১২:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

অর্থনীতি উদ্ধারের বাজেট আসছে

 

অর্থনীতি উদ্ধারে সর্বব্যাপী পরিকল্পনা নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে সরকার। এ লক্ষ্যে কর হার না বাড়িয়ে ও নতুন করারোপ না করেই বাজেটের আকার বাড়াচ্ছে সরকার। বাজেট ব্যয় নির্বাহে বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে সরকার। বিদেশি উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি ধরা হচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রেখেই বাজারে বাড়তি অর্থ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের, যাতে জনগণের হাতে বেশি অর্থ যায়।
আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্রের হার বাড়ার ক্ষেত্রে লাগাম টানা এবং চলমান প্রণোদনা কর্মসূচি অব্যাহত রেখে শিল্পখাতে চাঙ্গাভাব বজায় রেখে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষমাত্রা স্থির করা হচ্ছে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে। এবারই প্রথমবার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে না। বরং জিডিপির অনুপাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন অর্থবছরের ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নতুন করে বাড়তি করারোপের প্রয়োজন হবে না রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাটির।
অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা মোকাবিলায় এবারও বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্যে বেশির ভাগ বড় প্রকল্প বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখা ও করোনা প্রতিরোধসহ অন্য প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেশি বিদেশি ঋণ প্রাপ্তির প্রত্যাশা করছে সরকার। আগামী বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য ৮৯ হাজার কোটি টাকা ধরা হবে বলে আভাস দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এটা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি- দুটি উৎস থেকে বাজেটে অর্থায়ন করে সরকার। বর্তমানে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির প্রায় ৩২ শতাংশ আসে বিদেশি ঋণ থেকে। বিভিন্ন প্রকল্পে এ ঋণ দেয় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা। এর বাইরে বাজেট সহায়তাও দিয়ে থাকে তারা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই-এর নিবার্হী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম যুগের বাজেটগুলোয় ৯৮ শতাংশ সম্পদের জোগান আসত বিদেশি উৎস থেকে। নব্বই দশকের পর বিশ্বায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ উদারীকরণের ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হতে থাকে। ফলে আমাদের নিজস্ব সম্পদ আহরণের সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়ে এবং বিদেশি ঋণনির্ভরশীলতা কমতে থাকে। বাজেট অর্থায়নে বিদেশি ঋণের নির্ভরশীলতা কমলেও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার দরকার রয়েছে এখনও। বিদেশি ঋণের অংশ আরও কমিয়ে আনতে হলে আমাদের নিজস্ব সম্পদ তথা রাজস্ব আদায়ে আরও বেশি জোর দিতে হবে।’
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের অংশ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ জোগান আসছে বিদেশি উৎস থেকে। এ জন্য বাজেট বাস্তবায়নে এখনও বিদেশি ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিদেশি ঋণের ইতিবাচক দিক হলো অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে এই ঋণ সস্তা। সুদের হার ১ শতাংশের নিচে এবং ২০ থেকে ৩০ বছরে পরিশোধ করা যায়। অন্যদিকে নেতিবাচক দিকও আছে। অর্থ ছাড়ে জটিলতা ও ঋণ পেতে নানা শর্ত মানতে হয়।
এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কর বহির্ভূত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। মূলত স্বশাসিত করপোরেশনগুলোর সঞ্চয় থেকে বাড়তি অর্থ সংগ্রহ করা ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২জি ও ৪জি স্প্রেকট্রাম নিলাম হওয়ায় সেখান থেকে বাড়তি অর্থ পাওয়ার আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এছাড়া, মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে।
সম্প্রতি বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি’র ভার্চুয়াল সভায় প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর কৌশল আগামী অর্থবছরও অব্যাহত রাখা হবে। ২০২১ সালের মার্চ হতে দেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হওয়ায় চলমান লকডাউনের প্রভাবে অর্থনীতি কিছুটা ব্যাহত হবে। এ প্রেক্ষাপটে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা হবে। করোনা সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং এক্সপানশনারি ফিসক্যাল পলিসি সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকায় সামনের দিনগুলোতে উন্নয়ন ব্যয়সহ সার্বিক সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তে পারে।’
সিনিয়র অর্থসচিব আরও বলেছেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ মোকাবেলায় বর্তমানে চলমান লকডাউনের কারণে আয়কর ও মূল্য সংযোজন করসহ অন্যান্য উৎস হতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নতুন করে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব আহরণ শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে। তবে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিশেষ কোন ঝূঁকি নেই। কারণ, দেশের সরকারি ঋণ-জিডিপির অনুপাত এখনো যথেষ্ঠ অনুকূলে রয়েছে।’
ঘাটতি বাজেট বাংলাদেশের জন্য সমস্যা নয় উল্লেখ করে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বিরাজ করছে। সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাতও বেশ কম। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি স্থানীয় উৎস থেকেও ঋণ করার সুযোগ রয়েছে সরকারের। সঠিক প্রোগ্রাম প্রণয়ন করা গেলে বিদেশি সংস্থা থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩.৩০ লাখ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ১০.৪ শতাংশ। আগামী বাজেটে এটি মাত্র ৭৮ কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে, যা জিডিপির ৯.৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯.৭ শতাংশ।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে ‘ভ্যাকসিন সাপোর্ট ফান্ড’ নামে একটি তহবিল গঠন করবে সরকার, যেখানে বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে দুই বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭,০০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা পাওয়ার আশা করছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে নতুন অর্থবছর দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নাগরিককে কোভিড ভ্যাকসিন দেওয়ার ঘোষণা থাকছে নতুন বাজেটে। এছাড়া, বাজেট সাপোর্ট হিসেবে উন্নয়ন সহযোগি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সাপোর্ট পাওয়ার প্রত্যাশা থাকছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৩,৫০০ কোটি টাকা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

