১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালির প্রাণের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর নিভে গিয়েছিল সম্ভাবনার অনন্ত দুয়ার। কিন্তু কে জানতো বঙ্গবন্ধু ঠিক রেখে গেছেন তার যোগ্য উত্তরসূরি। ১৯৭৫ এর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। কিন্তু ঘাতকদের ষড়যন্ত্র আর অনিরাপত্তার কারনে পরিবারের সবাইকে হারানোর পরও দীর্ঘ ৬ বছর দেশে ফিরতে পারেননি তারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ তখনও চেনা ভঙ্গিমায়। অল্প সময়ের মধ্যেই নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। নতুন করে দেশ গড়ার স্বপ্নে বলীয়ান হওয় ওঠেন। তখন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই নেতা-কর্মীরা কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করেন। ১৯৮১ সালে ফেব্রুয়ারির ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে সে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ঐ বছরেরই ১৭ মে তারিখে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সে হিসেবে ১৭ মে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।
ওই দিনটি ছিল রবিবার। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত এলাকাজুড়ে লাখো জনতার ঢল নামে। সেদিনের গগনবিদারী মেঘ গর্জন, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেওয়ার লক্ষ্যে গর্জে উঠেছিল, আর অবিরাম মুষল ধারে ভারী বর্ষণে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছিল বাংলার মাটিতে পিতৃ হত্যার জমাট বাঁধা পাপ আর কলঙ্কের চিহ্ন। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের সব সদস্যের রক্তে ভেজা বাংলার মাটি স্পর্শ করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই সময় উন্মত্ত জনতা সামরিক শাসক জিয়ার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে।
অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। কিন্তু সেদিনও শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম শুরু করেন শেখ হাসিনা। বারবার প্রাণ নাশের চেষ্টা হলেও কখনোই থামেননি বঙ্গবন্ধু কন্যা। সফল সংগ্রামে সাফল্যের পথ ধরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বিজয়ী করে তিনি সরকার গঠন করেন। শত প্রতিকূলতা জয় করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পিতামাতা হারা নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত অবস্থায় জনগণের ডাকে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, মানবিক মানুষ, বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক, ৩ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে এসেই আওয়ামী লীগ সংগঠিত করার কাজে মনোঃসংযোগ ঘটান। হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের উজ্জীবিত করেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য দেশব্যাপী সফর শুরু করে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি ফিরেছিলেন বলেই পাল্টে গেছে বাংলাদেশের গতিপথ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপমহাদেশের রাজনীতিতে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে সাধারণ মানুষের দাবি দাওয়া আদায়ে বরাবরের মতোই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গণমানুষের দল হিসেবে তৃণমূল হতে শুরু করে জাতীয় পর্যায়েও সুদৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে দলটি।
আমাদের গৌরবের ইতিহাস মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে দলটির দায়িত্বশীল ও সংগ্রামী ভূমিকা মুক্তিকামী মানুষদের অনুপ্রেরণা হয়ে আন্দোলিত করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও যৌক্তিক দাবি আদায়ে নেতৃত্বের ভূমিকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
স্বৈরতন্ত্রের বিলুপ্তিসহ যুদ্ধাপরাধের বিচার ও অন্যান্য প্রত্যেকটি ইতিবাচক আন্দোলন সংগ্রামের প্রথম সারিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যথোপযুক্ত ভূমিকা জনগণের নিকট নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালির ইতিহাস, বাংলার সংস্কৃতি ও সভ্যতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, মুক্তবুদ্ধির চর্চায় দলটি সৃষ্টিলগ্ন থেকেই নৈপুণ্য দেখিয়েছে।
বর্তমান সময়েও ছিটমহলের সুরাহাকরণ, সমুদ্র বিজয় ইত্যাদি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের নিকট দল হিসেবে যৌক্তিকতা দেখিয়ে চলেছে। অন্য দলের তুলনায় আওয়ামী লীগের পার্থক্য ও দূরদর্শিতার স্পষ্ট ছাপও রাখতে সক্ষম হয়েছে দলটি।
