প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আগে জারি করা দুটি সার্কুলার কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদহার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া গ্রাহককে দেয়া সুদহারের মধ্যে কোনো গরমিল আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই দুই ধরনের সুদহারের মধ্যে গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণ ছাড়াও আমানতের সুদের হারের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদহার ও গ্রাহককে দেয়া সুদহারের মধ্যে কোনো গরমিল রাখা যাবে না। অর্থাৎ যে সুদহার তারা ঘোষণা করবে সেই হারেই গ্রাহককে দিতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো ভালো ঋণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঘোষিত সুদহারের চেয়ে দেড় শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারবে। আবার মন্দ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দেড় শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারবে।
অর্থাৎ ঘোষিত সুদ হারের চেয়ে ৩ শতাংশ পর্যন্ত গ্রাহকভেদে এ নিয়মে পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারের বাইরে গিয়ে এর কমবেশি করা যাবে না।
অভিযোগ আছে, অনেক সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ সার্কুলারটি বাস্তবায়ন করলেও সেখানে পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নিয়ে একপাক্ষিকভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলকে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, উল্লেখিত দুটি সার্কুলার অনেক আগেই জারি করা হলেও এতদিন তা ওই অর্থে মানা হচ্ছিল না। তবে বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা সম্ভব হবে না।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন গ্রাহকের পক্ষ থেকে অভিযোগ এসেছে, ব্যাংকগুলো সুদহারের যে ঘোষণা দিচ্ছে সেটি তারা মানছে না। সার্কুলারের বাইরে গিয়ে গ্রাহকভেদে সুদহারের তারতম্য করা হচ্ছে।
এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যিকগুলো ঘোষিত হার অনুযায়ী গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদ আদায় করছে কিনা তা দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল এ মাসের শুরুর দিকে ব্যাংকগুলোতে গিয়ে গ্রাহকদের হিসাবে দেয়া সুদের হারের তথ্য সংগ্রহ করে।
এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রতি মাসে তাদের ঘোষিত সুদ হারের একটি তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করে। তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তৈরি করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া ও ব্যাংকের ঘোষিত সুদহার মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, সুদের হার ব্যাংকগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করবে। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নীতিমালা রয়েছে। ঘোষিত ও কার্যকর সুদ হারের মধ্যে কোনো গরমিল থাকতে পারবে না। নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবেই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যালোচনা করছে।
সূত্র জানায়, শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ঋণের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়া এবং এই হার কমানোর জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এমডি-চেয়ারম্যানরা অঙ্গীকার করার পরও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের হার কমানোর জন্য বাড়তি চাপ প্রয়োগ করার লক্ষ্য নিয়ে এ তদন্ত করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা যায়, সরকারি খাতের ৮টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক জুলাই থেকেই ঋণের সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে।
বেসিক ব্যাংক ৯ আগস্ট থেকে এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৬ সেপ্টেম্বর থেকে বেশির ভাগ ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক জুলাইয়ের শেষদিকে সুদহার কমিয়েছে।
বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৮টি ব্যাংকই ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনেনি। এ খাতের মাত্র দুটি ব্যাংক আইএফআইসি ও ঢাকা ব্যাংক বেশির ভাগ ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়েছে।
ইসলামী শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংকগুলো এ বছরের শেষদিকে সিদ্ধান্ত নেবে। কেননা তারা বছর শেষে আয়-ব্যয়ের ওপর বিনিয়োগের মুনাফার হার নির্ধারণ করে। বিদেশি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো নির্দেশনা পায়নি বলে তারা সুদের হারের বিষয়ে বিশেষ কিছু করছে না। তবে প্রতিযোগিতার স্বার্থে তারাও সুদের হার কমাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি করে ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদহার যাতে কার্যকর হয় সেটি নিশ্চিত করতে পারবে। এর বাইরে সরাসরি নির্দেশ না দিয়ে ঋণের সুদের হার কমাতে পারবে না। বর্তমানে বাজার অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট কিছু খাত ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বেঁধে দিয়ে নির্দেশ দিতে পারে না।
প্রসঙ্গত, বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের ঘোষণা অনুযায়ী ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং ছয় মাস মেয়াদি আমানতের সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ঋণ ও আমানতের মধ্যকার ব্যবধান বা স্প্রেড ৪ শতাংশের নিচে থাকার কথা।
প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের বাইরে গিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ঘোষিত সুদহারের চেয়ে কম বা বেশি আদায় করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাখ্যা চাইতে পারে, ব্যাংকের জবাবে সন্তুষ্ট না হলে তিরস্কার বা জরিমানা করতে পারে। এছাড়া পর্ষদ বা এমডির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে।
বিবি/জেজে


























