চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৪৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্পে খেলাপি কমেছে ৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ সময় খাতটিতে ঋণ বিতরণও কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করার সুযোগ না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া অবলোপন ও পুনঃতফসিল করার কারণেও মোটা অঙ্কের খেলাপি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণ অবলোপন ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে থাকতে পারে। এটা কাগজের হিসাব। এখানে উন্নতি বলা যাবে না। প্রকৃত খেলাপি আগের মতোই আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এ তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। করোনার কারণে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করা হয়নি। আর হলেও ৮ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমেছে-এটা বড় কোনো অঙ্ক নয়; বিশাল খেলাপির মধ্যে এটা কিছুই না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে সরকারি-বেসরকারি সব বাণিজ্যিক ব্যাংক। এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্পে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে শিল্পঋণ আদায়ের অঙ্ক কমেছে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
বছরের ব্যবধানে ৯৪ হাজার ৫৭৮ কোটি থেকে ৮৪ হাজার ২৩৩ কোটিতে নেমেছে আদায়। এ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ও বকেয়া স্থিতি উভয় বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে শিল্প খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ৭৭ হাজার ৩৬৯ কোটি থেকে বেড়ে ৮৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা এবং বকেয়া স্থিতি ৫ লাখ ২৬ হাজার ৭৫ কোটি থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় উঠে আসে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ ৮ হাজার কোটি টাকা কমেছে। এটাকে প্রকৃত কমা বলা যায় কি না, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। করোনার কারণে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করা হয়নি, এ মেয়াদ হয় তো আগামী জুন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কিন্তু যখনই খেলাপি না করার সুবিধা তুলে নেয়া হবে তখনই ব্যাংক খাতে একটা রক্তক্ষরণ হবে। তবে কী পরিমাণ ক্ষরণ হবে, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ১ শতাংশ প্রভিশন রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু সে হারও যথেষ্ট কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। মূল কথা হল, ব্যাংকগুলোকে নিজ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তা না-হলে পরিস্থিতি মোকাবেলা কঠিন হবে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কাউকে খেলাপি করার সুযোগ নেই। বরং টুকটাক যারা পেমেন্ট করছেন সেটা যোগ হচ্ছে। সে কারণে খেলাপি ঋণ কমেছে। আর ঋণ বিতরণ কমার কারণ হল করোনার শুরুতে ঋণ বিতরণ করা যায়নি। এখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চে আরও ঘুরে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে প্যাকেজের ঋণগুলো দ্রুত বিতরণ করতে হবে। শিল্প খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব অর্থনৈতিক খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ঋণ বিতরণ বাড়ানো যাচ্ছে না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক শর্ত শিথিল করে যাচ্ছে। ১২ এপ্রিল জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছিল, প্যাকেজের মেয়াদ হবে তিন বছর। কিন্তু তা সুনির্দিষ্ট করা ছিল না। পরবর্তী সময়ে অন্য একটি সার্কুলারের মাধ্যমে এর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলোচ্য প্যাকেজের আওতায় বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা নিতে হবে এবং তা পরিশোধ করতে হবে। জানা গেছে, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম সুদ ও সহজ শর্তে চলতি মূলধনের জোগান দিতে ১২ এপ্রিল ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আওতায় সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার কথা বলা হয়।
এ ঋণের মোট সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তহবিলের জোগান দিতে ২৩ এপ্রিল ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ তহবিল থেকে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫০ শতাংশ অর্থের জোগান দেয়া হবে।
অর্থাৎ, কোনো গ্রাহককে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দিলে এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দেবে এবং বাকি ৫০ কোটি টাকা দেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ নেবে ৪ শতাংশ। কিন্তু এখনও এ ঋণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বিতরণ হয়নি।





















