১০:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দম্পত্তিকে টর্চার সেলে তিন দিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

নওগাঁর মহাদেবপুরে মিঠুন চৌধুরী (২৭) নামে এক নার্সারী ব্যবসায়ীকে ফুসলিয়ে অপহরণ করে টর্চার সেলে তিন দিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ও তার স্ত্রী শ্যামলী রাণীর (২৫) চুল কর্তনের ঘটনার ৯ দিন পর অবশেষে থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ অভিযুক্ত স্থানীয় যুবদল নেতা রুহুল আমিনের দুই স্ত্রী রুবাইয়া আকতার বৃষ্টি (২২) ও মুক্তা পারভীনকে (২১) অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ঘটনার মূল আসামী যুবদল নেতা ও প্রভাবশালী নেতা রুহুল আমিন (২৮) ও তরিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
রুহুল মহাদেবপুর উপজেলার দক্ষিণ হোসেনপুর বোয়ালমারী মোড়ের চাতাল ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী কৌটিপতি আবুল কালামের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের আহŸায়ক কমিটির সদস্য। অপরজন রুহুলের সহযোগী পতœীতলা উপজেলার ছোট চাঁদপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম (৪০)।
নির্যাতনের শিকার মিঠুন চৌধুরী পতœীতলা উপজেলার উত্তর মামুদপুর গ্রামের কৃষ্ণ চৌধুরীর ছেলে ও মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী রাণী। তারা পতœীতলা উপজেলায় আত্রাই নদ উপর সেতু সংলগ্ন সওজের রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে বসবাস করেন।
নির্যাতনের শিকার শ্যামলী রাণী জানান, রুহুল আমিন তাদের নার্সারী থেকে বিভিন্ন জাতের চারাগাছ কিনতেন। এমতাবস্তায় গাছ কেনা নেওয়া নিয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে দ্ব›দ্ব হয়। এছাড়া রুহুলের বাড়িতে কাজ করার জন্যে বলেন। সেটা অপারগতা করলে গত ১৫ আগস্ট সকালে রুহুল তার কাজ করার জন্য মিঠুনকে ডেকে নিয়ে জোড়পূর্বক তার কার গাড়িতে উঠিয়ে মহাদেবপুরে নিয়ে আসেন। সেখানে তার বয়লারের সামনে অবস্থিত টর্চার সেলে মিঠুনকে আটকে রেখে মোবাইলফোনে ১০ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন। শ্যামলী রাণী তার শাশুড়ির গলার সোনার মালা বন্ধক রেখে বিকাশে ১০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু রুহুল ও তার লোকেরা আরও টাকা চান। টাকা না পেয়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিঠুনের পায়ের রগ কেটে দেয়, প্লায়ার দিয়ে চিমটিয়ে হাতের আঙ্গুল জখম করে, হাতুড়ি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। তাকে ঠিকমত খেতেও দেয়া হয়নি। তৃতীয় দিন ১৭ আগস্ট শ্যামলী পতœীতলা থেকে মহাদেবপুর থানার সামনে এসে এসআই সাইফুল ইসলামকে বিষয়টি জানিয়ে রুহুলের বয়লারে যান। সেখানে রুহুল ও তার দুই স্ত্রী শ্যামলীকে বেদম প্রহার করে তার মাথার চুল কেটে দেয়। পরে এসআই সাইফুল সেখানে উপস্থিত হয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় শ্যামলী ও তার স্বামীকে রুহুলের টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করেন। কিন্তু পুলিশের রহস্যজনক তৎপরতা না থাকায় এবং সরকার ও বিরোধী দলীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থাকা রুহুল বা তার দুই স্ত্রীগং তাদের হত্যারসহ বিভিন্ন ভীতি দেখালে রুহুলগংদের বিরুদ্ধে কোনই ব্যবস্থা নিতে সাহস পাননি। পরে স্বামী-স্ত্রী অসুস্থ্য অবস্থায় গ্রামের বাড়ি চলে যান।
এরপর রোববার বিকেল পর্যন্ত শ্যামলীর বাড়িতে মারাত্মক আহত অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীকে বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাত ছিলেন। ঘটনাটি স্থানীয় সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করলে পুরো জেলায় বিষয়টি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়। এরপরই থানা পুলিশ টনক নড়ে। রাতেই থানা পুলিশ শ্যামলী রাণীকে পতœীতলা থেকে তুলে এনে মহাদেবপুর থানায় মামলা এন্ট্রি করে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, ওই টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার অনেকেই তাদের ঘটনাও গণমাধ্যমে প্রকাশের অনুরোধ জানান। অভিযুক্ত রুহুল