শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে রাণীশংকৈলে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধুই হলুদের উচ্ছাস । দিগন্তজোড়া সরিষার ফুলে রঙিন হয়ে হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার প্রান্তর । বাতাসে ভাসছে সরিষা ফুলের মৃদু গন্ধ আর সেই সঙ্গে কৃষকের চোখে মুখে ভর করছে স্বস্তি ও আশার ঝিলিক। অনুকূল আবহওয়া উন্নত বীজ ব্যবহার , সঠিক সময় বীজ বপন , কৃষি অফিসের তদারকি ও নিয়মিত পরিচর্যার ফলে চলতি রবি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষক ও স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তর। এদিকে মৌ চাষীরা।
সরিষার ফুল থেকেই মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এতে তেলের ফসল ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা ।উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে , চলতি মৌসুমে, ৭ হাজার ১ শত ২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শত হেক্টর বেশি।সরিষার হলুদ ফুলে শুধু মাঠ নয় রাণীশংকৈলের গ্রামীন অর্থনীতি ও কৃষকের স্বপ্নও যেন রঙিন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি আর প্ররিশ্রমের এই মেলবন্ধন কৃষিনির্ভর জনপদের জন্য এনে দিচ্ছে আশার আলো ।
কৃষকরা জানান, বাজার ব্যবস্থাপনা ও নায্যামূল্য নিশ্চিত করা না গেলে লাভের পরিমাণ কমে যেতে পারে পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্থানীয় ভাবে তেল উৎপাদনের সুযোগ ও মধুসংগ্রহ বাড়ানো গেলে সরিষা চাষ আরোও লাভজনক হবে ।
উপজেলার সরিষা চাষিরা এ বছর রেকর্ড পরিমাণ জমিতে উন্নত জাতের সরিষার আবাদ করেছেন। উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সরিষার হলুদ ফুলের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। গ্রাম বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে। স্বল্প খরচে ও অল্প সময়ের মধ্যে ফলন পাওয়ায় এ ফসলটি কৃষক-কৃষাণীদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সরিষার হলুদ ফুল আর মিষ্টি মধুর সুবাসে ভরে গেছে চারপাশ। এসব ফুল থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। ফলে একদিকে যেমন সরিষার ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষকরা, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাঁটি মধু পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের কাদিহাট মালিবস্তি এলাকায় সরিষা ফুল থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করছেন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মৌচাষি আব্দুস সাত্তার। তিনি প্রায় শতাধিক মৌবক্স নিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান করছেন। মৌচাষি আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি চলতি মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ দিন ওই এলাকায় থাকবেন এবং মধু সংগ্রহ করবেন। তার ধারণা, এখান থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মন মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। সংগ্রহকৃত এসব মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও খাঁটি মধুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্রতি কেজি মধু ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক মঞ্জুর আলম, মাহিম,সোহেল রানা সহ আরোও অনেকে বলেন,আমরা সরিষার মৌসুমে ফসল ফলিয়ে যেভাবে আমরা ভোজ্য তেলের চাহিদা পুরণ করতে পারি ঠিক তেমনি ফুল থেকে মৌ চাষীদের মাধ্যমে নিজ এলাকা থেকেই খাঁটি মধু খেতে পাচ্ছি ।
এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে কৃষকরা বিভিন্ন উন্নত জাতের সরিষার আবাদ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বারি সরিষা-৭, বারি-৮, বারি-১৪, বারি-১৮ ও বারি-২০। পাশাপাশি বিনা সরিষা-৪, ৯, ১০ ও ১১ এবং বাউ সরিষা-৪ থেকে ৮ জাতের সরিষাও চাষ করা হয়েছে। এসব জাত উচ্চ ফলনশীল, স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন এবং প্রচলিত জাতের তুলনায় বেশি তেল ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য এসব উন্নত জাতের সরিষা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এ উপজেলার কৃষকরা।
কাশিপুর ইউনিয়নের পাটাগড়া গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, আগে কখনো সরিষার চাষ করিনি। তবে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো দুই বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। এতে প্রতি বিঘায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। দাম ভালো পেলে প্রতি বিঘা জমি থেকে প্রায় পনেরো হাজার টাকা করে বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।
নন্দুয়ার ইউনিয়নের বেল্লাল, বাচোর ইউনিয়নের মামুন ও হোসেনগাঁও ইউনিয়নের লিটন আলীসহ একাধিক কৃষক জানান, আমন ধান কাটার পর বোরো ধান চাষের আগ পর্যন্ত যে কয়েক মাস জমি খালি পড়ে থাকে, সেই সময়টায় তারা সরিষার আবাদ করেন। এতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরিষা একটি বাড়তি ফসল হিসেবে কৃষকদের জন্য উল্লেখযোগ্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা শুরু থেকেই কৃষকদের নিয়মিত ও সঠিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, এ বছর ঘনকুয়াশা তুলনামূলক কম থাকায় সরিষার ফসল ভালো হয়েছে। মাঠের অবস্থা দেখে আশা করা যাচ্ছে, ভালো ফলনের পাশাপাশি এবার সরিষার উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ডিএস./



















