১০:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

এই গল্প জীবন যুদ্ধের

সজিবুর রহমান : মানুষের জীবন অনেকটা মোবাইল বা কম্পিউটারে গেম খেলার মতো, গেমে যেমন প্রত্যেকটা লেভেলে নতুন নতুন চ্যালেন্জ আসে জীবনটাও ঠিক একই রকম। আমাদের সবার জীবনেরই প্রতিটা ধাপে চ্যালেন্জ স্বরূপ আসে কোন না কোন ধরণের বাধা বিপত্তি , যাদের মধ্যে জয় করার ক্ষুধাটা অনেক বেশি তারাই নিজের পরিশ্রম আর বুদ্ধি-বিবেচনার মাধ্যমে শত বাধাবিপত্তি পার করে বিজয়ের স্বাদ গ্রহন করে । আর তারাই হচ্ছে জীবন যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী ।

উপরোক্ত কথাগুলো জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক কিশোরের । ছেলেটির নাম নিলয় দাস (ডাকনাম , নয়ন) বর্তমানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত আছে। নিলয় দুরারোগ্য “ স্পাইনাল টিভি” রোগে আক্রান্ত , যার কারণে সে তার স্বাভাবিক চলাফেরার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে । নিলয়ের বাবা নিতাই দাস পেশায় ছোটখাটো কাগজের ব্যবসায়ী (মিষ্টির প্যাকেট তৈরি) যশোর চাচঁড়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা।দুই ভাইয়ের মধ্যে নিলয়ই বড়। নিলয় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৬ সালে যশোর জিলা স্কুল,যশোর থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এস.এস.সি এবং সরকারি এম.এম কলেজ থেকে জিপিএ ৪.৬৭ পেয়ে এইচ.এস.সি পাশ করে।

সময়টা ২০১৬ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে তখন এসএসসি ব্যববহারিক পরীক্ষা চলছে ,শেষ পরীক্ষার দিন সকালে হঠাৎ করেই নিলয় তার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রথমত সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ে হঠাৎ করে এমন কি হল ??  কোন রকমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তাকে সোজা নিয়ে  যাওয়া হয় যশোর সদর হাসপাতালে। সেখানে তার রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু বলতে না পারায় তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভারতের আর.জি.কর হাসপাতাল(কলকাতা), সেখান থেকে তাকে সাই বাবা হসপিটাল ব্যাঙ্গালুর পাঠানো হয় ।

ব্যাঙ্গালুরতে প্রথম তার রোগ শনাক্ত করা হয় যে, নিলয় দুরারোগ্য  “স্পাইনাল টিভি” রোগে আক্রান্ত। এরপরে ব্যাঙ্গালুর ভিক্টোরিয়া হসপিটালে তার চিকিৎসা করানো হয়। সেখান থেকে তাকে ১৮ মাসের ওষুধ দেওয়া হয় ।এই সময় তার পরিবারকে জানানো হয় যে , তাদের এই চিকিৎসাতে যদি সে ঠিক হয়ে না ওঠে তাহলে তাদের কাছে এই রোগের অন্য কোন চিকিৎসা নাই ।

এরপরে ২০১৬-১৯ সাল পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে সর্বমোট চারবার নিয়ে যাওয়া হয় । সর্বশেষ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ভারতে চিকিৎসার জন্য যায় তখন বলা হয় নিলয়ের জন্য ব্যয়াম ছাড়া আর কোনো চিকিৎসাই এখন বাকি  নেই। সেই থেকে আজ প্রায় চারবছর যাবত নিজের পায়ে হাটাচলার ক্ষমতা হারিয়েছে নিলয় । এখন হুইল চেয়ারই তার চলার একমাত্র সঙ্গী ।

প্রথমবার ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসার পরে শুরু হয়েছিল তার জীবন যুদ্ধের নতুন গল্প , শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই তখন সরকারি এম.এম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় নিলয়। ক্লাসের প্রথম দিনই তার এই অবস্থা দেখে বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে অন্য বিভাগে পড়ার পরামর্শ দেন কিছু  শিক্ষক।

