০৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬

আমন চাষিদের মাথায় হাত, শূন্য থাকছে কৃষকের ধানের গোলা

টানা ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে ছিল লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির আমন ধান। ফলে পানির নিচে থেকে পচে নষ্ট হওয়ায় নিজেদের বছরের খোরাক কীভাবে জোগাড় করবে, তা নিয়ে শঙ্কিত অনেক কৃষক পরিবার। জানা গেছে, গত চার সপ্তাহ জুড়ে টানা ভারি বৃষ্টি হওয়ায় লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়।

তাতে জেলার পাঁচটি উপজেলার নিচু অঞ্চলের সব আমনক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। টানা ২০/২৫ দিন পানিতে ডুবে থাকায় মধ্য বয়স্ক আমনের চারা গাছ পচে-গলে নষ্ট হয়েছে। পানি নেমে গেলেও আমনের চারা গাছ আর দেখা যাচ্ছে না। তবে তুলনামুলক উচু অঞ্চলের আমন ক্ষেতের চারা গাছ দেখা গেলেও ফলন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। ফলে আমন ধানে গোলা ভাড়ানো তো দূরের কথা, নিজেদের খাদ্যের যোগান নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জেলার নিম্নাঞ্চলের আমন চাষিরা।
কিছু আমন ক্ষেতে চারা গাছ দেখা গেলেও তা কচুরি পানাসহ বিভিন্ন আগাছায় ভরে উঠেছে। পানি কমে যাওয়ায় এসব ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করতে অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে চাষিদের। এভাবে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। আগামীদিনে আবহাওয়া ভালো থাকলে উঁচু অঞ্চলের আমন চাষিরা কিছুটা ধান পেলেও নিম্নাঞ্চলের চাষিদের গোলা শূন্যই থেকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের বড় আমন উৎপাদনের কয়ার দোলা, কালিকুড়ার দোলা, দলগ্রামের বুকশুলার দোলা, আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ও ভাদাই ইউনিয়নের স্বর্ণমতি সতি নদীর তীরে, সলসলির দোলা, সাতভিটার দোলা, ভাদাই দোলা, পলাশীর মহিষাশ্বরের দোলা, সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগরের হাজীর দোলা, রেলগেটসহ তিস্তা ও ধরলা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির মধ্য বয়স্ক আমন ধানক্ষেত পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। ভারি বৃষ্টি ও ধীর গতিতে পানি নামায় দীর্ঘদিন ডুবে ছিল এসব অঞ্চলের আমনক্ষেত। দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় ধানগাছগুলো পচে গলে নষ্ট হয়েছে। ফলে আমনের উৎপাদন নিয়েও চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আদিতমারী উপজেলার ভাদাই দোলার কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, দুই বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণের পর থেকে যাবতীয় পরিচর্যা শেষ করেছেন তিনি। কিছুদিন পরে ধানের শীষ বের হতো। এমন সময় টানা বৃষ্টিতে তার ধানক্ষেত পানিতে ডুবে যায়। টানা ২০ দিন ধরে এ দোলার সব চাষির ধান ডুবে পচে গলে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে চারা রোপণের সুযোগ নেই। আমন ধান ঘরে তুলতে না পারলে পরিবার পরিজন নিয়ে খাদ্য সংকটে ভুগতে হতে পারে।
সাতভিটার দোলায় ১৫ বিঘা জমিতে আমন রোপণ করেছেন মুফতি আবুল হোসেন। পুরো ক্ষেত পচে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি এবার সব শেষ করেছে। একটা ধানও বাড়িতে নেওয়ার মত থাকলো না। গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড়ও পাওয়া যাবে না আমন ক্ষেতে। পরিবার নিয়ে কী খাবো আল্লাহই জানেন।
কয়ার দোলার কৃষক হেলাল উদ্দিন, বিশ্বনাথ জানান, অনেক টাকা খরচ করে রোপণ করা আমন ধানের পানিতে ডুবে পচে গলে নষ্ট হয়েছে। রোপণ করা আমনক্ষেতে এখন কচুরি পানাসহ নানান জাতের আগাছা জমে ভরে গেছে। উঁচুতে থাকা আমনক্ষেত কিছুটা রক্ষা পেলেও তাতে ফলন কম হবে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। নিজেদের খাদ্যের জন্য এসব ক্ষেতে কঠোর শ্রম বিনিয়োগ করছেন তারা। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সহায়তা ও প্রণোদনা দাবি করেন কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, চলতি বছর জেলায় ৮৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে আমনচাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে চাষাবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে পানিতে ডুবে যায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর আমনক্ষেত। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার ১৩ হাজার ৬০৫ জন কৃষক। তাদের ৭৯৮ হেক্টর জমির আমন ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে আট কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এছাড়া সবজি ও বীজ বাদাম মিলে আরো সাড়ে ৬২ হেক্টর ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে। মোট জেলার ১৬ হাজার ৪৭০ জন কৃষকের ৮৬০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের এ তথ্য মানতে নারাজ কৃষকরা। তাদের দাবি এর চেয়েও দ্বিগুণ ক্ষতি হয়েছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামীম আশরাফ বলেন, টানা বৃষ্টি আর বন্যায় দীর্ঘদিন আমন ও সবজিক্ষেত পানিতে ডুবে থাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে আমন রোপণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রবি শস্য চাষের প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ক্ষতির পরিমাণসহ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রণোদনা বা কোনো সহায়তা এলে, তা কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: নোয়াখালীর সেই নারীকে আগেও ২ বার ধর্ষণ করে দেলোয়ার

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ছাত্রদলের নতুন কমিটির আলোচনায় বারবার গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা আবু হান্নান তালুকদার

