নেই কোন ডিগ্রি নিজেকে পরিচয় দেন ডাক্তার। নিজ বাড়িতে খুলেছেন চেম্বার দেন সর্ব রোগের চিকিৎসা। গর্ভবতী মহিলাদের নরমাল ডেলিভারির জন্য নিজ বাড়িতে করেছেন সকল ব্যবস্থা। রয়েছে ‘‘বিসমিল্লাহ মেডিসিন কর্নার’’ নামের ফার্মেসি সেখানে পাওয়া যায় সকল প্রকার ওষুধ।
এমন এক ভুয়া ডাক্তারের সন্ধান মিলেছে পাবনা বেড়া উপজেলার জাতসাখিনি ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের শিবপুর গ্রামে। সে আনিছুল হক এর স্ত্রী আখিঁ খাতুন। প্রকৃত পক্ষে সে একজন নার্স।
অথচ চিকিৎসা বা ওষুধ বিক্রি করার কোন যোগ্যতাই নেই তার। তারপরও নিজ বাড়িতেই চেম্বার খুলে নিয়মিত সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি দেখেন রোগী লেখেন ওষুধও। কিন্তু এই অপচিকিৎসকদের জন্য সাধারণ মানুষের ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে থাকে। ডাক্তার হওয়ার জন্য কোনো ডিগ্রীই নেই তার। সে প্রকৃতপক্ষে মিডওয়াইফ নার্স। তবু তিনি নামের আগে লেখেন ডাঃ আখিঁ খাতুন।
সরেজমিনে কাশিনাথপুর, আমিনপুর, নান্দিয়ারা, টাংবাড়ী, কাবাষকান্দা, দাঁতিয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, চায়ের দোকানে, বিভিন্ন দেয়ালে, বৈদুতিক খুঁটির সাথে রংবেরঙের স্টিকারে লাগানো ‘‘বিসমিল্লাহ মেডিসিন কর্ণার’’ পরিচালনায় ডাঃ আখিঁ খাতুন। রেজিষ্টার মিডওয়াইফ (নোয়াখালী সদর হাসপাতাল) রেজি নং ৩৬২৯ এখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মিডওয়াইফ দ্বারা নরমাল ডেলিভারি, গর্ভবতী মা ও শিশুর সু-চিকিৎসা করা হয়। এখানে সকল প্রকার ওষুধ পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত ডাঃ আখিঁ খাতুন পাবনার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নার্স হিসেবে চাকুরি করতেন। প্রায় দেড় বছর ধরে নিজ বাড়িতে চেম্বার খুলে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা চেম্বারে বসে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শিশুসহ সকল স্তরের রোগীর রোগ নির্ণয় করে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে তারই দোকান থেকে রোগীদের কাছে ওষুধ বিক্রি করছেন।
আখিঁ খাতুন এর বাড়ির সামনের রাস্তায় সাথে টানানো রয়েছে বিশাল আকারের কয়েকটি সাইনবোর্ড। ঘরের সামনে রয়েছে সাইনবোর্ড ঘরের ভিতর রোগী দেখার চেম্বার ও ওষুধের দোকান।
স্থানীয় একাধিক সচেতন ব্যাক্তিরা জানান, ডাক্তারী বিদ্যাপাস না করেও নামের আগে ডাক্তার লিখে রোগীদের সাথে প্রতারণা করে চিকিৎসা দিচ্ছেন আঁখি খাতুন। এমবিবিএস পাস না করে ডাক্তার না হয়েও তার চেম্বারের সামনে ঝুলানো সাইনবোর্ডে নামের আগে ডাক্তার লিখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। রোগ নির্ণয়ের পর ব্যবস্থাপত্র দিয়ে চেম্বারের সাথেই তারই ওষুধের দোকান থেকে ওইসব রোগীদের কাছে ওষুধ বিক্রি করছেন। তবে এখানে যেসব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন তারা নিতান্তই গরীব ও অশিক্ষিত। তাই অতি সহজেই নিতান্ত দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের কাছ থেকে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। গরীব মানুষেরা না জেনে তাদের কাছে কম পয়সায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। অনেকে আবার সাময়িক আরোগ্য লাভ করলেই পরবর্তীতে আরো কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেশি মহিলারা জানান, আমরাতো আসলে জানি না ডাক্তার হতে কোন ডিগ্রি লাগে। আমাদের কারো অসুখ বিসুখ হলে আমরা সবাই ডাক্তার আখিঁ ভাবির কাছে যাই। আমরা ছাড়াও দুরদুরান্ত থেকে রোগী আসে। সে রোগী দেখে তার দোকান থেকেই ওষুধ দেয়। আমরাতো জানি তিনি সর্বরোগের ডাক্তার।
পাশের গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রুবীলা খাতুন বলেন, আমরা গরীর মানুষ, তাই এখানে কিছুটা কম টাকায় চিকিৎসা করাই। কখনো রোগ ভাল হয়, কখনো হয়না। না হলে সরকারী হাসপাতালে যাই।
কাশিনাথপুর ড্রাগিষ্ট এন্ড কেমিস্ট কমিটির সভাপতি সেলিম হোসেন জানান, যে কেউ ইচ্ছে করলেই ফার্মেসি খুলতে পারে না। সরকারি নিয়ম অনুয়ায়ী ফার্মেসী করতে হলে অনেক শর্তাবলির পাশাপাশি তাকে ফামাসিষ্ট হতে হবে এবং অবশ্যই তার ড্রাগ লাইসেন্স থাকতে হবে। বিসমিল্লাহ মেডিসিন কর্নার নামের ফার্মেসি আমাদের সমিতির আওতাধীন নয়। অনুমোদনহীন ফার্মেসির বিষয়ে জেলা ড্রাগ সুপার কে অবগত করবো।
এ ব্যাপারে কথিত ডা. আখিঁ খাতুন বলেন, আমি কোন চিকিৎসা দেই না। আমি গর্ভবতীদের নরমাল ডেলিভারি করাই। কিছু ওষুধ বিক্রি করি। ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি করতে পারেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে বলেন এটা প্রক্রিয়াধীন। নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা প্রেসের দোকান থেকে ভুল করে লিখে দিছে। তিনি নিজেকে সব বিষয়ে অভিজ্ঞ বলে দাবি করেন।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ফাতেমা তুয জান্নাত বলেন, একজন মিডওয়াইফ নিজেকে কখনও ডাক্তার পরিচয় দিতে পারে না। মিডওয়াইফ মানে তো নার্স (সেবিকা) তবে সে যদি কোন সরকারি হাসপাতালে থাকে সে ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারি করাতে পারে। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পাবনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ান জানান, এমবিবিএস, বিডিএস ছাড়া কেউ নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতে পারে না। যদি কেহ প্রতারনা করে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে রোগী দেখে তাহলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোরশেদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। কিছুদিন আগেও ডাক্তার পরিচয় দেওয়ায় নগরবাড়ির এক পল্লী চিকিৎসককে ভ্রাম্যমাণে জরিমানা করা হয়েছে। এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/একে