তার পক্ষে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব নয় এছাড়াও আরও প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন তারা । কিন্তু নিলয় তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে , শত প্রতিবন্ধকতার পরেও নিলয় যখন প্রথম অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতে ভাল রেজাল্ট করল তখন তার শিক্ষকদের ভুল ভেঙ্গে যায় । এর পরবর্তীতে তারাই আবার নানা ভাবে নিলয়ের উৎসাহ বাড়িয়ে গেছেন ।

এরপরে এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই তার জীবনের আসে ভর্তি পরীক্ষার নামক আরেক বাধা। আমাদের দেশে একটা প্রচলিত কথা হচ্ছে মেডিকেল , ইজিনিয়ারিং বা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে  চান্স পেতে হলে ভালো কোচিং করতে হবে ।

কিন্তু নিলয়ের পক্ষে কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব না । কারণ একদিকে তার শারীরিক সমস্যা যেমন বাধার সৃষ্টি করছে অন্য দিকে তার বাবার পক্ষেও তাকে কোচিংয়ে নিয়ে আসা-যাওয়া করা সম্ভব ছিল না। কারণ  তার বাবাই পরিবারের একমাত্রর উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

এমনিতেই তার চিকিৎসার খরচ তার পরিবারের অর্থনীতিতে অনেকটাই সংকট সৃষ্টি করেছে অন্য দিকে কোচিংয়ের খরচ তার সাথে যাতায়াতেরও খরচতো আছেই । তার চিকিৎসা বাবদ তখন প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা লেগেছিল । প্রথম দিকে স্কুল থেকে এবং কিছু পরিচিতদের কাছ থেকে সাহায্য পেলেও অধিকাংশটাই তার পরিবার বহন করে।

এছাড়া কলেজ থেকে একজন ব্যাক্তিগত ভাবে কিছু সাহায্য করেছিল । এর জন্য সে সময় নিলয়ের বাবার পক্ষে এত খরচের ভার বহন করা সম্ভব ছিল না । তাই নিলয় কোচিংয়ে ভর্তি হয়নি সে বাসায় দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়ত ।

নিলয় ২০১৮-১৯ সেশনে মেডিকেল সহ ৫ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার অংশগ্রহন করে । নিলয়ের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার কিন্তু হয়ত সৃষ্টিকর্তার অন্য কোন পরিকল্পনা আছে তাকে নিয়ে তারই জন্য হয়তবা তিনি নিলয়ের ইচ্ছে পূরণ করেননি । নিলয়ের ভাষ্যমতে হয়ত “আমার নিজের চেষ্টা যথেষ্ট ছিল না মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য, তাই হয়ত আমি ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পাইনি ।

তাছাড়াও ডাক্তারী পড়ার জন্য যে পরিশ্রম করতে হয় আমার শারীরিক অসুস্থতার জন্য তা আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এরজন্য আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই , সৃষ্টিকর্তার যা করেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন “।

সরকারি মেডিকেলে পড়ার মত স্কোর না করতে পারলেও  নিলয় বশেমুরবিপ্রবিতে  নিজের স্থান করে নেয় ,ভাইবার জন্য ডাক পরলে তার সার্বিক পরিস্থিতির কথা ভেবে বশেমুরবিপ্রবিতে ভর্তি হয় না । নিলয় অনুধাবন করে যশোরের বাইরে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় তাই  সে দ্বিতীয় বারের শুধুমাত্রও যবিপ্রবির জন্য প্রস্থুতি নেয় ।

পরবর্তীতে  ২০১৯-২০ সেশনের যবিপ্রবির ভর্তি পরীক্ষায় এ, বি ইউনিটে নিজের জায়গা দখল করে নেয় নিলয় ।  এরপরে সে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হয় ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিনেই তার মনে সঙ্ককা চলে আসে তার হয়তবা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব নয় ।  কারণ প্রথম দিন তার বাবা যখন তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায় তখনই তার অনুধাবন হয় যে , বাবার পক্ষে তো কাজ বাদ দিয়ে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা নেওয়া করা সম্ভব না । আর তার একার পক্ষেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়া সম্ভব না তাছার আরও অনেক সমস্যা তো আছেই । নিলয় এক প্রকার ধরেই নিল তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব না ।

