ঢাকা সন্ধ্যা ৬:৫৬, বৃহস্পতিবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গার্ড থেকে রাজউকের উচ্চমান সহকারী মালেকের অর্ধশত প্লট!

এম এ মালেক, অফিসে যিনি আব্দুল মালেক নামেই পরিচিত। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউকের)চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি গার্ড হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন রাজউকের উচ্চমান সহকারী। রাজউক বহুমুখী সমবায় সমিতির বর্তমান সভাপতিও তিনি।
নকল সনদ দিয়ে চাকরিতে পদন্নতি, নামে-বেনামে অসংখ্য প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক এবং কর্মচারি সমবায় সমিতির নামে কয়েক’শ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মালেকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বর্তমানে তদন্ত করছে দুদক। তার সকল অভিযোগের নথিপত্রের অণুলিপি পরিবর্তন ডটকমের কাছে রয়েছে।
১৯৮৮ সালে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে চাকরি পাওয়া এবং ভাটারা, উত্তরা, পূর্বাচল ও ঝিলমিল এলাকায় প্লট ও জমি ক্রয়ের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করার সুপারিশ রাজউককে দেয় দুদক। মালেকের নামে এই অভিযোগ তোলেন রাজউকেরই নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক মোশাররফ হোসেন (স্কাই)।
মোশাররফের অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, আব্দুল মালেক ১৯৮৩ সালে গার্ড পদে চাকরি শুরু করেন। রাজউক কর্তৃপক্ষ ১৯৮৮ সালে নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক স্থায়ী পদে লোক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাশ এবং বাংলা ও ইংরেজি টাইপের প্রতি মিনিট ২০ থেকে ২৫ শব্দ উল্লেখ ছিলো।
সে সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ৪৪ জন উর্ত্তীর্ণ হন। কিন্তু আব্দুল মালেক লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন নি। (রাজউকে কোনো রেকর্ড নেই)। অথচ এসএসসি পাশ না করেও তিনি ৪৪ নম্বর সিরিয়ালে নিয়োগ পান। আব্দুল মালেকের চাকরি বৈধ নাকি অবৈধ দুদক চেয়রাম্যানের কাছে অভিযোগ করেন মোশাররফ হোসেন।
তৎকালীন রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) সুশান্ত চাকমা চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পরিচালক-৩ খন্দকার ওলিউর রহমানকে আগামী ২০ দিনের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশের চিঠি দুদক সচিব ও রাজউক চেয়রাম্যান বরাবর পাঠানো হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদন আজও পৌঁছায়নি রাজউক পরিচালকের (প্রশাসনের) কাছে।
তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) মো. শামসুল আরেফিন বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, এ বিষয়ে কিছু জানি না।’
তৎকালীন রাজউক পরিচালক (প্রশাসন) সুশান্ত চাকমা বর্তমানে রাজউক সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। তার কাছে ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের যে নির্দেশ ছিলো, সেই তদন্তের প্রতিবেদন কি ছিলো? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর প্রশাসনের দায়িত্বে নেই। যে দায়িত্বে রয়েছেন তাকে জিজ্ঞেস করুন।’
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর এম এ মালেকের বিরুদ্ধে ২৩টির অধিক ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ তুলেছেন উত্তরা এলাকার ১০ বাসিন্দা। সেখানে উল্লেখ রয়েছে- গার্ড এম এ মালেক বর্তমানে রাজউকের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আতঙ্ক। শুধু আতঙ্ক নয়, তার নামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পত্তি। এসএসসি পাশ না করে নিম্নমান মুদ্রণের চাকরি পেয়ে তার পদের উন্নতি হয়। বর্তমানে তিনি রাজউক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি।
এছাড়া মালেকের বিরুদ্ধে রাজউকের নিম্নমান সহকারী কাম-মুদ্রাক্ষরিক মো. মোশারফ হোসেন (স্কাই)একাধিক দুর্নীতির অভিযোগসহ অবৈধভাবে চাকরিতে যোগদানের প্রমাণ স্বরূপ দুদকে নথি দাখিল করেন (যার সকল নথিপত্র পরিবর্তন ডটকমের কাছে রয়েছে)।
সেই সঙ্গে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগের শেষে আবেদন জানান, ‘এম এ মালেককে আইনের আওতায় এনে বিচার করার।’
