০২:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ইতিবাচক ধারায় অর্থনীতির সূচক

  • এ. আর আকাশ
  • প্রকাশিত : ১২:০১:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ মে ২০২১
  • 57

করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কা কটিয়ে ইতিবাচক ধারায় পৌঁছেছে দেশের অর্থনীতির প্রধান কয়েকটি সূচক। এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই সূচকগুলো ইতিবাচক অবস্থানেই রয়েছে। অভ্যন্তরীণ শিল্পপণ্য উৎপাদন বেড়েছে। গত মাস পর্যন্ত দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার ও বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির তথ্য অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল। প্রবৃদ্ধি সঞ্চালক বেশিরভাগ সূচক-আমদানি-রপ্তানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ইতিবাচক চিত্র অর্থনীতিকে প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলে পৌঁছে দেওয়ার মতো শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। রাজস্ব আদায়েও প্রবৃদ্ধির দেখা মিলছিল। প্রবাসী আয় ও কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ বরাবরই ছিল উৎসাহব্যাঞ্জক। তবে হুমকি হয়ে হাজির হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।
করোনার সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় চলমান লকডাউনে এসব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার তথ্য উঠে এসেছে অর্থবিভাগের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন সম্প্রতি ‘সরকারি সম্পদ ও বাজেট মনিটরিং কমিটি’তে উপস্থাপন করেছেন অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। তবে বোরোর বাম্পার ফলন ও আগামী জুন নাগাদ রফতানিতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
চাহিদা সৃষ্টিকারী সূচকগুলো কোভিডের ধকল সামলে নিয়ে গত এক বছরে ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার সূচকগুলো সেকেন্ড ওয়েভ শুরুর আগেও প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলের তুলনায় অনেক পেছনে ছিল। গত অর্থবছরের জুলাই- ফেব্রুয়ারি সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলার ¶েত্রে ২৪ শতাংশের বেশি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় ছিল, যা চলমান লকডাউনের প্রভাবে আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করেছে অর্থবিভাগ।
করোনার ভয়ে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এই সময়ে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার উদ্যোগের কথা গত বাজেট বক্তব্যে বলা হলেও বাস্তব চিত্র পুরোই উল্টো। গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আগের বছরের তুলনায় সরকারের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় উভয়ই কমে গেছে। ফলে অর্থনীতির সংকটকালে সরকারের বিনিয়োগ বাড়িয়ে বেসরকারিখাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কথা থাকলেও, এ¶েত্রে তা ব্যর্থ হয়েছে।
গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে যেখানে সরকারের মোট ব্যয় ছিল ২,১৭,৪৪১ কোটি টাকা, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ১,৯৬,০৬১ কোটি টাকা। বাজেটের আকার বিবেচনায় গত অর্থবছর এই সময়ে সরকারি ব্যয় ছিল মোট বাজেটের ৪১.৫৬ শতাংশ, এবার হয়েছে ৩৪.৫২ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় করেছে সরকার।
চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৪২ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে সরকার। আগের অর্থবছর একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪৫ শতাংশের বেশি ছিল। চলতি অর্থবছর শেষেও এডিপি বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সন্তোষজনক হবে না বলে আশঙ্কা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কোভিড মহামারি থেকে অর্থনৈতিক সুর¶ায় ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১,২৮,৪৪১ কোটি টাকা ঋণ-সহায়তা ঘোষণা করলেও প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলের তুলনায় বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। মূলত কোভিডের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং একদিকে ইকোনমিক জোনগুলো সময়মত বাস্তবায়ন করতে না পারা, অন্যদিকে ইকোনমিক জোনের বাইরে বিনিয়োগের ¶েত্রে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে হাত গুটিয়ে রাখছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছরের একই সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৫৩০ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর সাবেক প্রেসিডেন্ট শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ব্যাপকমাত্রায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করছে। এতে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে ওইসব দেশের ক্রেতাদের আস্থা ফিরলে বাংলাদেশের রপ্তানিও ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। সেকেন্ড ওয়েভ অর্থনীতিতে এতোটা প্রভাব ফেলবে, তা কারও ভাবনায় ছিল না। প্রথম ওয়েভের সংকট কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, এই সময়ে নতুন করে সংকট হওয়ায় তাদের আগের অবস্থায় ফিরতে এবার বেশি সময় লাগবে। অনেকে পেটে-ভাতে বাঁচার চেষ্টা করছে। সরকারও জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে। ছোট ব্যবসায়ীরা গতবছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদ উল ফিতরে লোকসান করেছে। এবারও তাদের ঈদবিক্রি ভালো হবে না। কারণ, ক্রেতাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঘাটতি রয়েছে। তাই সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ইতিবাচক ধারায় অর্থনীতির সূচক