ঠিক যে মুহূর্তে নিলয় তার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল তখনই তার পাশে এসে দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বন্ধুরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন তার কিছু বন্ধু হয়ে যায় । কয়েক দিনের মধ্যে তার সহযোগিতার জন্য তারা সবাই নিলয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। নিলয়কে বাসে তুলা থেকে শুরু করে তাকে বাস থেকে নামিয়ে শ্রেণি কক্ষে নিয়ে যাওয়া সব কিছু এখন তারাই দেখাশোনা করে। ঠিক যেন নিজের ভাইয়ের মত করে তারা নিলয়ের দেখভাল করে ।

নিলয় এখন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে একজন নিয়মিত ছাত্র , সে প্রতিনিয়ত ক্লাস পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে আর নিলয়ের মতে এসব সম্ভব হচ্ছে তার বন্ধুদের জন্য । এরজন্য সে তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ,তার বন্ধুরা যেন সব সময় এভাবেই তাকে সাহায্য করে নিলয় এই আশাটুকুই তাদের কাছে করে।

নিলয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায় , ভবিষ্যতে ওয়েব ডেভলোপার অথবা অ্যাপ ডেভলোপার হিসেবে কাজ করতে চাই , পাশাপাশি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করব । সর্বপরি নিজের পরিবার, সমাজ দেশের উপর আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে সেই জায়গা থেকে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।

আর এইসব কিছুর পেছনে আমার সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণার জায়গাটি হল আমার মা-বাবা। আমি সত্যিই ভাগ্যবান তাদের মতো মানুষকে নিজের পিতামাতা হিসেবে পেয়েছি।জানি না ভবিষ্যতে কি করতে পারব তাদের জন্য  কিন্তু আমি  আমার সর্বাত্মক চেষ্টা করব তাদেকে সবসময় খুশি রাখার ।

এসময় তিনি জীবনের উপলব্ধি নিয়ে আরও বলেন , এই চার বছরে জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবনে কিছু করতে হলে কোন কিছু নিয়ে কারও প্রতি হিংসা করা উচিত নয়। আর আপনি জীবনে কতটা সুখী আছেন তা জানার জন্য আপনার থেকে যারা বেশি দুঃখ-কষ্টে আছে তাদের দিকে খেয়াল করুন । তাহলেই নিজেকে অনেক বেশি সুখী বলে মনে হবে। আমি হসপিটালে অনেক রোগী দেখেছি যারা আমার থেকে অনেক কঠিন রোগে ভুগছে তারা যদি লড়াই করতে পারে তবে আমি কেন পাড়ব না ?? তাদের দেখেই নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর উৎসাহ পেয়েছি ।

কিছু সময় সৃষ্টিকর্তা  সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া উচিত । কারণ তিনি যা করেন তার পিছনে নিশ্চয় কোনো না কোনো কারণ আছে। সৃষ্টিকর্তাকে কখনো প্রশ্ন না করে নিজেকে সবসময় প্রশ্ন করুন। আপনি নিজেই সব কিছুর উত্তর পেয়ে যাবেন।

আমরা প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধের ময়দানে ছোটখাট বাধা বিপত্তির কাছে  খুব সহজেই হার মেনে নিই । কিন্তু জীবনের এত বড় ধাক্কাকে খুব সহজ ভাবেই মেনে নিয়েছে নিলয়, চলছে নিজের স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে। জীবন যুদ্ধে বাধা বিপত্তি আসবেই কিন্তু যারা এই বাধা বিপত্তি পার করতে পারবে তারাই সফল । জীবনের কোন কিছু থেমে থাকে না , সময়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলাতাই বুদ্ধিমানের কাজ ।

 

বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ভেড়ামারায় প্রশিক্ষণ কর্মশালা, অবহিতকরণ সভা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত

এই গল্প জীবন যুদ্ধের

প্রকাশিত : ০৪:৫৫:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২০

সজিবুর রহমান : মানুষের জীবন অনেকটা মোবাইল বা কম্পিউটারে গেম খেলার মতো, গেমে যেমন প্রত্যেকটা লেভেলে নতুন নতুন চ্যালেন্জ আসে জীবনটাও ঠিক একই রকম। আমাদের সবার জীবনেরই প্রতিটা ধাপে চ্যালেন্জ স্বরূপ আসে কোন না কোন ধরণের বাধা বিপত্তি , যাদের মধ্যে জয় করার ক্ষুধাটা অনেক বেশি তারাই নিজের পরিশ্রম আর বুদ্ধি-বিবেচনার মাধ্যমে শত বাধাবিপত্তি পার করে বিজয়ের স্বাদ গ্রহন করে । আর তারাই হচ্ছে জীবন যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী ।

উপরোক্ত কথাগুলো জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক কিশোরের । ছেলেটির নাম নিলয় দাস (ডাকনাম , নয়ন) বর্তমানে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত আছে। নিলয় দুরারোগ্য “ স্পাইনাল টিভি” রোগে আক্রান্ত , যার কারণে সে তার স্বাভাবিক চলাফেরার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে । নিলয়ের বাবা নিতাই দাস পেশায় ছোটখাটো কাগজের ব্যবসায়ী (মিষ্টির প্যাকেট তৈরি) যশোর চাচঁড়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা।দুই ভাইয়ের মধ্যে নিলয়ই বড়। নিলয় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৬ সালে যশোর জিলা স্কুল,যশোর থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এস.এস.সি এবং সরকারি এম.এম কলেজ থেকে জিপিএ ৪.৬৭ পেয়ে এইচ.এস.সি পাশ করে।

সময়টা ২০১৬ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে তখন এসএসসি ব্যববহারিক পরীক্ষা চলছে ,শেষ পরীক্ষার দিন সকালে হঠাৎ করেই নিলয় তার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রথমত সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ে হঠাৎ করে এমন কি হল ??  কোন রকমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তাকে সোজা নিয়ে  যাওয়া হয় যশোর সদর হাসপাতালে। সেখানে তার রোগ সম্পর্কে তেমন কিছু বলতে না পারায় তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভারতের আর.জি.কর হাসপাতাল(কলকাতা), সেখান থেকে তাকে সাই বাবা হসপিটাল ব্যাঙ্গালুর পাঠানো হয় ।

ব্যাঙ্গালুরতে প্রথম তার রোগ শনাক্ত করা হয় যে, নিলয় দুরারোগ্য  “স্পাইনাল টিভি” রোগে আক্রান্ত। এরপরে ব্যাঙ্গালুর ভিক্টোরিয়া হসপিটালে তার চিকিৎসা করানো হয়। সেখান থেকে তাকে ১৮ মাসের ওষুধ দেওয়া হয় ।এই সময় তার পরিবারকে জানানো হয় যে , তাদের এই চিকিৎসাতে যদি সে ঠিক হয়ে না ওঠে তাহলে তাদের কাছে এই রোগের অন্য কোন চিকিৎসা নাই ।

এরপরে ২০১৬-১৯ সাল পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে সর্বমোট চারবার নিয়ে যাওয়া হয় । সর্বশেষ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ভারতে চিকিৎসার জন্য যায় তখন বলা হয় নিলয়ের জন্য ব্যয়াম ছাড়া আর কোনো চিকিৎসাই এখন বাকি  নেই। সেই থেকে আজ প্রায় চারবছর যাবত নিজের পায়ে হাটাচলার ক্ষমতা হারিয়েছে নিলয় । এখন হুইল চেয়ারই তার চলার একমাত্র সঙ্গী ।

প্রথমবার ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসার পরে শুরু হয়েছিল তার জীবন যুদ্ধের নতুন গল্প , শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই তখন সরকারি এম.এম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় নিলয়। ক্লাসের প্রথম দিনই তার এই অবস্থা দেখে বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে অন্য বিভাগে পড়ার পরামর্শ দেন কিছু  শিক্ষক।