আমন চাষিদের মাথায় হাত, শূন্য থাকছে কৃষকের ধানের গোলা

প্রকাশিত : ০৫:১১:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২০

টানা ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে ছিল লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির আমন ধান। ফলে পানির নিচে থেকে পচে নষ্ট হওয়ায় নিজেদের বছরের খোরাক কীভাবে জোগাড় করবে, তা নিয়ে শঙ্কিত অনেক কৃষক পরিবার। জানা গেছে, গত চার সপ্তাহ জুড়ে টানা ভারি বৃষ্টি হওয়ায় লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়।

তাতে জেলার পাঁচটি উপজেলার নিচু অঞ্চলের সব আমনক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। টানা ২০/২৫ দিন পানিতে ডুবে থাকায় মধ্য বয়স্ক আমনের চারা গাছ পচে-গলে নষ্ট হয়েছে। পানি নেমে গেলেও আমনের চারা গাছ আর দেখা যাচ্ছে না। তবে তুলনামুলক উচু অঞ্চলের আমন ক্ষেতের চারা গাছ দেখা গেলেও ফলন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। ফলে আমন ধানে গোলা ভাড়ানো তো দূরের কথা, নিজেদের খাদ্যের যোগান নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জেলার নিম্নাঞ্চলের আমন চাষিরা।
কিছু আমন ক্ষেতে চারা গাছ দেখা গেলেও তা কচুরি পানাসহ বিভিন্ন আগাছায় ভরে উঠেছে। পানি কমে যাওয়ায় এসব ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করতে অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে চাষিদের। এভাবে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। আগামীদিনে আবহাওয়া ভালো থাকলে উঁচু অঞ্চলের আমন চাষিরা কিছুটা ধান পেলেও নিম্নাঞ্চলের চাষিদের গোলা শূন্যই থেকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের বড় আমন উৎপাদনের কয়ার দোলা, কালিকুড়ার দোলা, দলগ্রামের বুকশুলার দোলা, আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ও ভাদাই ইউনিয়নের স্বর্ণমতি সতি নদীর তীরে, সলসলির দোলা, সাতভিটার দোলা, ভাদাই দোলা, পলাশীর মহিষাশ্বরের দোলা, সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগরের হাজীর দোলা, রেলগেটসহ তিস্তা ও ধরলা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির মধ্য বয়স্ক আমন ধানক্ষেত পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। ভারি বৃষ্টি ও ধীর গতিতে পানি নামায় দীর্ঘদিন ডুবে ছিল এসব অঞ্চলের আমনক্ষেত। দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় ধানগাছগুলো পচে গলে নষ্ট হয়েছে। ফলে আমনের উৎপাদন নিয়েও চরম শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আদিতমারী উপজেলার ভাদাই দোলার কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, দুই বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণের পর থেকে যাবতীয় পরিচর্যা শেষ করেছেন তিনি। কিছুদিন পরে ধানের শীষ বের হতো। এমন সময় টানা বৃষ্টিতে তার ধানক্ষেত পানিতে ডুবে যায়। টানা ২০ দিন ধরে এ দোলার সব চাষির ধান ডুবে পচে গলে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে চারা রোপণের সুযোগ নেই। আমন ধান ঘরে তুলতে না পারলে পরিবার পরিজন নিয়ে খাদ্য সংকটে ভুগতে হতে পারে।
সাতভিটার দোলায় ১৫ বিঘা জমিতে আমন রোপণ করেছেন মুফতি আবুল হোসেন। পুরো ক্ষেত পচে নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি এবার সব শেষ করেছে। একটা ধানও বাড়িতে নেওয়ার মত থাকলো না। গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড়ও পাওয়া যাবে না আমন ক্ষেতে। পরিবার নিয়ে কী খাবো আল্লাহই জানেন।
কয়ার দোলার কৃষক হেলাল উদ্দিন, বিশ্বনাথ জানান, অনেক টাকা খরচ করে রোপণ করা আমন ধানের পানিতে ডুবে পচে গলে নষ্ট হয়েছে। রোপণ করা আমনক্ষেতে এখন কচুরি পানাসহ নানান জাতের আগাছা জমে ভরে গেছে। উঁচুতে থাকা আমনক্ষেত কিছুটা রক্ষা পেলেও তাতে ফলন কম হবে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। নিজেদের খাদ্যের জন্য এসব ক্ষেতে কঠোর শ্রম বিনিয়োগ করছেন তারা। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সহায়তা ও প্রণোদনা দাবি করেন কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, চলতি বছর জেলায় ৮৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে আমনচাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে চাষাবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে পানিতে ডুবে যায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর আমনক্ষেত। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলার ১৩ হাজার ৬০৫ জন কৃষক। তাদের ৭৯৮ হেক্টর জমির আমন ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে আট কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এছাড়া সবজি ও বীজ বাদাম মিলে আরো সাড়ে ৬২ হেক্টর ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়েছে। মোট জেলার ১৬ হাজার ৪৭০ জন কৃষকের ৮৬০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে ১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের এ তথ্য মানতে নারাজ কৃষকরা। তাদের দাবি এর চেয়েও দ্বিগুণ ক্ষতি হয়েছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শামীম আশরাফ বলেন, টানা বৃষ্টি আর বন্যায় দীর্ঘদিন আমন ও সবজিক্ষেত পানিতে ডুবে থাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে আমন রোপণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রবি শস্য চাষের প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ক্ষতির পরিমাণসহ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রণোদনা বা কোনো সহায়তা এলে, তা কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন: নোয়াখালীর সেই নারীকে আগেও ২ বার ধর্ষণ করে দেলোয়ার

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