উত্তরার ১০ এলাকাবাসীর অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে- আব্দুল মালেক একজন গার্ড ছিলেন, তিনি এখন রাজউকের লর্ড। শিবচরের বোহেরা টোলা তার গ্রামের বাড়ি। সেখানে শতাধিক জমির মালিক।
এছাড়া বাড্ডা পূর্বাঞ্চল এলাকায় ১২নং রাস্তার ১৪নং প্লটে ৬ তলা বাড়ির মালিক। জহুরুল ইসলাম আফতাব নগর আবাসিক এলাকায় ডি-ব্লকের রোড-২ এর ১৪নং প্লটের উপরে ৭তলা বাড়ির মালিক। উত্তরা ৪নং সেক্টরের ১১নং রাস্তার ৫২নং প্লটের মালিক। উত্তরা আবাসিক এলাকায় নামে বেনামে ২৫টি প্লটের মালিক আব্দুল মালেক।
এমনকি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্রায় ৬০টি প্লটের মালিক মালেক ও তার পরিবার।
অভিযোগ রয়েছে, নবাবপুরে মালেকের ছোট স্ত্রীর ভাইয়ের ব্যাংক একাউন্ট থেকে সকল লেনদেন হয়ে থাকে। এছাড়া মালেকের নামে সিটি ব্যাংক জীবন বীমা ভবন মতিঝিল শাখা থেকে কোটি টাকার লেনদেন হয়।
কর্মচারীদের বদলী/প্রমোশন সব কিছু টাকার বিনিময়ে কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে করান মালেক। রাজউকের সাবেক চেয়রাম্যান ইঞ্জিনিয়ার নুরূল হুদা ও ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল আবেদিন মালেক বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন বলেও উল্লেখ রয়েছে অভিযোগপত্রে।
উত্তরা এলাকার ১০ বাসিন্দা- রফিক, হাছান মাহমুদ, মো. মনির, মিজানুর রহমান, মো. সাইদুর রহমান, মো. মিজানুর রহমান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. জাহিদুল ইসলাম, ফরিদ ও মো. আনোয়ার আলীর অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ রয়েছে, ‘মালেকের দ্বিতীয় স্ত্রী সেলিনা বেগম রাজউকের কর্মচারী হলেও তিনি অফিসে কাজ করেন না। শুধু বেতন নিয়ে যান। এছাড়া দুদক বিরোধী মিছিলে ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট অংশ নেন মালেক। সে সময় দুদকের একজন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করেন তিনি।’
এছাড়া রাজউক নিম্নমান সহকারীর অভিযোগে সম্পদের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে, মালেকের নামে ভাটারায় এক বিঘা রয়েছে। পূর্বাচলে ২টি ৩ কাঠা প্লট কিনেছে মালেক। উত্তরা সেক্টর-৫ এর রোড-৯ এর প্লট- ২৬, সেক্টর-১১ এর রোড-৭ এর প্লট-২১ এর মালিক মালেক।
মালেকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি রাজউক চেয়রাম্যান বরাবর চিঠি পাঠান।
অবশ্য দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এম এ মালেক।
তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘নির্বাচনে আমার কাছে হেরে গিয়ে এসব মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে অনেকে।’
তার দাবি, ‘আমার নামে অভিযোগ ছিলো, তা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এখন আর কোনো অভিযোগ নেই। এসব মিথ্যা কথা শুনে নিউজ লিখবেন না। একদিন আসেন চা খেয়ে যাবেন।’
‘আফতাব নগরের বাড়ি আমার না। আমার স্ত্রীর ভাইয়ের। ২০ বছর আগে তারা জমি পাশ করিয়েছে। আমার বউয়ের মামাতো ভাই, তার ছেলের নামে জমি পাশ করিয়েছে। আমি কাজ করে দিয়েছি। রাজউকের লোক মাঝে মধ্যে সেখানে গিয়েছে, অনেকে ভেবেছে আমার বাড়ি,’ সম্পদের ব্যাপারে এভাবেই ব্যাখ্যা দেন অভিযুক্ত এম এ মালেক।
আর অন্যান্য বাড়ি ও প্লটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে হেরে মানুষ এখন আমার বাড়ি-গাড়ি যা খুশি বানিয়ে দিচ্ছে।’
তিনি আরো দাবি করেন, ‘সনদ জালিয়াতির বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদন আমার পক্ষে এসেছে।’
কিন্তু দেখতে চাইলে সেই প্রতিবেদনের কপি তার কাছে নেই বলে জানান মালেক।
এদিকে মালেকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের তদন্ত এখনো দুদকে চলমান রয়েছে বলে পরিবর্তন ডটকমকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন।
মালেকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে কী পাওয়া গেছে এবং দুদক থেকে কী ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে?
এসব বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এসব নিয়ে আর কী বলবো। তারা প্রথম থেকে এভাবে চলে আসছে। এখন আমাদের কী করার আছে।’

এ বিভাগের আরও সংবাদ