন করছেন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য। পলিথিন ব্যাগ এখন বিভিন্ন রূপে শপিং ব্যাগ হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। এটা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধিত ২০১০ এর ৬ ক ধারা লঙ্ঘন করে।

পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, আমদানি ও বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আইনে রাখা হয়েছে বলেও জানা যায় গণবিজ্ঞপ্তিতে। কিন্তু তার পরেও বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না পলিথিনের উৎপাদন এবং বিক্রি। ঢাকার চকবাজারে গিয়ে নিষিদ্ধ পলিথিনের শপিং ব্যাগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। নানা সাইজের ব্যাগে সয়লাব চকবাজার। এই এলাকায় পলিথিনের সামগ্রী বিক্রি করার আলাদা একটি মার্কেট রয়েছে গলির ভেতরে। এখানে পলিথিনের শপিং ব্যাগের অবাধ বিক্রি চলে। খুচরা বিক্রেতারা রাস্তায় বসেই পলিথিনের ব্যাগ বিক্রি করছে। আর পাইকারি বিক্রেতারা পরিচিত ক্রেতা না হলে পলিথিনের ব্যাগ বিক্রির কথা এড়িয়ে যায়। আবার বেশি পরিমাণে চাহিদার কথা শুনলে বিক্রেতারা পলিথিনের ব্যাগ বিক্রির আগ্রহ দেখায়।

সেক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আলাপের কথা বলে থাকে। চকবাজার এলাকার খুচরা বিক্রেতা কামাল (ছদ্মনাম) বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, প্রশাসনের লোক এলেই পলিথিনের ব্যাগ সরিয়ে ফেলে সবাই। তাছাড়া সারা বছরই এখানে পাওয়া যায়। ছোট ব্যাগের চাহিদা রোজার মাসে বেশি। কারণ ইফতারের জন্য লাগে। চকবাজারের বিভিন্ন দোকানে পলিথিন বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা হলেও তা নিয়ে দ্বিধায় আছে পুলিশ প্রশাসন। তাদের দ্বিধা কোনটি বৈধ পলিথিন আর কোনটি অবৈধ এ নিয়ে। চকবাজার জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. সিরাজুল ইসলাম বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, কোনটা বৈধ পলিথিন আর কোনটা অবৈধ এটাই বলা মুশকিল। আপনাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে আমাদের জানান। আমরা ব্যবস্থা নেবো।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলোর মাধ্যমে ড্রেন,নালা-নর্দমা,খাল,ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ পলিথিনের হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শপিং মল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর,কাপড়ের দোকান,জুতার দোকান,ফ্যাশন হাউজ,বিভিন্ন কোম্পানিসহ সারা দেশের বাণিজ্যিক বিতানগুলো টিস্যু ব্যাগ ব্যবহার করছে।

নিষিদ্ধ পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ফলে কাগজ,পাট ও কাপড়ের ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে হাজার হাজার ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং লাখ লাখ শ্রমিক বিশেষ করে নারী-শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে পলিথিনের বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতি জোর দিয়ে সরকার নতুন সমাধানের পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সরোয়ার ইমতিয়াজ হাসমী। তিনি বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে আমরা আগামী ৬ জুন একটা মিটিং করবো,সেখানে পলিথিনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কীভাবে এগুনো যায় সে বিষয়ে আলাপ করবো। সেখানে পলিথিনের বিকল্প জিনিস যারা প্রস্তুত করেন তারা থাকবেন।

প্রাথমিকভাবে শপিং মল থেকে প্রচারণার কাজ শুরু করতে পারি। আমরা এখন পলিথিনের বিকল্প জিনিসের ওপর জোর দিচ্ছি,যাতে সবাই পলিথিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হয়। অন্যদিকে, পরিবেশবাদীদের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন,পলিথিনের বিকল্প যেই সব জিনিস আছে এগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এগুলো নিয়ে কোনও প্রচারণা হচ্ছে না, মানুষকে জানানো যাচ্ছে না। পাটের তৈরি জিনিস আছে,কাগজের তৈরি নানা জিনিস আছে এগুলো ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানুষ যদি সচেতন হয়,পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে ধারণা পায় তাহলে পলিথিনের ব্যহার কমে আসবে আর উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে।