বহু প্রতীক্ষিত সংলাপ শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪ দল প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টাব্যাপী সংলাপ করেছে। গতকাল শুক্রবার বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ হয়। শুরু হওয়া এ সংলাপকে ইতিবাচক মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সংলাপের ফলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল কিছুটা হলেও তা কেটেছে। পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। গতকাল শুক্রবার ভোরের কাগজের সঙ্গে এমনই মন্তব্য করেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দলের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, এ আলোচনায় বিশেষ কোনো সমাধান তারা পাননি। আর জোটের সবচেয়ে বড় দল বিএনপির ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় তারা সন্তুষ্ট নন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, সংলাপ শুরু হয়েছে। আরো হবে। আশা করি, সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতির আরো উন্নয়ন ঘটবে। তবে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সংলাপে অংশ নেয়া ১৪ দলের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন মনে করেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এবং ১৪ দলের সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছে তা ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং যতটুকু সম্ভব মেনে নেয়া যায় সে বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেয়া, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন বা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এ বিষয়গুলো মেনে নেয়া যায় না।
খালেদা জিয়ার বিষয়টি আদালতের ব্যাপার। সেখানে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কিছু করার থাকে না। আর সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে কিনা তা নির্ভর করছে ঐক্যফ্রন্টের ভাবনা আর আমাদের ভাবনার মধ্যে কতটা মিল তার ওপর। তবে তাদের বেশকিছু বিষয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যদিও সংলাপে বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু তাদের সবকিছু তো লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের নির্দেশে চলে। তবে আমি আশা করি এবারের জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংলাপ শুরু হওয়াটাই ইতিবাচক। পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, বিএনপি সংলাপ নিয়ে খুশি নয়। তবে সংলাপ হয়েছে, দুপক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের মতামত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন এটা ভালো দিক। প্রধানমন্ত্রী তো জানিয়েছেন সংলাপ চলবে এবং তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। একদিকে নির্বাচনের তফসিল হবে অন্য দিকে সংলাপ চলবে। ফলে নিশ্চয়ই একটা গ্রহণযোগ্য পথ বের হবে, সমঝোতাও হবে। সংলাপে রাজনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর সুষ্পষ্ট কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের অনেকেই খুশি হতে পারেননি।
তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সুযোগ নেই বলে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে দাবি ঐক্যফ্রন্টের মূল বিষয় ছিল। সংলাপের পরে বিএনপির মন্তব্য দেখে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আস্থার সংকট আরো ঘনীভ‚ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে গেল। তবে এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে তা বলা যায়। কিন্তু ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
আরেক সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহম্মদ ছহুল হুসাইন মনে করেন, সব কিছুর সমাধান হতে পারে ফলপ্রসূ সংলাপের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে একটা সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বের হয়ে আসবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন আলোচনা করছেন, তখন নিশ্চয়ই একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যাতে হয় সে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেবেন। তবে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সংলাপের মাধ্যমে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে মাত্র। আমরা সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং ইসি পুনর্গঠনের দাবি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাব। সংলাপ আরো হচ্ছে, আমাদের সঙ্গেও হবে। দেখা যাক সংলাপের মাধ্যমে কি ফল বেরিয়ে আসে। যদি পরিবেশ পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূল হয় তাহলে আমরা বাম জোট নির্বাচনে অংশ নেব, তা না হলে নির্বাচন বয়কট করব।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা আমেনা মহসিন বলেছেন, সংলাপ একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। দুপক্ষ একত্রে বসে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেছেন, শুনেছেন। সংলাপ আরো হবে… হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তার ওপর ভরসা রাখতে বলেছেন দেখা যাক বরফ কতটা গলে।
এদিকে সংলাপের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির বিজভী বলেছেন, বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, ক্ষমতাসীনদের অনড় অবস্থানের কারণে তা ফিকে হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, সংলাপে সরকারের একগুঁয়ে মনোভাব গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আর ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নির্ভর করছে আদালতের ওপর। তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি, নেতাকর্মীদের ধড়পাকড় বন্ধসহ তিনটি দাবি মেনে নেবার কথা বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকেই সংলাপের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এতদিন আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে আসা শেখ হাসিনা অপ্রত্যাশিতভাবেই তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘সংবিধানসম্মত বিষয়ে’ আলোচনার জন্য ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানান। গতকালও বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরে বাম দল ও জাতীয় পার্টির সঙ্গেও সংলাপ হবে।
বিবি/রেআ

























