স্বাধীনতার পাঁচ দশকের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে উন্নয়নের রোল মডেল। রফতানি, রিজার্ভ, জিডিপি থেকে শুরু করে দেশের বাজেটের আকার, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ, রাজস্ব আয়, রেমিটেন্স আহরণ, দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন, বিদ্যুত উৎপাদন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে সফলতা। নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা হচ্ছে সহজ নক্সায় বিশ্বের দীর্ঘতম দৃষ্টিনন্দন সেতু।
২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে এসে বাংলাদেশের গৌরবময় অর্জনের কথা শুনিয়ে যান নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অগ্রগতির ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, যারা এক সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিল তারা আজ এ দেশকে ‘উন্নয়নের মডেল’ মনে করছে।
দারিদ্র্য বিমোচন, নারী শিক্ষা, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মতো বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি নজর কেড়েছে বিশ্ব সপ্রদায়ের।
মূলত ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানী শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বাঙালী জাতি। স্বাধীনতার চার দশক পর সে স্বপ্ন অর্জনের পথে অনেকটাই এগিয়েছে দেশ। আর এ স্বপ্ন পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে রফতানি খাত। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের রফতানি খাত কাঁচা চামড়া ও পাট নির্ভর হলেও সময়ের আবর্তনে সে তালিকায় যুক্ত হয়েছে তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণসহ হালকা ও মাঝারি শিল্পের নানা পণ্য। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আয় গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৫০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই ছিল বিদেশী সহায়তানির্ভর। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে সরকার।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল ঋণাত্মক দিয়ে। ওই সময় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাইনাস ১৩.৯৭ শতাংশ। এর পর থেকেই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যও ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। কিন্তু মহামারীর মধ্যে দুই মাসের লকডাউন আর বিশ্ব বাজারের স্থবিরতায় তা বড় ধাক্কা খায়। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সরকারী হিসেবে ৫.২৪ শতাংশে নেমে আসে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮.১৫ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৭.৮৬ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭.৫০ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৫০ শতাংশ।
মাথাপিছু আয়: ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার। আর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল মাত্র ১২৯ মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ১৫ গুণ বেড়েছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এ তিনটি সূচকের দুটিতে উত্তীর্ণ হলে কোন দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর যে কোন দুটি সূচকে জাতিসংঘের মানদ- ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হবে। মানবসম্পদ সূচকে পাঁচটি বিষয়ের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নেয় জাতিসংঘ।
বাজেট: স্বাধীনতার পর থেকে (১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৯-২০) দেশে জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ৪৩২ গুণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়ে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: ১৯৭২ সালে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ। বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ন ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এলে ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন আকুর আমদানি বিল বকেয়া রাখতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯ বছরের মাথায় সেই রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই হিসাবে গত ১৯ বছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ বেড়েছে ৩৮ গুণ। আন্তর্জাতিক মানদ অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশী মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশকে দুই মাস পরপর পরিশোধ করতে হয় আকুর বিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স বেড়েছে ৪৩ শতাংশের বেশি।
বিদেশী বিনিয়োগ: করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অন্যান্য খাতের মতো বিনিয়োগেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চলতি বছর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নয়টি শতভাগ ও ১১টি যৌথ বিনিয়োগের জন্য মোট ২০টি নিবন্ধিত বিদেশী শিল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ৪৪টি শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব কমেছে ৯২ দশমিক ৬১ শতাংশ বা ১৬ হাজার ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের পাঁচ দশকের উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সবটুকু জায়গাজুড়ে ছিল শুকনো মুখ, হাড় জিরজিরে, ঘোলা চোখে পথ দেখে চলা মানুষেরা- বাংলার এ গণমানুষই বঙ্গবন্ধুর মানসপটে একটা স্বপ্ন খোদাই করে দিয়েছিল। ঘিরে দিয়েছিল তার স্বপ্নের ফসলভূমি। স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে পারেননি। সেই সময় তাকে দেয়া হয়নি। আবহমান বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটা টেকসই অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার যে বাস্তবানুগ পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেই ভিত্তির ওপরই আজকের বাংলাদেশে সমৃদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করতে সারাবিশকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।’
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর






















