চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিনই বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও বিদেশি সিগারেট আসছে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ পণ্যসহ যাত্রী আটক হলেও প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও সিগারেট বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থা পেরিয়ে কীভাবে বাইরে চলে যাচ্ছে? আর যেসব চালান ধরা পড়ছে, সেগুলোর পেছনে থাকা মূল হোতারা কি আদৌ আইনের আওতায় আসছে?
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একাধিক সূত্রের দাবি, স্বর্ণ ও বিদেশি সিগারেট চোরাচালানে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। চক্রটির সঙ্গে বিমানবন্দরের বাইরে থাকা কিছু ব্যক্তি ছাড়াও অভ্যন্তরীণভাবে দায়িত্ব পালনকারী কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, বিদেশ থেকে আসা কিছু যাত্রী বিপুল পরিমাণ সিগারেট বা স্বর্ণ বহন করলেও নির্দিষ্ট ‘যোগাযোগ’ থাকলে তারা নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যেতে পারেন। আবার কোনো কারণে ওই সমঝোতায় ব্যত্যয় ঘটলে কিংবা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এলে অভিযান চালিয়ে ওই চালান আটক করা হয়। তখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উদ্ধার করা পণ্য ও আটক যাত্রী দেখিয়ে কৃতিত্ব নেয় এমন অভিযোগও রয়েছে।
একটি বড় চোরাচালানচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করা এক পক্ষের ভাষ্য, একটি পূর্ণ ব্যাগেজ বিদেশি সিগারেট বিমানবন্দর দিয়ে নিরাপদে বের করে দিতে যাত্রীর কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একসঙ্গে ১০টি ব্যাগেজ বের হলে শুধু এ খাতেই প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হতে পারে বলে তাদের দাবি। তাদের আরও দাবি, পণ্য বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর রাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পরে তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
স্বর্ণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, প্রতিটি স্বর্ণের চালান বা ‘বার’ নিরাপদে বের করে দেওয়ার জন্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। কেউ কেউ বাথরুম ব্যবহার করে শরীর বা পোশাকের বিভিন্ন স্থানে স্বর্ণ লুকিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিনই একাধিক যাত্রী বিদেশি সিগারেটের পূর্ণ ব্যাগেজ নিয়ে চট্টগ্রামে নামেন। কোনো কোনো দিন ১০ থেকে ১২ জন, আবার কখনো ১৫ থেকে ১৬ জন পর্যন্ত যাত্রী বিপুল পরিমাণ সিগারেট নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যান বলে সূত্রের দাবি। একইভাবে প্রতিদিন স্বর্ণের চালানও আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল অর্থমূল্যের পণ্য কোনো সাধারণ যাত্রী নিজের ঝুঁকিতে নিয়মিত বহন করবেন কেন?
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একটি বড় পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এই চক্রের মূল সমন্বয়কারী বা প্রধান হিসেবে ৪ থেকে ৫ জন ব্যক্তি সক্রিয় থাকতে পারেন। তারা বিদেশে অবস্থানকারী সরবরাহকারী, দেশে থাকা গ্রহণকারী এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ও ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি দুবাই থেকে চট্টগ্রামে আসা এক যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই-তিন দিন আগে তিনি দুবাই থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দরে আসার সময় প্রায় ১৫ জন যাত্রীকে বিদেশি সিগারেট নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেখেছেন। তার ভাষ্য, এসব যাত্রীর কাউকে আটক করতে দেখা যায়নি। অথচ বিভিন্ন সময়ে সাধারণ প্রবাসী বা যাত্রীদের কাছ থেকে সিগারেট ও স্বর্ণ আটক হওয়ার ঘটনা ঘটে।
ওই যাত্রীর বক্তব্য, ‘যাদের যোগাযোগ আছে তারা অনেক সময় বের হয়ে যায়, আর সাধারণ প্রবাসীরা ধরা পড়ে’ এমন ধারণা অনেক যাত্রীর মধ্যেই তৈরি হয়েছে। তবে এই বক্তব্যেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহও বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। শাহ আমানত বিমানবন্দরে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সিগারেট ও স্বর্ণ জব্দ করেছে কাস্টমসসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা। কখনো শত শত কার্টন সিগারেট, কখনো কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এসব চালানের পেছনে থাকা অর্থদাতা, সরবরাহকারী, গ্রহণকারী ও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের কতজনকে শনাক্ত করা হয়েছেসে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অতীতেও শাহ আমানত বিমানবন্দরে চোরাচালানের ঘটনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার নজির রয়েছে। ২০২৩ সালে বিমানবন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছয়টি সোনার বার উদ্ধারের ঘটনায় একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে এবং তাকে বদলি করা হয়। ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতেও বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের স্বর্ণসহ আটকের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
তবে অতীতে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই বর্তমানের কোনো কর্মকর্তা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনার আলোকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা বা যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, একজন যাত্রী বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য নিয়ে একাধিক নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করে বাইরে বের হয়ে গেলে শুধু বহনকারীকে আটক করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পণ্যটি কার কাছ থেকে পেয়েছে, কার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং এর বিনিময়ে কত টাকা পাওয়ার কথা ছিল এসব তথ্য বের করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের তথ্য, যাত্রী চলাচলের রেকর্ড, ডিউটি রোস্টার, সন্দেহভাজন যাত্রীদের পূর্ববর্তী যাতায়াতের তথ্য এবং আটক হওয়া চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা।
কারণ, একটি চালান আটক করা নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাফল্য। কিন্তু একই পদ্ধতিতে যদি প্রতিদিন আরও বহু চালান বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে শুধু বহনকারীকে আটক করে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তাই প্রশ্ন উঠছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন যদি এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও বিদেশি সিগারেট প্রবেশ করে, তাহলে সেগুলো কারা পাঠাচ্ছে? কারা গ্রহণ করছে? কারা বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে? আর মাঝেমধ্যে যেসব চালান ধরা পড়ছে, সেগুলো কি কেবল সমন্বয়ের ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোনো চক্র?
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ ও সিগারেট চোরাচালানের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, শুধু বাহক নয়, চোরাচালানের অর্থদাতা, সমন্বয়কারী, গ্রহণকারী এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
ডিএস./




