অর্থনীতি উদ্ধারের বাজেট আসছে

প্রকাশিত : ১২:০০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ মে ২০২১

 

অর্থনীতি উদ্ধারে সর্বব্যাপী পরিকল্পনা নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে সরকার। এ লক্ষ্যে কর হার না বাড়িয়ে ও নতুন করারোপ না করেই বাজেটের আকার বাড়াচ্ছে সরকার। বাজেট ব্যয় নির্বাহে বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে সরকার। বিদেশি উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্য চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি ধরা হচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রেখেই বাজারে বাড়তি অর্থ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের, যাতে জনগণের হাতে বেশি অর্থ যায়।
আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্রের হার বাড়ার ক্ষেত্রে লাগাম টানা এবং চলমান প্রণোদনা কর্মসূচি অব্যাহত রেখে শিল্পখাতে চাঙ্গাভাব বজায় রেখে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষমাত্রা স্থির করা হচ্ছে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে। এবারই প্রথমবার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে না। বরং জিডিপির অনুপাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন অর্থবছরের ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নতুন করে বাড়তি করারোপের প্রয়োজন হবে না রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাটির।
অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা মোকাবিলায় এবারও বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্যে বেশির ভাগ বড় প্রকল্প বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখা ও করোনা প্রতিরোধসহ অন্য প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেশি বিদেশি ঋণ প্রাপ্তির প্রত্যাশা করছে সরকার। আগামী বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য ৮৯ হাজার কোটি টাকা ধরা হবে বলে আভাস দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এটা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি- দুটি উৎস থেকে বাজেটে অর্থায়ন করে সরকার। বর্তমানে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির প্রায় ৩২ শতাংশ আসে বিদেশি ঋণ থেকে। বিভিন্ন প্রকল্পে এ ঋণ দেয় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা। এর বাইরে বাজেট সহায়তাও দিয়ে থাকে তারা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই-এর নিবার্হী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম যুগের বাজেটগুলোয় ৯৮ শতাংশ সম্পদের জোগান আসত বিদেশি উৎস থেকে। নব্বই দশকের পর বিশ্বায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ উদারীকরণের ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হতে থাকে। ফলে আমাদের নিজস্ব সম্পদ আহরণের সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়ে এবং বিদেশি ঋণনির্ভরশীলতা কমতে থাকে। বাজেট অর্থায়নে বিদেশি ঋণের নির্ভরশীলতা কমলেও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার দরকার রয়েছে এখনও। বিদেশি ঋণের অংশ আরও কমিয়ে আনতে হলে আমাদের নিজস্ব সম্পদ তথা রাজস্ব আদায়ে আরও বেশি জোর দিতে হবে।’
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের অংশ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ জোগান আসছে বিদেশি উৎস থেকে। এ জন্য বাজেট বাস্তবায়নে এখনও বিদেশি ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিদেশি ঋণের ইতিবাচক দিক হলো অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে এই ঋণ সস্তা। সুদের হার ১ শতাংশের নিচে এবং ২০ থেকে ৩০ বছরে পরিশোধ করা যায়। অন্যদিকে নেতিবাচক দিকও আছে। অর্থ ছাড়ে জটিলতা ও ঋণ পেতে নানা শর্ত মানতে হয়।
এদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে কর বহির্ভূত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। মূলত স্বশাসিত করপোরেশনগুলোর সঞ্চয় থেকে বাড়তি অর্থ সংগ্রহ করা ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২জি ও ৪জি স্প্রেকট্রাম নিলাম হওয়ায় সেখান থেকে বাড়তি অর্থ পাওয়ার আশা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এছাড়া, মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে।
সম্প্রতি বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি’র ভার্চুয়াল সভায় প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর কৌশল আগামী অর্থবছরও অব্যাহত রাখা হবে। ২০২১ সালের মার্চ হতে দেশে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হওয়ায় চলমান লকডাউনের প্রভাবে অর্থনীতি কিছুটা ব্যাহত হবে। এ প্রেক্ষাপটে বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা হবে। করোনা সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং এক্সপানশনারি ফিসক্যাল পলিসি সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকায় সামনের দিনগুলোতে উন্নয়ন ব্যয়সহ সার্বিক সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তে পারে।’
সিনিয়র অর্থসচিব আরও বলেছেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ মোকাবেলায় বর্তমানে চলমান লকডাউনের কারণে আয়কর ও মূল্য সংযোজন করসহ অন্যান্য উৎস হতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে নতুন করে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব আহরণ শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে। তবে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিশেষ কোন ঝূঁকি নেই। কারণ, দেশের সরকারি ঋণ-জিডিপির অনুপাত এখনো যথেষ্ঠ অনুকূলে রয়েছে।’
ঘাটতি বাজেট বাংলাদেশের জন্য সমস্যা নয় উল্লেখ করে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বিরাজ করছে। সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাতও বেশ কম। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি স্থানীয় উৎস থেকেও ঋণ করার সুযোগ রয়েছে সরকারের। সঠিক প্রোগ্রাম প্রণয়ন করা গেলে বিদেশি সংস্থা থেকে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩.৩০ লাখ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ১০.৪ শতাংশ। আগামী বাজেটে এটি মাত্র ৭৮ কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে, যা জিডিপির ৯.৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯.৭ শতাংশ।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে ‘ভ্যাকসিন সাপোর্ট ফান্ড’ নামে একটি তহবিল গঠন করবে সরকার, যেখানে বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকে দুই বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৭,০০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা পাওয়ার আশা করছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে নতুন অর্থবছর দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নাগরিককে কোভিড ভ্যাকসিন দেওয়ার ঘোষণা থাকছে নতুন বাজেটে। এছাড়া, বাজেট সাপোর্ট হিসেবে উন্নয়ন সহযোগি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সাপোর্ট পাওয়ার প্রত্যাশা থাকছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৩,৫০০ কোটি টাকা।