করোনা মহামারির মধ্যে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগকারী কিংবা ব্যাংকÑ কারোরই আগ্রহ নেই। শুধু সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় পুরনো গ্রাহকদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। যে কারণে চলতি মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। হচ্ছে না নতুন বিনিয়োগ। যে কারণে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে যে পরিমাণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে তার বড় অংশই প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ। বাকি অংশের বেশিরভাগই পূর্বের ঋণের অনাদায়ী সুদ। ব্যাংকগুলো নতুন বিনিয়োগ করেছে খুব সামান্যই। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ; গত অর্থবছরের এপ্রিলে ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিল শেষে এর পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ১৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে ৮৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। আর এই এক বছরে ৮৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এতেই বোঝা যায়, মহামারিকালে নতুন কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি; সামান্য কিছু যা বিতরণ হয়েছে, তা চলমান কিছু ভালো প্রকল্পের ঋণ। গত ৩১ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, করোনাভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলায় সরকার এখন পর্যন্ত ২৩টি প্যাকেজের আওতায় মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৮৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকার তহবিল ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাস্তবায়নের হার মোট প্যাকেজের ৮৩ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই এক বছরের পুরোটা সময় ধরেই ছিল করোনাভাইরাস মহামারির ধকল। সেই ধাক্কায় নতুন ঋণ বিতরণ করতে সাহস পায়নি ব্যাংকগুলো। উদ্যোক্তারাও ঋণ নিতে এগিয়ে আসেনি। তবে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ সন্তোষজনক বলে জানান তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, মহামারির ধাক্কায় গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। এরপর সরকারের প্রণোদনা ঋণে ভর করে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ হয়। আগস্টে তা আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে এবং সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে ওঠে। কিন্তু অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। নভেম্বরে তা আরও কমে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ হয়। ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়। ২০২১ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫১ ও ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সরকারি ঋণপ্রবাহেও একই হাল: প্রবৃদ্ধি কমেছে সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও। এপ্রিল শেষে সরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এ হিসাবে এই এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগের মাস মার্চে এই ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে ছিল ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও এই একই লক্ষ্য ধরা ছিল, বিপরীতে ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত বছরের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০-২১ অর্থবছরের যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ; যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে এপ্রিল মাস শেষে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণ ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। সরকার নিয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিল শেষে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। যার মধ্যে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আর সরকারের ঋণ ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এ হিসাবেই এপ্রিল শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সরকারি ঋণের ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ; আর বেসরকারি খাতে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আসলে এখন ঋণের চাহিদাই নেই। সাম্প্রতিককালে যেসব খাতে ভালো ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেখানে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি শেষ অবধি কোথায় গিয়ে ঠেকে, কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- সে জন্য উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছেন।’
০৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
নতুন ঋণে আগ্রহ নেই গ্রাহক ও ব্যাংকের
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - প্রকাশিত : ১২:০০:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুন ২০২১
- 49
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















