১১:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

টেকনাফে ওসির টর্চার সেলের সন্ধান, রাতে শুনা যেত মানুষের আর্তনাদ

শান্তি, শৃঙ্খলে, নিরাপত্তা, প্রগতি এই চার নীতি নিয়ে গঠিত দক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের ৮ থানার একটি হচ্ছে টেকনাফ মডেল থানা। বাংলাদেশ পুলিশের প্রচলিত প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক থানার বাহিরে আর কোন থানা বা ফাঁড়ি থাকে না। তবে, আইনশৃংখলা বাহিনীর একান্ত প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উর্ধতনের অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ ফাঁড়ির ব্যবস্থা থাকতে পারে। কিন্তু টেকনাফ থানা ছিল এর উল্টো।

টেকনাফ প্রশাসনিক মডেল থানা ও ফাঁড়ির বাহিরে ছিল সদ্য বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের টর্সাল সেল, যাকে ঐ এলাকার মানুষ জাহান্নাম হিসাবে আখ্যা দিয়েছিল। জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত কয়েকটি টর্চার সেলের মধ্যে একটির সন্ধান পাওয়া গেছে। যা টেকনাফ সদর ইউনয়নের নাজির পাড়া গ্রামের নুর মোহাম্মদের বাড়ী।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাড়ীর মালিক ছিলেন নুর মোহাম্মদ তবে তিনিও পুলিশের কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। প্রদীপ আটকের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে রাতের অন্ধকারে সেই আস্তানা ত্যাগ করে সেখানে অবস্থান নেওয়া প্রদীপের একটি পুলিশ টিম। জানা যায়, পুলিশ বাড়িটিকে আটক আসামীদের টর্সাল সেল ও মুক্তিপণ আদায়ের নিরাপদ আস্তানা হিসাবে ব্যবহার করত। প্রতিরাতে ভেসে আসত অসহায় মানুষের কান্নার আওয়াজ।

সেনা বাহিনীর মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন পুলিশের গুলিতে নিহতের পর এসব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রদীপের জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বর্তমানে বাড়িটি একদম ফাঁকা পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুলিশের পুরাতন পোষাক, পুলিশের জুতা, থানার সাধারণ ডায়েরী খাতা ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির অলিখিত চেক, মদের বোতল ও ইয়াবা সেবনের জিনিষপত্র এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খোঁজ করে নুর মোহাম্মদের মায়ের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, কয়েক মাস পূর্বে পুলিশ তাদের মারধর করে বাড়ী থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয়। এর পর হতে বাড়ীটি পুলিশের দখলে ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অপরিচিত সুন্দরী নারীদের আনাগুনা দেখা যেত প্রায় সময়। এর পরও পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। বাড়ীর মালিক নিহত নুর মোহাম্মদ এর স্ত্রী লায়লা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্বামী একজন মুদির দোকানদার ছিল। হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে আমার স্বামীকে দোকান হতে তুলে নিয়ে যায়। তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। স্বামীর জীবন বাঁচাতে স্বর্ণের গহনা বিক্রি ও আত্বীয় স্বজনের নিকট হতে কর্জ করে ৩ লাখ টাকা পুলিশের হাতে প্রদান করি। এর পর দাবীকৃত সর্ম্পুর্ন টাকা দিতে ব্যার্থ হওয়ায় ওসি প্রদীপ এর নির্দেশে আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করে মাদক ও অস্ত্র মামলার আসামী করা হয়। অবুঝ ৩ কন্যা সন্তানদের নিয়ে বসত বাড়ী ছেড়ে অন্যের বাড়ীতে অবস্থান করতে হচ্ছে। আমার নিরপরাধ স্বামী হত্যা ও বাড়ীটি ফেরত পেতে সাহায্যের দৃষ্টি কামনা করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি জানান, গভীর রাতে পুলিশের দখলে নেওয়া ওই বাড়ী হতে মানুষের আর্ত্মচিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসত। মানুষের চিৎকারের আওয়াজ শুনে মানুষ ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতো।

টেকনাফ মডেল থানার একজন কর্মকর্তা জানান, এটি মাদক কারবারীর বাড়ী আদালতের নির্দেশে বাড়ীটি খালি করে রাখা হয়েছে, তবে পুলিশের অবস্থান সম্পর্কে আদালতের কোন নির্দেশ ছিল না।

এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আবুল ফয়সল কে এই বিষয়ে অবগত করা হলে বলেন, আমি মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এটিই খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে টেকনাফের বহিস্কৃত ওসি প্রদীপের অত্যাচারে একসাথে চারজন মানুষ দাড়িয়ে কথা বলতে পারত না। তার বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হত এসব টর্চার সেলে। আদায় করা হত লক্ষাধিক টাকা। প্রতিদিন কোন না কোনভাবে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করতেন প্রদীপ সহ তার বাহিনী।

টেকনাফের সাধারণ মানুষ নাজির পাড়ায় সাংবাদিকদের উপস্থিতি জানতে পেরে বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হতে থাকে, তারা জানান, বিদেশ ফেরত কাউকে দেখলে মাদকের আসামী বলে তুলে নিয়ে যাওয়া হত এসব জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত টর্চার সেলে। অমানবিক নির্যাতন করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে আদায় করত টাকা। আর টাকা দিতে না পারলে বন্দুকযুদ্ধ বলে হত্যা করতেন ওসি প্রদীপ।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু আজ

