রাজধানীর মিরপুরের একটি চায়ের দোকানে বসে আছেন রফিকুল ইসলাম। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই রিকশাচালক গত তিন দশক ধরে ঢাকার রাস্তায় প্যাডেল মারছেন। তার হাতে একটি পুরনো মোবাইল ফোন, স্কিনে ভাঙা দাগ। কিন্তু চোখে স্বপ্ন। “এইবার হয়তো কিছু বদলাবে,” বলছিলেন তিনি। রফিকুলের মতো লাখো মানুষের এই প্রত্যাশাই ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি করেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক আবহ। প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ এবার বিএনপিকেই তাদের ভোটের অধিকার দিয়ে ক্ষমতায় আনতে চাইছেন?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বিএনপি, যে দলটি বহুবার সরকার গঠন করেছে, আবার ফিরে আসতে চাইছে জনগণের আস্থায়। কিন্তু এই আস্থা কি শুধুই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারণ?
অর্থনৈতিক হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা
প্রথমেই আসা যাক অর্থনৈতিক দিকটিতে। বাংলাদেশ গত দেড় দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি দেখলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে খুবই সীমিত হারে। বরং মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে চাপে ফেলেছে। রফিকুল বলছিলেন, “আগে যেটা দশ টাকায় পাইতাম, এখন চল্লিশ টাকা। রিকশার ভাড়া তো আর বাড়াইতে পারি না, মানুষ দেয় না।” এই বাস্তবতা শুধু রফিকুলের নয়, কোটি কোটি মানুষের।
চট্টগ্রামের একটি গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করেন সালমা বেগম। “আমরা কারখানায় সারাদিন খাটি, কিন্তু মাইনে যা পাই তাতে সংসার চালানোই কঠিন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, সব মিলিয়ে হিমশিম খাই,” তিনি বলেন। সালমার মতো লাখো শ্রমিক চান তাদের জীবনমান উন্নত হোক। বিএনপির ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এই মানুষদের কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বেশ কিছু বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি কমাতে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন। তৃতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, ব্যবসা-বাণিজ্যে সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি। পঞ্চমত, কৃষি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। ষষ্ঠত, শিক্ষায় জিডিপির ন্যূনতম ছয় শতাংশ বরাদ্দ এবং স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক সুবিধা সম্প্রসারণ।
সিলেটের একজন ছোট ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন, “এখন একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে গেলে দশ জায়গায় ঘুরতে হয়। ঘুষ ছাড়া কিছু হয় না। যদি এই ব্যবস্থা বদলানো যায়, তাহলে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।” তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি
বিএনপির পক্ষে যে যুক্তিগুলো সবচেয়ে জোরালো, তার একটি হলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। গত কয়েক বছরে বাক স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আমিনুল হক বলেন, “একটি স্বাস্থ্যকর গণতন্ত্রের জন্য বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে স্বৈরতন্ত্রের পথ সুগম হয়।” এই যুক্তিতে বিশ্বাসী অনেকেই মনে করেন, বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা মানে গণতন্ত্রকে নতুন করে প্রাণ দেওয়া।
অতীতের পাঠ ও নতুন প্রত্যাশা
তবে সমালোচকরা মনে করিয়ে দেন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতি, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময়ে বাংলাদেশ পাঁচবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় প্রথম হয়েছিল। এই ইতিহাস ভুলে যাওয়ার নয়।
বিএনপির নেতারা দাবি করছেন, তারা বদলে গেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আমরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। এবার আমরা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করব যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।” কিন্তু মানুষ এখন শুধু আশ্বাসে নয়, বাস্তবায়নে বিশ্বাস করতে চায়।
স্থানীয় ক্ষমতায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ
বিএনপির আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি হলো বিকেন্দ্রীকরণ। তারা বলছে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা হবে এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে। তবে এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা।
তরুণদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপির প্রধান আবেদন হলো মেধাভিত্তিক চাকরি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। তারা চায় তাদের যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক, কোটার বেড়াজালে নয়। বিএনপি যদি কোটা সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে তরুণরা তাদের পক্ষে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু অধিকার
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিএনপি বলছে তারা সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার স্মৃতি এখনো অনেকের মনে তাজা। এই ভয় দূর করতে হবে বিএনপিকে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে, শুধু আশ্বাসে নয়। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
কেন মানুষ বিএনপিকে ভোট দিবে?
প্রথমত, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘ সময় একই দল ক্ষমতায় থাকলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়। রফিকুল বলেন, “একই মুখ দেখতে দেখতে বিরক্ত লাগে। নতুন কেউ আসলে হয়তো কিছু বদলাবে।”
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মুক্তির আশা। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ব্যবসায়িক জটিলতা সব মিলিয়ে মানুষ চাপে আছে। সালমা বলেন, “আমাদের জীবনে কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দিন দিন কষ্ট বাড়ছে। যে আমাদের কষ্ট বুঝবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।”
তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের জন্য তৃষ্ণা। মানুষ চায় তাদের মতামতের মূল্য থাকুক। তারা চায় বাক স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ।
চতুর্থত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। আব্দুল করিম বলেন, “ঘুষ ছাড়া কিছু হয় না। এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে।” মানুষ চায় একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।
পঞ্চমত, মেধার মূল্যায়ন। তরুণরা চায় মেধাভিত্তিক চাকরি, কোটায় নয়। কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মেধাবী তরুণরা বিএনপিকে সমর্থন করবে।
ষষ্ঠত, আইনের শাসনের প্রত্যাশা। মানুষ চায় সবার জন্য সমান আইন। কেউ যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।
সপ্তমত, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। বিএনপির আঞ্চলিক ভারসাম্যের নীতি যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদী মানুষরা তাদের পক্ষে যাবে।
অষ্টমত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আস্থার সংকট থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মানুষ বর্তমান ব্যবস্থায় আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা একটা শেষ সুযোগ দিতে চায়।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব: নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা
এই ক্রান্তিকালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারেক রহমান, যিনি তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা বোঝেন এবং আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, তিনি দলকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করার নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মেধাভিত্তিক শাসন এবং জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন। তিনি বারবার বলেছেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে, যেখানে মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য থাকবে, যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” তার এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক তরুণ ভোটারকে আকৃষ্ট করছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের প্রতীক। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের যে ভিশন তুলে ধরেছেন, তা দেশের লাখো মানুষের স্বপ্নের সাথে মিলে গেছে। রফিকুল, সালমা, আব্দুল করিম এবং আরও কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করেন যে তারেক রহমানের অবিচল নেতৃত্বই এই মুহূর্তে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ভোটারদের স্বপ্ন ও বিএনপির দায়িত্ব
মানুষ বিএনপিকে ভোট দিবে কারণ তারা স্বপ্ন দেখে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। তারা চায় এমন একটি দেশ যেখানে তাদের সন্তানরা মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে, যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। তারা চায় এমন একটি সরকার যা তাদের কথা শুনবে, তাদের কষ্ট বুঝবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করবে।
বিএনপি যদি এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বে তারা দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে ২০২৬ সাল হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। রফিকুল, সালমা, আব্দুল করিম এবং লাখো মানুষের চোখে যে স্বপ্ন জ্বলছে, সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে।
জনগণ জেগে আছে, সচেতন আছে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার। তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, চায় বাস্তবায়ন। তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বিএনপির সংস্কারমুখী এজেন্ডা যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের পথে। এই পথেই রয়েছে আগামীর উজ্জ্বল বাংলাদেশ যেখানে প্রতিটি নাগরিকের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সুযোগ থাকবে।
ডিএস./

























