০২:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত মরিচ-রসুনে সম্ভাবনা

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত উন্নত জাতের মরিচ ও রসুন কৃষকদের কাছে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বিজ্ঞানীরা। এতে করে জাতটি সারাদেশে ছড়িয়ে যাবার পাশাপাশি লাভবান হবে চাষীরা।

ময়মনসিংহ সদরের সুতিয়াখালি কাশিয়ারচর এলাকায় বিনা’র তত্বাবধানে বিনামরিচ-১ চার বিঘা জমিতে চলতি বছরের (অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর) ও বিনারসুন-১ পাঁচ বিঘা জমিতে শীতকালীন মৌসুমে চাষাবাদে করা হবে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, এ জাতের মরিচের ফলন প্রচলিত জাতের তুলনায় অনেক বেশী হয়। ঝাল তুলনামূলকভাবে কম ও সুগন্ধিযুক্ত এবং সাকুলেন্ট। এ গাছটি আকারে খাটো ও ঝোপালো। প্রথম মরিচ সংগ্রহের পর গাছে ফলনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি আকারে বড় ও মাংসল।

চারা লাগানোর মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর গাছে ফুল আসা শুরু করে এবং পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে কাঁচা মরিচ পাওয়া যায়। সাধারণত এভাবে ৯ থেকে ১২ বার কাঁচা মরিচ তোলা যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিনারসুন-১ জাতটি প্রতি হেক্টরে ১৩ থেকে ১৫ টন উৎপাদন করা সম্ভব। যা অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশী। ঝাজঁ বেশী হওয়ায় রান্নায় রসুনের পরিমাণও লাগবে কম।

এছাড়া প্রচলিত জাতের তুলনায় এ রসুনের কার্যক্ষমতা বেশী। রোপনের পর মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে রসুন ঘরে তোলা যায়। আকারে বড় হওয়ায় উৎপাদন বেশী হয়। এ রসুনের উৎপাদন খরচ অনেক কম এবং রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে খুবই কম।

এ দুটি জাতের উদ্ভাবক বিনা’র বিজ্ঞানী ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, বিনামরিচ-১ জাতটি দেশের বিভিন্ন মসলা উৎপাদনকারী অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোন ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়নি। তবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ্যানথ্রাকনোজ রোগ, থ্রিপস এবং জাবপোকার প্রতি সহনশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। সে ক্ষেত্রে জমিতে চারা রোপনের পূর্বে ডিডি মিকচার বা ফুরাডন- ৫ জি দ্বারা মাটি শোধন করে নিলে এ সকল রোগের প্রকোপ নিশ্চিত কমে যাবে।

তিনি আরও বলেন, মিউট্যান লাইন ঈযরষরফ৭৫চ১ এর জার্মপ্লাজমটি ২০১২ সালে চীনের স্থানীয় জাত (খধহফৎধপব) থেকে কৌলিক সারি হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। এই কৌলিক সারিটি সাইবারডর্ফ ল্যাবরেটারী ভিয়েনা, অস্ট্রিয়ায় বীজে বিভিন্ন মাত্রায় রেডিয়েশন (৭৫ গ্রে, ১৫০ গ্রে এবং ৩০০ গ্রে) প্রয়োগের ফলে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য দেখা যায়।

সেখান থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম মিউট্যান্ট প্রজন্ম ময়মনসিংহ, ঈশ্বরদী, মাগুরা, রংপুর, বগুড়া, খাগড়াছড়ি ও কুমিল্লার উপকেন্দ্র এবং কৃষকের মাঠে ৪ থেকে ৫ বছর শীত মৌসুমে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তুলনামূলক ফলন মূল্যায়ণ করা হয়।

এরপর অগ্রগামী মিউট্যান্টটি (ঈযরষরউ৭৫চ১) শীত মৌসুমে রোপনের জন্য (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্যে এপ্রিল) ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৭ সালে বিনামরিচ-১ উচ্চ ফলনশীল জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য নিবন্ধিত হয়। আমরা বিনামূল্যে চাষীদেরকে এ জাতটি দিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পরিকল্পনা করছি।

বিনারসুন-১ এর উদ্ভাবনের সাফল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, উচ্চ ফলনশীল জাতের অপ্রতুলতার কারণে বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় রসুনের ফলন কম? ফলে এর উন্নতজাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা শুরু হয়।

ভারতের নদীয়া থেকে রসুনের তিনটি জেনোটাইপ সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে অঈ-৫ কোলিক সারিটির ফলন বাংলাদেশে চাষাবাদকৃত অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশী এবং দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে যথাযথভাবে ট্রায়াল সম্পন্ন করে জেনোটাইপটি বিনারসুন-১ নামে ২০১৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক কৃষক পর্যায়ে সারাদেশে চাষাবাদের জন্য নিবন্ধিত হয়। এর আগে দীর্ঘ তিন বছর এ জাতটি নিয়ে গবেষণা করে সাফল্য পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, বিনামরিচ-১ জাতের ফলন (গ্রিনচিলি) প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৫ টন পাওয়া যায়। জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ১৩০ থেকে ১৪০ ভাগ বেশী ফলন দেয়।

এছাড়া বিনারসুন-১ জাতটি অন্যান্য জাতের তুলনায় আকারে বড় হয়। এর প্রতিটি রসুনের কন্দে ২৪ থেকে ৩০টি কোয়া থাকে। এর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম এবং রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে খুবই কম।

মহাপরিচালক আরও বলেন, দীর্ঘ গবেষণার পর এই জাতগুলো উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের চাষীদের কাছে এ জাতটি ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ দুটি
জাত চাষাবাদ করলে খরচ কমার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হবে চাষীরা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

বাসভাড়া কত বাড়বে জানা যাবে বৃহস্পতিবার

বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত মরিচ-রসুনে সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ১২:০১:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুন ২০২১