তবে শেখ হাসিনার এ পথ মসৃণ ছিল না, কন্টকাকীর্ণ পথকে মাড়িয়েই তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। অসংখ্যবার আক্রমণ হয়েছে তার ওপর, মৌলবাদী গোষ্ঠী শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে সোচ্চার এখনো। তদুপরি তিনি নিরলস সংগ্রাম করে চলেছেন দেশের জন্য।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস হামলা সংঘটিত হয়েছিল খুনি চক্রদের মদদে। মূলত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই মৌলবাদীদের স্বার্থ রক্ষা হয়। কিন্তু সেদিন সৃষ্টিকর্তার মহিমায় বেঁচে যান রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা, পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা যে মানবঢাল তৈরি করেছিলেন সেটিও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ইতিহাস।
মানুষের ভালবাসাই শেখ হাসিনার কাছে অমূল্য সম্পদ। তিনি এ বিষয়টি বিভিন্ন আলোচনায় জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। ওই দিন নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি না করলে শেখ হাসিনার কী হতো সেটা বলা মুশকিল, এখনো তিনি কানের যন্ত্রণায় ভুগছেন। আবার ওই দিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পোড়খাওয়া কর্মীরা তাদের নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটা দেখাতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও তার দলের নেতাকর্মী সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, দলের তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রেসিডিয়ামের সদস্যের প্রতি নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। বিপদে আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করেন।
মানবিক মানুষ হিসেবে শেখ হাসিনা উপমহাদেশীয় তথা বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনন্য। সর্বশেষ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে তিনি মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অন্য কোন রাষ্ট্রপ্রধান কি সহসাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন? এখানেই শেখ হাসিনা অনন্য। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনাকে মাদার অব হিউম্যানিটি পদকে ভূষিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। পাশাপাশি শেখ হাসিনার সরকার কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের সরকারকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানোর ব্যাপারেও তৎপর।
২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরে আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও সাহসী সিদ্ধান্তে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে অগ্রগতির সোপানে পা ফেলেছে বাংলাদেশ। সবকিছু সঠিকভাবে পরিচালিত হলে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। উন্নয়নের অনেকগুলো সূচকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর থেকে অনেকাংশে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে আশার সঞ্চার করেছে, বাংলাদেশকে ফলো করছে বহির্বিশ্ব।
বর্তমান সরকারের গ্রহণীয় উদ্যোগ বিশেষ করে মেগা প্রকল্পের তড়িৎ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীল বিশ্বে কর্মদক্ষতার গুণে আলাদা বিশেষত্ব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক তাদের সংযুক্তি প্রত্যাহার করে নেয় পদ্মা সেতু থেকে। দৃঢ়চিত্তের অধিকারী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নিজেদের টাকায় করার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। পদ্মা সেতু এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবে প্রতিফলিত হতে চলেছে, ইতিমধ্যে সেতুর উন্নয়ন কাজের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালতসহ বিভিন্ন জায়গায় বিচার সালিশের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি হয়নি। তাছাড়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য কোন অর্থ ছাড় দেয়নি বিশ্বব্যাংক। তদুপরি দুর্নীতির অভিযোগ করাটা কোনভাবেই মানানসই ছিল না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়েও শেখ হাসিনা প্রবল চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। বৈশ্বিক নেতাদের অন্যায্য অনুরোধকে অগ্রাহ্য করে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত থেকে এক পা সরে আসেননি বঙ্গবন্ধু কন্যা। বিচক্ষণ এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে শেখ হাসিনা উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ছাড়াও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজের নেতৃত্বগুণকে বিকাশ করেছেন। এমনও হয়েছে অন্য দেশের নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য শেখ হাসিনার সাথে সখ্যতার চিত্র তুলে ধরেছেন প্রার্থীরা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও শেখ হাসিনার গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেখ হাসিনাও নিজস্ব সক্ষমতা এবং প্রজ্ঞার সম্মিলন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থা থেকে স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার ও উপাধি পেয়েছেন। এ সবই শেখ হাসিনার অর্জন। কার্যত বলাই চলে তিনি না ফিরলে হয়তো পাল্টে যেতো দেশের ইতিহাস।





