প্রকাশিত : ১২:০১:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ মে ২০২১

করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কা কটিয়ে ইতিবাচক ধারায় পৌঁছেছে দেশের অর্থনীতির প্রধান কয়েকটি সূচক। এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই সূচকগুলো ইতিবাচক অবস্থানেই রয়েছে। অভ্যন্তরীণ শিল্পপণ্য উৎপাদন বেড়েছে। গত মাস পর্যন্ত দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার ও বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির তথ্য অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল। প্রবৃদ্ধি সঞ্চালক বেশিরভাগ সূচক-আমদানি-রপ্তানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ইতিবাচক চিত্র অর্থনীতিকে প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলে পৌঁছে দেওয়ার মতো শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। রাজস্ব আদায়েও প্রবৃদ্ধির দেখা মিলছিল। প্রবাসী আয় ও কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ বরাবরই ছিল উৎসাহব্যাঞ্জক। তবে হুমকি হয়ে হাজির হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।
করোনার সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় চলমান লকডাউনে এসব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার তথ্য উঠে এসেছে অর্থবিভাগের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন সম্প্রতি ‘সরকারি সম্পদ ও বাজেট মনিটরিং কমিটি’তে উপস্থাপন করেছেন অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। তবে বোরোর বাম্পার ফলন ও আগামী জুন নাগাদ রফতানিতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
চাহিদা সৃষ্টিকারী সূচকগুলো কোভিডের ধকল সামলে নিয়ে গত এক বছরে ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার সূচকগুলো সেকেন্ড ওয়েভ শুরুর আগেও প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলের তুলনায় অনেক পেছনে ছিল। গত অর্থবছরের জুলাই- ফেব্রুয়ারি সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলার ¶েত্রে ২৪ শতাংশের বেশি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় ছিল, যা চলমান লকডাউনের প্রভাবে আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করেছে অর্থবিভাগ।
করোনার ভয়ে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এই সময়ে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার উদ্যোগের কথা গত বাজেট বক্তব্যে বলা হলেও বাস্তব চিত্র পুরোই উল্টো। গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আগের বছরের তুলনায় সরকারের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় উভয়ই কমে গেছে। ফলে অর্থনীতির সংকটকালে সরকারের বিনিয়োগ বাড়িয়ে বেসরকারিখাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কথা থাকলেও, এ¶েত্রে তা ব্যর্থ হয়েছে।
গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে যেখানে সরকারের মোট ব্যয় ছিল ২,১৭,৪৪১ কোটি টাকা, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ১,৯৬,০৬১ কোটি টাকা। বাজেটের আকার বিবেচনায় গত অর্থবছর এই সময়ে সরকারি ব্যয় ছিল মোট বাজেটের ৪১.৫৬ শতাংশ, এবার হয়েছে ৩৪.৫২ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় করেছে সরকার।
চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৪২ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে সরকার। আগের অর্থবছর একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪৫ শতাংশের বেশি ছিল। চলতি অর্থবছর শেষেও এডিপি বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সন্তোষজনক হবে না বলে আশঙ্কা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কোভিড মহামারি থেকে অর্থনৈতিক সুর¶ায় ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১,২৮,৪৪১ কোটি টাকা ঋণ-সহায়তা ঘোষণা করলেও প্রি-প্যান্ডেমিক লেবেলের তুলনায় বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। মূলত কোভিডের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং একদিকে ইকোনমিক জোনগুলো সময়মত বাস্তবায়ন করতে না পারা, অন্যদিকে ইকোনমিক জোনের বাইরে বিনিয়োগের ¶েত্রে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে হাত গুটিয়ে রাখছেন ব্যবসায়ীরা। গত বছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারির তুলনায় এ বছরের একই সময়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৫৩০ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর সাবেক প্রেসিডেন্ট শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ব্যাপকমাত্রায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করছে। এতে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে ওইসব দেশের ক্রেতাদের আস্থা ফিরলে বাংলাদেশের রপ্তানিও ইতিবাচক ধারায় ফিরবে। সেকেন্ড ওয়েভ অর্থনীতিতে এতোটা প্রভাব ফেলবে, তা কারও ভাবনায় ছিল না। প্রথম ওয়েভের সংকট কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, এই সময়ে নতুন করে সংকট হওয়ায় তাদের আগের অবস্থায় ফিরতে এবার বেশি সময় লাগবে। অনেকে পেটে-ভাতে বাঁচার চেষ্টা করছে। সরকারও জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে। ছোট ব্যবসায়ীরা গতবছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদ উল ফিতরে লোকসান করেছে। এবারও তাদের ঈদবিক্রি ভালো হবে না। কারণ, ক্রেতাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঘাটতি রয়েছে। তাই সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।