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত উন্নত জাতের মরিচ ও রসুন কৃষকদের কাছে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বিজ্ঞানীরা। এতে করে জাতটি সারাদেশে ছড়িয়ে যাবার পাশাপাশি লাভবান হবে চাষীরা।

ময়মনসিংহ সদরের সুতিয়াখালি কাশিয়ারচর এলাকায় বিনা’র তত্বাবধানে বিনামরিচ-১ চার বিঘা জমিতে চলতি বছরের (অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর) ও বিনারসুন-১ পাঁচ বিঘা জমিতে শীতকালীন মৌসুমে চাষাবাদে করা হবে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, এ জাতের মরিচের ফলন প্রচলিত জাতের তুলনায় অনেক বেশী হয়। ঝাল তুলনামূলকভাবে কম ও সুগন্ধিযুক্ত এবং সাকুলেন্ট। এ গাছটি আকারে খাটো ও ঝোপালো। প্রথম মরিচ সংগ্রহের পর গাছে ফলনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি আকারে বড় ও মাংসল।

চারা লাগানোর মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর গাছে ফুল আসা শুরু করে এবং পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে কাঁচা মরিচ পাওয়া যায়। সাধারণত এভাবে ৯ থেকে ১২ বার কাঁচা মরিচ তোলা যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিনারসুন-১ জাতটি প্রতি হেক্টরে ১৩ থেকে ১৫ টন উৎপাদন করা সম্ভব। যা অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশী। ঝাজঁ বেশী হওয়ায় রান্নায় রসুনের পরিমাণও লাগবে কম।

এছাড়া প্রচলিত জাতের তুলনায় এ রসুনের কার্যক্ষমতা বেশী। রোপনের পর মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে রসুন ঘরে তোলা যায়। আকারে বড় হওয়ায় উৎপাদন বেশী হয়। এ রসুনের উৎপাদন খরচ অনেক কম এবং রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে খুবই কম।

এ দুটি জাতের উদ্ভাবক বিনা’র বিজ্ঞানী ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, বিনামরিচ-১ জাতটি দেশের বিভিন্ন মসলা উৎপাদনকারী অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোন ক্ষতিকারক পোকা-মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়নি। তবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ্যানথ্রাকনোজ রোগ, থ্রিপস এবং জাবপোকার প্রতি সহনশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। সে ক্ষেত্রে জমিতে চারা রোপনের পূর্বে ডিডি মিকচার বা ফুরাডন- ৫ জি দ্বারা মাটি শোধন করে নিলে এ সকল রোগের প্রকোপ নিশ্চিত কমে যাবে।

তিনি আরও বলেন, মিউট্যান লাইন ঈযরষরফ৭৫চ১ এর জার্মপ্লাজমটি ২০১২ সালে চীনের স্থানীয় জাত (খধহফৎধপব) থেকে কৌলিক সারি হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। এই কৌলিক সারিটি সাইবারডর্ফ ল্যাবরেটারী ভিয়েনা, অস্ট্রিয়ায় বীজে বিভিন্ন মাত্রায় রেডিয়েশন (৭৫ গ্রে, ১৫০ গ্রে এবং ৩০০ গ্রে) প্রয়োগের ফলে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য দেখা যায়।

সেখান থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম মিউট্যান্ট প্রজন্ম ময়মনসিংহ, ঈশ্বরদী, মাগুরা, রংপুর, বগুড়া, খাগড়াছড়ি ও কুমিল্লার উপকেন্দ্র এবং কৃষকের মাঠে ৪ থেকে ৫ বছর শীত মৌসুমে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তুলনামূলক ফলন মূল্যায়ণ করা হয়।

এরপর অগ্রগামী মিউট্যান্টটি (ঈযরষরউ৭৫চ১) শীত মৌসুমে রোপনের জন্য (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্যে এপ্রিল) ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৭ সালে বিনামরিচ-১ উচ্চ ফলনশীল জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য নিবন্ধিত হয়। আমরা বিনামূল্যে চাষীদেরকে এ জাতটি দিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পরিকল্পনা করছি।

বিনারসুন-১ এর উদ্ভাবনের সাফল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, উচ্চ ফলনশীল জাতের অপ্রতুলতার কারণে বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় রসুনের ফলন কম? ফলে এর উন্নতজাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা শুরু হয়।

ভারতের নদীয়া থেকে রসুনের তিনটি জেনোটাইপ সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে অঈ-৫ কোলিক সারিটির ফলন বাংলাদেশে চাষাবাদকৃত অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশী এবং দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে যথাযথভাবে ট্রায়াল সম্পন্ন করে জেনোটাইপটি বিনারসুন-১ নামে ২০১৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক কৃষক পর্যায়ে সারাদেশে চাষাবাদের জন্য নিবন্ধিত হয়। এর আগে দীর্ঘ তিন বছর এ জাতটি নিয়ে গবেষণা করে সাফল্য পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম আজকের বিজনেস বাংলাদেশকে বলেন, বিনামরিচ-১ জাতের ফলন (গ্রিনচিলি) প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৫ টন পাওয়া যায়। জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ১৩০ থেকে ১৪০ ভাগ বেশী ফলন দেয়।

এছাড়া বিনারসুন-১ জাতটি অন্যান্য জাতের তুলনায় আকারে বড় হয়। এর প্রতিটি রসুনের কন্দে ২৪ থেকে ৩০টি কোয়া থাকে। এর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম এবং রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে খুবই কম।

মহাপরিচালক আরও বলেন, দীর্ঘ গবেষণার পর এই জাতগুলো উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের চাষীদের কাছে এ জাতটি ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ দুটি
জাত চাষাবাদ করলে খরচ কমার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হবে চাষীরা।