পড়াশোনা করেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর ব্যস্ত থাকার কথা ছিল ফাইবার, সুতা, কাপড় কিংবা তৈরি পোশাক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কিন্তু প্রথাগত চাকুরির পেছনে না ছুটে তিনি বেছে নিয়েছেন এক ব্যতিক্রমী পথ। কাজ করছেন গরু, দুধ, ঘাস, গোবর, বায়ুগ্যাস, দই ও ঘি নিয়ে। আর এই ভিন্নধর্মী পেশায় গিয়ে অর্জনে যোগ করেছেন অভূতপূর্ব সাফল্য। তিনি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা ও সফল খামারি মো. ইয়াছিন আরাফাত। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন বন্দরনগরী ভৈরব বাজারের শহীদ আশুরঞ্জন সড়ক এলাকায়।
তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর পিতা, এলাকার প্রখ্যাত শিল্পপতি, বিশিষ্ট দানবীর ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব মো. ফজলুর রহমান-এর মেধা, শ্রম ও অনুপ্রেরণা। যাকে সবাই ভালোবেসে এবং শ্রদ্ধা করে ডাকেন “বস্ ফজলু ভাই” নামে। পিতা ও পুত্রের এই যুগলবন্দী উদ্যোগে আজ কুলিয়ারচর ও ভৈরব অঞ্চলে সূচিত হয়েছে এক নতুন কৃষি-শিল্প বিপ্লব।
জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (NITER) থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর নিজ জন্মভূমি কুলিয়ারচর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে পিতা ফজলুর রহমানের অনুপ্রেরণায় নিজেদের ৩ একর জমির ওপর ২০১৮ সালে মাত্র ৪টি গাভী নিয়ে ‘বস্ এগ্রো ফার্ম’ নামের একটি ডেইরি খামার গড়ে তোলেন ইয়াছিন আরাফাত। তাঁর সততা ও নিরলস পরিশ্রমে সেই ছোট্ট খামারটি আধুনিক উপায়ে ৪টি বিশাল শেডে আজ দেশি-বিদেশি জাতের দেড় শতাধিক গরুর এক বিশাল এগ্রো ফার্মে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে খামারের প্রায় ৭০ শতাংশ গরুই নিজস্ব প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি দুগ্ধজাত গাভী রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ লিটার খাঁটি দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
শুরুতে খামারের উৎপাদিত দুধ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করা হতো। পরবর্তীতে ইয়াছিন আরাফাত ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় একটি আধুনিক দই ও ঘি তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। বিএসটিআইসহ সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে বাজারজাত শুরু হয় “বস” দই ও ঘি। গুণগত মানের কারণে খুব অল্প সময়েই ভৈরবসহ পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাড়া ফেলেছে এই ব্র্যান্ড।
এছাড়াও প্রতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও দেশীয় খাদ্যের মাধ্যমে শতাধিক পশু মোটাতাজাকরণ করা হয়। শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় স্থানীয় ক্রেতারা খামার থেকেই পছন্দমতো পশু কিনে নেন, যা থেকে অর্জিত হয় মোটা অঙ্কের মুনাফা।
এদিকে তাঁর এই খামার এবং কারখানায় দক্ষ-অদক্ষ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন।
ইয়াছিন আরাফাতের এই সমন্বিত খামারে রয়েছে বহুমুখী আয়ের উৎস। খামারের ভিতর দেড় একর জায়গায় দৃষ্টিনন্দন দুটি পুকুরে মিশ্র মাছের চাষের পাশাপাশি হাঁস এবং আঙিনায় দেশীয় মুরগী পালন করা হচ্ছে। এসব মাছ ও মুরগিসহ খামারের চারপাশে রোপণ করা কলা, মরিচ, লেবু, আম ও জামগাছ থেকে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ফলমূল, মাছ ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় আসছে। খামারের গোবর থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করছেন তাদের নিজস্ব ১০ একর ধান ও ঘাসের জমিতে। খামারের গোবর ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বায়ুগ্যাস প্ল্যান্ট। বর্তমানে ৪টি চুলার পারিবারিক রান্না শেষে উদ্বৃত্ত গ্যাস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে বড় জেনারেটর বসিয়ে খামারের শতভাগ বিদ্যুতের চাহিদা এই প্ল্যান্ট থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
