করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার মধ্যেই দ্বিতীয় ধাক্কায় নতুন চ্যালেঞ্জে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। তবে প্রথম ধাক্কার মতো দ্বিতীয় ধাক্কাও সামলে ওঠার সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। মহামারী করোনার প্রথম ওয়েভে দেশের অর্থনৈতিক খাতে ¶তি হয়েছিল ৮৫ হাজার কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকার করোনা প্যাকেজের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সচল করা সম্ভব হয়েছে। ঘুরছে উৎপাদনমুখী শিল্পের চাকা। রফতানি, রেমিটেন্স এবং দেশের কৃষি খাতের উৎপাদন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ওয়েভ যা গত বছরের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারকে ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ¶য়¶তি হয়েছে। ¶তি পোষাতে ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ব্যয় করতে হচ্ছে ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ করোনার আর্থিক ¶তির চেয়ে গত অর্থবছরে বেশি পরিমাণ দেয়া হয় প্রণোদনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভাল অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ওয়েভে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আগামী চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে। এ ল¶্যে আগামি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।
করোনার প্রথম ধাক্কা সামাল দিতে সাফল্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ঠিক সেই সময় বিশ্বব্যাপী আবার করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। করোনার সংক্রমণ কমাতে ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড এবং রোম আবার কঠোর লকডাউনে চলে গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে করোনা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে হু হু করে। এতে করে আবার নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে। প্রস্তুতি হিসাবে আগামী বাজেট সামনে রেখে নতুন কর্মসূচী নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সম্প্রতি তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসরোধে টিকা কিনতে যত টাকা লাগবে সেই পরিমাণ বরাদ্দ দিতে প্রস্তুত রয়েছে সরকার। টাকার কোন সমস্যা নেই। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন প্রণোদনা প্যাকেজও আসতে পারে। আমাদের অভ্যন্তরীণ খাতে কী পরিমাণ ¶তি হচ্ছে, কী পরিমাণ ¶তি হবে- সেটির ওপর নির্ভর করবে প্রণোদনার বিষয়টি। এটি আমাদের ব্যাপার না, আন্তর্জাতিক মহল যদি বিপদে না পড়ে, তা হলে আমরা বিপদে পড়ব না এবং আমরা বিপদটা এক্সচেঞ্জ করতে পারব।’
করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কা শুরু হয় গত বছরের মার্চ মাস থেকে। দেয়া হয় সাধারণ ছুটি। এতে করে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বড় শিল্প খাতের ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছেন। গত বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশের উৎপাদন খাত সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। স্বাস্থ্য সুর¶া সামগ্রী ও ওষুধসহ হাতেগোনা কয়েকটি খাতের উৎপাদন বাড়লেও বাকিগুলোতে ব্যাপক ধস নামে। বেশির ভাগ কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অথবা বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেয়। দেশের প্রধান রফতানি পণ্য এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। বড় খাতের পাশাপাশি মহামারীতে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছিল কুটির, ¶ুদ্র, অতি¶ুদ্র, মাঝারি বা সিএসএমই শিল্প খাত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০-এ এসএমই খাতে সামগ্রিকভাবে আয় কমেছে প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং প্রায় ৭৬ শতাংশ উৎপাদিত পণ্য অবিক্রীত ছিল। বড়, মাঝারি ও ছোট খাতগুলোর বিপর্যয়ের ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে।
করোনার প্রথম ঢেউয়ে সারা বিশ্বে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ। সব মিলিয়ে করোনায় অর্থনীতিতে মোট কত ¶তি হয়েছে, তা বের করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ‘সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরেন অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার। এতে বলা হয়েছে, দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রাণহানিসহ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ¶তি হয়েছে, বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত ১২ বছর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকায় এবং প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের কারণে অর্থনীতি স্বল্প সময়ে কোভিডপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী চারটি নীতি কৌশল এবং পর্যায়ক্রমে ২৩টি অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সামাজিক সুর¶া প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এর পরিমাণ এক লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। এটি ১৪.৬ বিলিয়ন ডলারের সমান এবং জিডিপির ৪.৪৪ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রীর ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৯টি প্যাকেজ সামাজিক সুর¶া সংক্রান্ত। এর মধ্যে গৃহহীন মানুষদের জন্য গৃহ নির্মাণ অন্যতম একটি কর্মসূচী। এটি সামাজিক সুর¶া ও দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। এই একটি কার্যক্রম গৃহহীন ও ভূমিহীন অতিদরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলে আনবে। অবহেলিত, বিশেষ করে নারীদের সামাজিক ¶মতায়ন করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি করোনাপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে।
এদিকে গত বছরের মার্চ মাস থেকে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হলে বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে কত টাকা ঋণ পাওয়া গেছে এবং কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, এআইআইবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ১৫৬ কোটি ডলার ঋণচুক্তি সই করেছে সরকার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। প্রণোদনা প্যাকেজের পাশাপাশি চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটেও কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় করোনার টিকা আমদানি, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং বাজেট ঘাটতি মেটানো হবে।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশী সহায়তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা যা, গত অর্থবছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। এই অর্থ সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে বিশ্ব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের সহায়তার ওপর।
০৭:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
অর্থনীতি রক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার
-
শেখ লিমন - প্রকাশিত : ১২:০১:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১
- 52
ট্যাগ :
জনপ্রিয়





















