আর মাত্র চার দিন পরই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই সর্বত্রই এখন নির্বাচনী আমেজ। অথচ এই সময়ে একটি মহল পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কমপক্ষে ৭০টি পোশাক কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। চালু অনেক কারখানায়ও শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। সরকার এবং তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সহযোগিতায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানা গেছে। অধিকাংশ বন্ধ কারখানাও চালু হয়েছে।
তারপরও নির্বাচন সামনে রেখে দাবি আদায়ের পাঁয়তারার পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বা শ্রমিক সংগঠনের ইন্ধন রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
এদিকে অসন্তোষ বন্ধে ইতোমধ্যে বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ওই কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে আরো রয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতি এবং শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক। কমিটি পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি মনিটর করবে। এ ছাড়া কমিটি প্রতি ৭ দিন পর পর সভা করে পোশাক শিল্পের সার্বিক অবস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করবে।
সভায় আরো ৬টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এগুলো হচ্ছেÑ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থা স্থানীয় প্রশাসন পোশাক শিল্পের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে এবং পোশাক শিল্পের সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ বজায় রাখার জন্য বিজিএমইএ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তৈরি পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্স পরিস্থিতির উন্নয়নে গঠিত রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশনস সেলের (আরসিসি) সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এবং অসমাপ্ত রেডিয়েশন কার্যক্রম দ্রæত সম্পন্ন করতে হবে।
তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে বহিরাগত কোনো লোক যাতে কর্ম-পরিবেশ বিঘিœত করতে না পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থা বা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা সার্বক্ষণিক সচেষ্ট থাকবেন। প্রত্যেক জেলার জন্য বিজিএমইএ ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করবে। বিজিএমইএ পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি নিয়মিত পরিশোধের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এবং সাত শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য শিল্পাঞ্চল পুলিশের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে, পাশাপাশি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন
অধিদপ্তর তাদের নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকরা বর্ধিত হারে বেতন পাবেন। নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি নেই। প্রধানমন্ত্রী সর্বনি¤œ বেতন আট হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আমরা সেটা মেনে নিয়েছি। তারপরও নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি মহল গার্মেন্টস শিল্পে অসন্তোষ সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে।
তিনি জানান, গাজীপুরের কিছু ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা কাজ করেননি, তাদের অভিযোগ বেতন কম বাড়ানো হয়েছে। তবে ইতোমধ্যেই আমরা পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে নিয়েছি। আগের চেয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আশা করছি দুই তিন দিনের মধ্যে সব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, সামনে নির্বাচন আছে, এ সময় আমরা কাউকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেব না। তা যেই হোক না কেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ নেই। এমনকি শ্রমিক সংগঠনগুলোও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। অথচ পুরনো ইস্যুকে সামনে এনে একটি বিশেষ মহল দেশের পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের নামে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছে। নির্বাচনের আগে এ নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। কেননা দেশের তৈরি পোশাক খাত একটি স্পর্শকাতর খাত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশে^র উন্নত রাষ্ট্রের বায়ারদের নজর রয়েছে এদিকে। তাই এই খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচাল করাই তাদের উদ্দেশ্য। বিষয়টি বুঝতে পেরেই সরকার এই খাতে কঠোর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা গেছে, নির্বাচন শেষে বিজয়ী দলের নেতৃত্বে নতুন সরকারের শপথ ও দায়িত্বভার না নেয়া পর্যন্ত এ নজরদারি চলবে। ইতোমধ্যেই তৈরি পোশাক খাত অধ্যুষিত অঞ্চল নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও টঙ্গী এলাকায় অবস্থিত তৈরি পোশাক কারখানাগুলো নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘শ্রমিক নেতাদের’ গতিবিধিও নজরে রাখছেন দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ দায়িত্ব পালন করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে সরকার গঠিত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর কমিটিও একই কাজ করছে বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ : রাজধানীর মিরপুরে বেতনভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কালশী ও পল্লবীর সড়কে অবস্থান নেয় শত শত শ্রমিক। এতে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। এ ঘটনায় কোনো ভাঙচুর বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী এক শ্রমিক জানান, কালশীর একটি ২২তলা গার্মেন্টসের শ্রমিকসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গার্মেন্টেসের শ্রমিকরা পাওনা বেতনভাতার দাবিতে মিরপুর ৬, ৭ ও ১২ নম্বরের রাস্তায় অবস্থান নেয়। বকেয়া বেতনভাতার দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করে। পরে মালিক পক্ষের আশ্বাসে সড়ক থেকে সড়ে যায়।
পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, শ্রমিকরা অল্প কিছুক্ষণের জন্য সড়ক অবরোধ করেছিল। এ ঘটনায় কোনো ভাঙচুর বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি পুরো স্বাভাবিক রয়েছে।
বিবি/রেআ


