তার পক্ষে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব নয় এছাড়াও আরও প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন তারা । কিন্তু নিলয় তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে , শত প্রতিবন্ধকতার পরেও নিলয় যখন প্রথম অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতে ভাল রেজাল্ট করল তখন তার শিক্ষকদের ভুল ভেঙ্গে যায় । এর পরবর্তীতে তারাই আবার নানা ভাবে নিলয়ের উৎসাহ বাড়িয়ে গেছেন ।

এরপরে এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই তার জীবনের আসে ভর্তি পরীক্ষার নামক আরেক বাধা। আমাদের দেশে একটা প্রচলিত কথা হচ্ছে মেডিকেল , ইজিনিয়ারিং বা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে  চান্স পেতে হলে ভালো কোচিং করতে হবে ।

কিন্তু নিলয়ের পক্ষে কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব না । কারণ একদিকে তার শারীরিক সমস্যা যেমন বাধার সৃষ্টি করছে অন্য দিকে তার বাবার পক্ষেও তাকে কোচিংয়ে নিয়ে আসা-যাওয়া করা সম্ভব ছিল না। কারণ  তার বাবাই পরিবারের একমাত্রর উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

এমনিতেই তার চিকিৎসার খরচ তার পরিবারের অর্থনীতিতে অনেকটাই সংকট সৃষ্টি করেছে অন্য দিকে কোচিংয়ের খরচ তার সাথে যাতায়াতেরও খরচতো আছেই । তার চিকিৎসা বাবদ তখন প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা লেগেছিল । প্রথম দিকে স্কুল থেকে এবং কিছু পরিচিতদের কাছ থেকে সাহায্য পেলেও অধিকাংশটাই তার পরিবার বহন করে।

এছাড়া কলেজ থেকে একজন ব্যাক্তিগত ভাবে কিছু সাহায্য করেছিল । এর জন্য সে সময় নিলয়ের বাবার পক্ষে এত খরচের ভার বহন করা সম্ভব ছিল না । তাই নিলয় কোচিংয়ে ভর্তি হয়নি সে বাসায় দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়ত ।

নিলয় ২০১৮-১৯ সেশনে মেডিকেল সহ ৫ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার অংশগ্রহন করে । নিলয়ের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার কিন্তু হয়ত সৃষ্টিকর্তার অন্য কোন পরিকল্পনা আছে তাকে নিয়ে তারই জন্য হয়তবা তিনি নিলয়ের ইচ্ছে পূরণ করেননি । নিলয়ের ভাষ্যমতে হয়ত “আমার নিজের চেষ্টা যথেষ্ট ছিল না মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য, তাই হয়ত আমি ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পাইনি ।

তাছাড়াও ডাক্তারী পড়ার জন্য যে পরিশ্রম করতে হয় আমার শারীরিক অসুস্থতার জন্য তা আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। এরজন্য আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই , সৃষ্টিকর্তার যা করেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন “।

সরকারি মেডিকেলে পড়ার মত স্কোর না করতে পারলেও  নিলয় বশেমুরবিপ্রবিতে  নিজের স্থান করে নেয় ,ভাইবার জন্য ডাক পরলে তার সার্বিক পরিস্থিতির কথা ভেবে বশেমুরবিপ্রবিতে ভর্তি হয় না । নিলয় অনুধাবন করে যশোরের বাইরে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় তাই  সে দ্বিতীয় বারের শুধুমাত্রও যবিপ্রবির জন্য প্রস্থুতি নেয় ।

পরবর্তীতে  ২০১৯-২০ সেশনের যবিপ্রবির ভর্তি পরীক্ষায় এ, বি ইউনিটে নিজের জায়গা দখল করে নেয় নিলয় ।  এরপরে সে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হয় ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিনেই তার মনে সঙ্ককা চলে আসে তার হয়তবা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব নয় ।  কারণ প্রথম দিন তার বাবা যখন তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায় তখনই তার অনুধাবন হয় যে , বাবার পক্ষে তো কাজ বাদ দিয়ে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা নেওয়া করা সম্ভব না । আর তার একার পক্ষেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যাওয়া সম্ভব না তাছার আরও অনেক সমস্যা তো আছেই । নিলয় এক প্রকার ধরেই নিল তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব না ।