কোটিপতির ছেলে ও রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় তার বয়লারে প্রায়ই মাদকের ও গ্রæপসেক্সের আসর বসতো। রুহুল তার কার ব্যবহার করে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে মাদকের চালান পৌঁছে দিত। এসব কাজের বিরোধীতা করলে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ফলে রুহুলের বিরুদ্ধে কেউ কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। রুহুল উপজেলা যুবদলের সক্রিয় সদস্য হলেও সম্প্রতি সরকার দলীয় একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাদকের আসরে জিম্মি করে অনেকের সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা।
এদিকে মহাদেবপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে রুহুলকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত পুলিশ এ ব্যাপারে কোনই পদক্ষেপ নেয়নি। পুলিশী অভিযানের কিছুক্ষণ আগেই রহস্যজনক ভাবে রুহুল কার যোগে পালিয়ে যায়। পুলিশ কারটি জব্দ করলেও রুহুলকে আটক করতে সক্ষম হয়নি। সোমবার দুপুর পর্যন্ত রুহুলের ব্যবহৃত মোবাইফোন চালু থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ তাকে আটক করতে পারেনি।
পুলিশের গাফলতির অভিযোগ অস্বীকার করে মহাদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজম উদ্দিন মাহমুদ জানান, সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় নির্যাতনের শিকার শ্যামলী রাণী বাদী হয়ে মহাদেবপুর থানায় চার জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। রাতেই থানা পুলিশ রুহুলের বাসায় অভিযান চালিয়ে তার দুই স্ত্রীকে আটক করে। কিন্তু মূল আসামী রুহুল পালিয়ে যায়। পুলিশ তার ব্যবহৃত কার (ঢাকা-৭৫৫/৯) জব্দ করেছে ও ভুক্তভোগীদের স্বাক্ষর নেয়া ফাঁকা ষ্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে।
অপরপ্রশ্নে ওসি আজম উদ্দিন মাহমুদ আরো জানান, রুহুল রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী যেই হোক না কেন কেউ আইনের উর্ধ্বে নন। তাকে আটকের জোড় তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

দম্পত্তিকে টর্চার সেলে তিন দিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

প্রকাশিত : ০৭:২৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ অগাস্ট ২০২১

নওগাঁর মহাদেবপুরে মিঠুন চৌধুরী (২৭) নামে এক নার্সারী ব্যবসায়ীকে ফুসলিয়ে অপহরণ করে টর্চার সেলে তিন দিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ও তার স্ত্রী শ্যামলী রাণীর (২৫) চুল কর্তনের ঘটনার ৯ দিন পর অবশেষে থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ অভিযুক্ত স্থানীয় যুবদল নেতা রুহুল আমিনের দুই স্ত্রী রুবাইয়া আকতার বৃষ্টি (২২) ও মুক্তা পারভীনকে (২১) অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ঘটনার মূল আসামী যুবদল নেতা ও প্রভাবশালী নেতা রুহুল আমিন (২৮) ও তরিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
রুহুল মহাদেবপুর উপজেলার দক্ষিণ হোসেনপুর বোয়ালমারী মোড়ের চাতাল ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী কৌটিপতি আবুল কালামের ছেলে ও উপজেলা যুবদলের আহŸায়ক কমিটির সদস্য। অপরজন রুহুলের সহযোগী পতœীতলা উপজেলার ছোট চাঁদপুর গ্রামের তরিকুল ইসলাম (৪০)।
নির্যাতনের শিকার মিঠুন চৌধুরী পতœীতলা উপজেলার উত্তর মামুদপুর গ্রামের কৃষ্ণ চৌধুরীর ছেলে ও মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী রাণী। তারা পতœীতলা উপজেলায় আত্রাই নদ উপর সেতু সংলগ্ন সওজের রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় টিনের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে বসবাস করেন।
