০৫:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরবিতর্ক, যোগসাজশ ও নেপথ্যের অদৃশ্য শক্তি

বাংলাদেশ রেলওয়ের শতবর্ষী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর (Chief Controller of Stores CCS) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এটি কোনো প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী চক্রের পুনরুজ্জীবিত অপচেষ্টা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে দাবি করে, অতীতের পতিত স্বৈরাচার সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি মহল যার মধ্যে সাবেক দুই রেলপথ মন্ত্রী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সাবেক চেয়ারম্যান, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা ছিলেন এর আগেও এই দপ্তর ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই পুরনো নকশারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংগঠনটি জানায়, এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র বৈধ ও টিও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়িক সংগঠন, যা এফবিসিসিআইয়ের ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত। দেশজুড়ে প্রায় ৮০০ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর সদস্য। তাদের মতে, CCS সরাসরি রেলওয়ের সরবরাহ শৃঙ্খলা ও অপারেশনাল নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এই দপ্তর সরানো হলে সাপ্লাই চেইনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ যন্ত্রাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই আমদানি হয়। ফলে ডেলিভারি কন্ট্রোল অফিস (DCOS), শিপিং, স্টোর ডিপো, পরিদর্শন ও ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনার পুরো অবকাঠামো চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। ঢাকায় এসব পুনঃস্থাপন করতে হলে কমপক্ষে ১০০ একর জমি, ৭০০ জনবল পুনর্বিন্যাস এবং বিপুল সরকারি অর্থ প্রয়োজন হবে যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।

১৮৬২ সাল থেকে পাহাড়তলীর এই দপ্তর রেলওয়ের মালামাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিদর্শন ও বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এর আওতায় রয়েছে—

রেললাইন, বগি ও লোকোমোটিভের খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়

স্টোর ডিপোর চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ

পুরনো ও অচল মালামাল (স্ক্র্যাপ) নিলামে বিক্রয়

অপারেশনাল নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতকরণ

সংগঠনটির দাবি, দপ্তর স্থানান্তর করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং চট্টগ্রামের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হবে। কারণ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বৃহত্তম রেলওয়ে স্টোর সুবিধা এখানেই অবস্থিত।

সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর রেলওয়ের হৃদপিণ্ড। এটিকে দুর্বল করা মানে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সহজ করা। একটি মহল সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে তৎপর।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রেল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকায় স্থানান্তর হলে দৈনন্দিন অপারেশন ও জরুরি মেইনটেন্যান্স মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা পর্যন্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে পলাতক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ও পতিত স্বৈরাচার সরকারের দোসররা কি এখনো রেলের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছেন? নাকি প্রশাসনিক সংস্কারের নামে পুরনো স্বার্থ আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে?

সংগঠনটির পক্ষ থেকে মহাপরিচালকের কাছে জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী CCS দপ্তর ও সরঞ্জাম বিভাগ বহাল রেখে, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক।

এখন দেখার বিষয়, জনস্বার্থ ও বাস্তবতার চাপেই কি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে, নাকি নেপথ্যের অদৃশ্য শক্তি আবারও প্রাধান্য পাবে।

ডিএস./

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরবিতর্ক, যোগসাজশ ও নেপথ্যের অদৃশ্য শক্তি

প্রকাশিত : ০৩:৪৪:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের শতবর্ষী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর (Chief Controller of Stores CCS) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এটি কোনো প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী চক্রের পুনরুজ্জীবিত অপচেষ্টা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে দাবি করে, অতীতের পতিত স্বৈরাচার সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি মহল যার মধ্যে সাবেক দুই রেলপথ মন্ত্রী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সাবেক চেয়ারম্যান, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তা ছিলেন এর আগেও এই দপ্তর ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই পুরনো নকশারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংগঠনটি জানায়, এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র বৈধ ও টিও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়িক সংগঠন, যা এফবিসিসিআইয়ের ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত। দেশজুড়ে প্রায় ৮০০ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এর সদস্য। তাদের মতে, CCS সরাসরি রেলওয়ের সরবরাহ শৃঙ্খলা ও অপারেশনাল নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এই দপ্তর সরানো হলে সাপ্লাই চেইনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ যন্ত্রাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই আমদানি হয়। ফলে ডেলিভারি কন্ট্রোল অফিস (DCOS), শিপিং, স্টোর ডিপো, পরিদর্শন ও ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনার পুরো অবকাঠামো চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। ঢাকায় এসব পুনঃস্থাপন করতে হলে কমপক্ষে ১০০ একর জমি, ৭০০ জনবল পুনর্বিন্যাস এবং বিপুল সরকারি অর্থ প্রয়োজন হবে যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।

১৮৬২ সাল থেকে পাহাড়তলীর এই দপ্তর রেলওয়ের মালামাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিদর্শন ও বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এর আওতায় রয়েছে—

রেললাইন, বগি ও লোকোমোটিভের খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়

স্টোর ডিপোর চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ

পুরনো ও অচল মালামাল (স্ক্র্যাপ) নিলামে বিক্রয়

অপারেশনাল নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতকরণ

সংগঠনটির দাবি, দপ্তর স্থানান্তর করা হলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং চট্টগ্রামের সঙ্গে বিমাতা সুলভ আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হবে। কারণ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বৃহত্তম রেলওয়ে স্টোর সুবিধা এখানেই অবস্থিত।

সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর রেলওয়ের হৃদপিণ্ড। এটিকে দুর্বল করা মানে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সহজ করা। একটি মহল সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন ধরে তৎপর।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রেল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকায় স্থানান্তর হলে দৈনন্দিন অপারেশন ও জরুরি মেইনটেন্যান্স মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা পর্যন্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে পলাতক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ও পতিত স্বৈরাচার সরকারের দোসররা কি এখনো রেলের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে আছেন? নাকি প্রশাসনিক সংস্কারের নামে পুরনো স্বার্থ আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে?

সংগঠনটির পক্ষ থেকে মহাপরিচালকের কাছে জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী CCS দপ্তর ও সরঞ্জাম বিভাগ বহাল রেখে, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক।

এখন দেখার বিষয়, জনস্বার্থ ও বাস্তবতার চাপেই কি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে, নাকি নেপথ্যের অদৃশ্য শক্তি আবারও প্রাধান্য পাবে।

ডিএস./