টেকনাফে ওসির টর্চার সেলের সন্ধান, রাতে শুনা যেত মানুষের আর্তনাদ

প্রকাশিত : ০৫:০৬:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২০

শান্তি, শৃঙ্খলে, নিরাপত্তা, প্রগতি এই চার নীতি নিয়ে গঠিত দক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের ৮ থানার একটি হচ্ছে টেকনাফ মডেল থানা। বাংলাদেশ পুলিশের প্রচলিত প্রশাসনিক আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক থানার বাহিরে আর কোন থানা বা ফাঁড়ি থাকে না। তবে, আইনশৃংখলা বাহিনীর একান্ত প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উর্ধতনের অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ ফাঁড়ির ব্যবস্থা থাকতে পারে। কিন্তু টেকনাফ থানা ছিল এর উল্টো।

টেকনাফ প্রশাসনিক মডেল থানা ও ফাঁড়ির বাহিরে ছিল সদ্য বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের টর্সাল সেল, যাকে ঐ এলাকার মানুষ জাহান্নাম হিসাবে আখ্যা দিয়েছিল। জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত কয়েকটি টর্চার সেলের মধ্যে একটির সন্ধান পাওয়া গেছে। যা টেকনাফ সদর ইউনয়নের নাজির পাড়া গ্রামের নুর মোহাম্মদের বাড়ী।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাড়ীর মালিক ছিলেন নুর মোহাম্মদ তবে তিনিও পুলিশের কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। প্রদীপ আটকের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে রাতের অন্ধকারে সেই আস্তানা ত্যাগ করে সেখানে অবস্থান নেওয়া প্রদীপের একটি পুলিশ টিম। জানা যায়, পুলিশ বাড়িটিকে আটক আসামীদের টর্সাল সেল ও মুক্তিপণ আদায়ের নিরাপদ আস্তানা হিসাবে ব্যবহার করত। প্রতিরাতে ভেসে আসত অসহায় মানুষের কান্নার আওয়াজ।

সেনা বাহিনীর মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন পুলিশের গুলিতে নিহতের পর এসব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রদীপের জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বর্তমানে বাড়িটি একদম ফাঁকা পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুলিশের পুরাতন পোষাক, পুলিশের জুতা, থানার সাধারণ ডায়েরী খাতা ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির অলিখিত চেক, মদের বোতল ও ইয়াবা সেবনের জিনিষপত্র এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খোঁজ করে নুর মোহাম্মদের মায়ের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, কয়েক মাস পূর্বে পুলিশ তাদের মারধর করে বাড়ী থেকে এক কাপড়ে বের করে দেয়। এর পর হতে বাড়ীটি পুলিশের দখলে ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অপরিচিত সুন্দরী নারীদের আনাগুনা দেখা যেত প্রায় সময়। এর পরও পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। বাড়ীর মালিক নিহত নুর মোহাম্মদ এর স্ত্রী লায়লা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্বামী একজন মুদির দোকানদার ছিল। হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে আমার স্বামীকে দোকান হতে তুলে নিয়ে যায়। তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। স্বামীর জীবন বাঁচাতে স্বর্ণের গহনা বিক্রি ও আত্বীয় স্বজনের নিকট হতে কর্জ করে ৩ লাখ টাকা পুলিশের হাতে প্রদান করি। এর পর দাবীকৃত সর্ম্পুর্ন টাকা দিতে ব্যার্থ হওয়ায় ওসি প্রদীপ এর নির্দেশে আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করে মাদক ও অস্ত্র মামলার আসামী করা হয়। অবুঝ ৩ কন্যা সন্তানদের নিয়ে বসত বাড়ী ছেড়ে অন্যের বাড়ীতে অবস্থান করতে হচ্ছে। আমার নিরপরাধ স্বামী হত্যা ও বাড়ীটি ফেরত পেতে সাহায্যের দৃষ্টি কামনা করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি জানান, গভীর রাতে পুলিশের দখলে নেওয়া ওই বাড়ী হতে মানুষের আর্ত্মচিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসত। মানুষের চিৎকারের আওয়াজ শুনে মানুষ ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতো।

টেকনাফ মডেল থানার একজন কর্মকর্তা জানান, এটি মাদক কারবারীর বাড়ী আদালতের নির্দেশে বাড়ীটি খালি করে রাখা হয়েছে, তবে পুলিশের অবস্থান সম্পর্কে আদালতের কোন নির্দেশ ছিল না।

এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আবুল ফয়সল কে এই বিষয়ে অবগত করা হলে বলেন, আমি মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এটিই খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে টেকনাফের বহিস্কৃত ওসি প্রদীপের অত্যাচারে একসাথে চারজন মানুষ দাড়িয়ে কথা বলতে পারত না। তার বাহিনী দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হত এসব টর্চার সেলে। আদায় করা হত লক্ষাধিক টাকা। প্রতিদিন কোন না কোনভাবে সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করতেন প্রদীপ সহ তার বাহিনী।

টেকনাফের সাধারণ মানুষ নাজির পাড়ায় সাংবাদিকদের উপস্থিতি জানতে পেরে বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হতে থাকে, তারা জানান, বিদেশ ফেরত কাউকে দেখলে মাদকের আসামী বলে তুলে নিয়ে যাওয়া হত এসব জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত টর্চার সেলে। অমানবিক নির্যাতন করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে আদায় করত টাকা। আর টাকা দিতে না পারলে বন্দুকযুদ্ধ বলে হত্যা করতেন ওসি প্রদীপ।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