নির্যাতনের শিকার শ্যামলী রাণী জানান, রুহুল আমিন তাদের নার্সারী থেকে বিভিন্ন জাতের চারাগাছ কিনতেন। এমতাবস্তায় গাছ কেনা নেওয়া নিয়ে টাকা-পয়সা নিয়ে দ্ব›দ্ব হয়। এছাড়া রুহুলের বাড়িতে কাজ করার জন্যে বলেন। সেটা অপারগতা করলে গত ১৫ আগস্ট সকালে রুহুল তার কাজ করার জন্য মিঠুনকে ডেকে নিয়ে জোড়পূর্বক তার কার গাড়িতে উঠিয়ে মহাদেবপুরে নিয়ে আসেন। সেখানে তার বয়লারের সামনে অবস্থিত টর্চার সেলে মিঠুনকে আটকে রেখে মোবাইলফোনে ১০ হাজার টাকা পাঠাতে বলেন। শ্যামলী রাণী তার শাশুড়ির গলার সোনার মালা বন্ধক রেখে বিকাশে ১০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু রুহুল ও তার লোকেরা আরও টাকা চান। টাকা না পেয়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিঠুনের পায়ের রগ কেটে দেয়, প্লায়ার দিয়ে চিমটিয়ে হাতের আঙ্গুল জখম করে, হাতুড়ি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। তাকে ঠিকমত খেতেও দেয়া হয়নি। তৃতীয় দিন ১৭ আগস্ট শ্যামলী পতœীতলা থেকে মহাদেবপুর থানার সামনে এসে এসআই সাইফুল ইসলামকে বিষয়টি জানিয়ে রুহুলের বয়লারে যান। সেখানে রুহুল ও তার দুই স্ত্রী শ্যামলীকে বেদম প্রহার করে তার মাথার চুল কেটে দেয়। পরে এসআই সাইফুল সেখানে উপস্থিত হয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় শ্যামলী ও তার স্বামীকে রুহুলের টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করেন। কিন্তু পুলিশের রহস্যজনক তৎপরতা না থাকায় এবং সরকার ও বিরোধী দলীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থাকা রুহুল বা তার দুই স্ত্রীগং তাদের হত্যারসহ বিভিন্ন ভীতি দেখালে রুহুলগংদের বিরুদ্ধে কোনই ব্যবস্থা নিতে সাহস পাননি। পরে স্বামী-স্ত্রী অসুস্থ্য অবস্থায় গ্রামের বাড়ি চলে যান।
এরপর রোববার বিকেল পর্যন্ত শ্যামলীর বাড়িতে মারাত্মক আহত অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীকে বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাত ছিলেন। ঘটনাটি স্থানীয় সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করলে পুরো জেলায় বিষয়টি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়। এরপরই থানা পুলিশ টনক নড়ে। রাতেই থানা পুলিশ শ্যামলী রাণীকে পতœীতলা থেকে তুলে এনে মহাদেবপুর থানায় মামলা এন্ট্রি করে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, ওই টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার অনেকেই তাদের ঘটনাও গণমাধ্যমে প্রকাশের অনুরোধ জানান। অভিযুক্ত রুহুল কোটিপতির ছেলে ও রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় তার বয়লারে প্রায়ই মাদকের ও গ্রæপসেক্সের আসর বসতো। রুহুল তার কার ব্যবহার করে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে মাদকের চালান পৌঁছে দিত। এসব কাজের বিরোধীতা করলে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ফলে রুহুলের বিরুদ্ধে কেউ কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। রুহুল উপজেলা যুবদলের সক্রিয় সদস্য হলেও সম্প্রতি সরকার দলীয় একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাদকের আসরে জিম্মি করে অনেকের সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা।
এদিকে মহাদেবপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে রুহুলকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত পুলিশ এ ব্যাপারে কোনই পদক্ষেপ নেয়নি। পুলিশী অভিযানের কিছুক্ষণ আগেই রহস্যজনক ভাবে রুহুল কার যোগে পালিয়ে যায়। পুলিশ কারটি জব্দ করলেও রুহুলকে আটক করতে সক্ষম হয়নি। সোমবার দুপুর পর্যন্ত রুহুলের ব্যবহৃত মোবাইফোন চালু থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ তাকে আটক করতে পারেনি।
পুলিশের গাফলতির অভিযোগ অস্বীকার করে মহাদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজম উদ্দিন মাহমুদ জানান, সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় নির্যাতনের শিকার শ্যামলী রাণী বাদী হয়ে মহাদেবপুর থানায় চার জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। রাতেই থানা পুলিশ রুহুলের বাসায় অভিযান চালিয়ে তার দুই স্ত্রীকে আটক করে। কিন্তু মূল আসামী রুহুল পালিয়ে যায়। পুলিশ তার ব্যবহৃত কার (ঢাকা-৭৫৫/৯) জব্দ করেছে ও ভুক্তভোগীদের স্বাক্ষর নেয়া ফাঁকা ষ্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে।
অপরপ্রশ্নে ওসি আজম উদ্দিন মাহমুদ আরো জানান, রুহুল রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী যেই হোক না কেন কেউ আইনের উর্ধ্বে নন। তাকে আটকের জোড় তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