বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ জেলা ভোলা। কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে ভোলার। ভোলার চারপাশে অসংখ্য নদ-নদী, অভ্যন্তরে রয়েছে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডোবা, খাল-বিল, জলাশয় ও পুকুর। জেলায় পানিতে ডুবে যে সংখ্যক শিশু প্রাণ হারায় তা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া সহ অন্যান্য ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানো শিশুর সংখ্যা থেকে কোনো অংশে কম নয়। বিভিন্ন উৎসবে গ্রামের বাড়ি ঘুরতে এসে, খেলা-ধুলা করতে গিয়ে পুকুর-ডোবায় পরে এ দুর্ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। এর মধ্যে ৮ বছরের নীচের শিশুদের সংখ্যাই সর্বাধিক।
জেলা সিভিল সার্জন অফিস সুত্রে জানা যায়, এ বছর ভোলায় পানিতে ডুবে ৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভোলা সদরে-১২, দৌলতখানে-৬, বোরহানউদ্দিনে-৩, তজুমুদ্দিনে-৭, লালমোহনে-১৩, চরফ্যশনে-২০ ও মনপুরায়-৩ শিশুর মৃত্যু হয়। তবে প্রকৃত পক্ষে এ সংখ্যা এর ৫ গুন ছাড়িয়ে যাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন ।
স্থানীয়দের মতে, অধিকাংশ সময়ে পানিতে ডুবে যাওয়ার পর উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পথে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকে। এছাড়া মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা পর মৃত শরীর পানিতে ভেসে উঠলে পারিবারিক ভাবে দাফন সম্পন্ন হয়ে থাকে। এতে করে এ বিষয় নিয়ে কোনো রিপোর্ট হয়না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কিংবা পুলিশের খাতাতেও এদের সংখ্যা উঠেনা।
শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করলে জানান, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর জন্য প্রধান কারণগুলো হচ্ছে জেলার চারপাশে নদী, সর্বত্র জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডোবা, খাল-বিল, জলাশয় ও পুকুর, উন্নত চিকিৎসা ও দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব, ৫ বছর বয়সের পর শিশুদের সাঁতার না শেখানো।
বিগত দিনের দুর্ঘটনা থেকে লক্ষ করা গেছে, পানিতে ডুবে প্রান হারানো শিশুদের মধ্যে অধিকাংশই বাড়িঘেষা পুকুর-ডোবায় পরে মারা গেছে। যাদের বয়স ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। বর্ষা মৌসুমে যখন বৃষ্টির পানিতে খাল, বিল, ডোবা, জলাশয় ও পুকুর ভরে যায় তখন এ দুর্ঘটনার পরিমান সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়। দরিদ্র পরিবারে শিশুদের দেখ-ভাল করার অভাব, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে শিশুদের সাঁতার না শেখা এ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই বৃদ্ধি করছে।
তাঁরা আরো জানান, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বন্ধ করা না গেলেও কিছু পদক্ষেপ মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে। সরকার এককভাবে এ সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবে না। সরকারের পাশাপাশি সচেতন মহল ও অভিবাবকদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। শিশুদের খেলাধুলা ও ঘুরে বেড়ানোর জায়গার আশে পাশে অবস্থিত সব ধরনের জলাশয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে পানিতে ডুবে এ মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যেতে পারে। বাড়ির আঙ্গীনায় থাকা ডোবা ভরাট, পুকুরের চারপাশে বেড়া দিয়ে রাখা, শিশুদের বয়স ৫-৬ বছর হলে সাঁতার শেখানো, বাচ্চা শিশুদের সার্বক্ষনিক নজরদারিতে রাখা এ বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রাখবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ফায়ার সার্ভিস , সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এলাকার তরুণ যুবকদের নিয়ে উদ্ধার কমিটি তৈরি করতে হবে, দুর্ঘটনার পর কি কি করনীয় তা সম্পর্কে তাদরেকে সঠিক প্রশিক্ষন দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাবক ও স্থানীয়দের নিয়ে মাসিক মতবিনিময় সহ অন্যান্য সভার আয়োজন করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।




