খামারের পশুগুলোর প্রতি ইয়াছিন আরাফাতের ভালোবাসা এতই গভীর যে প্রতিদিন তিনি খামারে এসে প্রতিটি পশুকে নিজ হাতে আদর-যত্ন করেন। খাবার খাওয়ান। চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা দেন। খামারকে ঘিরে গড়ে তুলা হয়েছে একটি আলিশান প্রাসাদ ও দৃষ্টিনন্দন পুকুর ঘাট।
জানা যায়, কুলিয়ারচরের পশ্চিম ও দক্ষিণ কর্ণারের শেষ প্রান্তে ফরিদপুর গ্রামের মরহুম মো. শহিদ মিয়ার ছেলে মো. ফজলুর রহমান বেশি দূর লেখাপড়া করতে না পারলেও স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে জীবনের শুরু থেকেই একের পর এক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। বন্দরনগরী ভৈরবে ছেলে আরাফাতের নামে গড়ে তুলেছেন ‘আরাফাত কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ (বস্ মশার কয়েল) প্রাইভেট লিমিটেড, যার চেয়ারম্যান তিনি। কেমিক্যাল, কয়েল ও বিভিন্ন ফুড প্রডাক্টের ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করে ইতোমধ্যে তিনি দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছেন।
তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, অত্যন্ত অমায়িক ও বিনয়ী একজন মানুষ। নিজের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের সাথে মিলেমিশে কাজ করতেও তাঁর কোনো দ্বিধা নেই। এলাকার দরিদ্র, অসহায় মানুষ, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের অকাতরে দান ও সহযোগিতা করে তিনি লাভ করেছেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা।
তরুণ উদ্যোক্তা মো. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, “সফলতার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়, পরম দক্ষতা এবং কাজের প্রতি মায়া ও ভালোবাসা প্রয়োজন। যারা এই খাতে আসবেন, তাদের আবেগ ও মমতা নিয়ে আসতে হবে।”
কুলিয়ারচর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বস্ এগ্রো ফার্মের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, “বস্ এগ্রো ফার্ম আমাদের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের বর্তমান উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই অর্জিত সাফল্য আমাদের সবাইকে মিলে ধরে রাখতে হবে।” কুলিয়ারচরসহ আশেপাশের এলাকায় পুষ্টির চাহিদা পূরণে ফার্মটির ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি আরও জানান, কুলিয়ারচর ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দুধ, মাংস ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া কুলিয়ারচরের অন্যান্য ডেইরি ফার্মের তুলনায় বস্ এগ্রো ফার্মের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডেইরি পণ্যের পাশাপাশি মিষ্টি, দই ও ঘি’র মতো বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনেও প্রতিষ্ঠানটি অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. শাহীনুল হক জানান, “একজন উচ্চশিক্ষিত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার খামার সেক্টরে এসে যে চমৎকার সাফল্য দেখিয়েছেন, তা অনন্য। শিক্ষিত তরুণরা এভাবে এগিয়ে এলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে বড় পরিবর্তন আসবে। আমাদের দপ্তর থেকে তাঁদের সব ধরণের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”
ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, “স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন আমিষ ও পুষ্টিকর খাবার। প্রকৌশলী হয়েও ইয়াছিন আরাফাত চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে নিরাপদ দুধ, দই, ঘি ও মাছ সরবরাহ করে জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন।”
পিতা ও পুত্রের এমন অনন্য উদ্যোগ কিশোরগঞ্জ জেলা ছাপিয়ে এখন সারাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য এক মহা অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
ডিএস./



