ঠিক যে মুহূর্তে নিলয় তার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিল তখনই তার পাশে এসে দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বন্ধুরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন তার কিছু বন্ধু হয়ে যায় । কয়েক দিনের মধ্যে তার সহযোগিতার জন্য তারা সবাই নিলয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। নিলয়কে বাসে তুলা থেকে শুরু করে তাকে বাস থেকে নামিয়ে শ্রেণি কক্ষে নিয়ে যাওয়া সব কিছু এখন তারাই দেখাশোনা করে। ঠিক যেন নিজের ভাইয়ের মত করে তারা নিলয়ের দেখভাল করে ।

নিলয় এখন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে একজন নিয়মিত ছাত্র , সে প্রতিনিয়ত ক্লাস পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে আর নিলয়ের মতে এসব সম্ভব হচ্ছে তার বন্ধুদের জন্য । এরজন্য সে তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ,তার বন্ধুরা যেন সব সময় এভাবেই তাকে সাহায্য করে নিলয় এই আশাটুকুই তাদের কাছে করে।

নিলয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায় , ভবিষ্যতে ওয়েব ডেভলোপার অথবা অ্যাপ ডেভলোপার হিসেবে কাজ করতে চাই , পাশাপাশি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করব । সর্বপরি নিজের পরিবার, সমাজ দেশের উপর আমার কিছু দায়বদ্ধতা আছে সেই জায়গা থেকে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।

আর এইসব কিছুর পেছনে আমার সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণার জায়গাটি হল আমার মা-বাবা। আমি সত্যিই ভাগ্যবান তাদের মতো মানুষকে নিজের পিতামাতা হিসেবে পেয়েছি।জানি না ভবিষ্যতে কি করতে পারব তাদের জন্য  কিন্তু আমি  আমার সর্বাত্মক চেষ্টা করব তাদেকে সবসময় খুশি রাখার ।

এসময় তিনি জীবনের উপলব্ধি নিয়ে আরও বলেন , এই চার বছরে জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবনে কিছু করতে হলে কোন কিছু নিয়ে কারও প্রতি হিংসা করা উচিত নয়। আর আপনি জীবনে কতটা সুখী আছেন তা জানার জন্য আপনার থেকে যারা বেশি দুঃখ-কষ্টে আছে তাদের দিকে খেয়াল করুন । তাহলেই নিজেকে অনেক বেশি সুখী বলে মনে হবে। আমি হসপিটালে অনেক রোগী দেখেছি যারা আমার থেকে অনেক কঠিন রোগে ভুগছে তারা যদি লড়াই করতে পারে তবে আমি কেন পাড়ব না ?? তাদের দেখেই নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর উৎসাহ পেয়েছি ।

কিছু সময় সৃষ্টিকর্তা  সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া উচিত । কারণ তিনি যা করেন তার পিছনে নিশ্চয় কোনো না কোনো কারণ আছে। সৃষ্টিকর্তাকে কখনো প্রশ্ন না করে নিজেকে সবসময় প্রশ্ন করুন। আপনি নিজেই সব কিছুর উত্তর পেয়ে যাবেন।

আমরা প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধের ময়দানে ছোটখাট বাধা বিপত্তির কাছে  খুব সহজেই হার মেনে নিই । কিন্তু জীবনের এত বড় ধাক্কাকে খুব সহজ ভাবেই মেনে নিয়েছে নিলয়, চলছে নিজের স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে। জীবন যুদ্ধে বাধা বিপত্তি আসবেই কিন্তু যারা এই বাধা বিপত্তি পার করতে পারবে তারাই সফল । জীবনের কোন কিছু থেমে থাকে না , সময়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলাতাই বুদ্ধিমানের কাজ ।

 

বিজনেস বাংলাদেশ / আতিক