১১:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যেসব কারণে আলোচিত ছিলেন নাজমুল হুদা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত একটি নাম ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি সরকার যে দুইবার ক্ষমতায় ছিল সে দু’বারই মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে দলীয় প্রধানের সমালোচনা, কখনো বিদেশি কূটনীতিকদের কটাক্ষ, নয়তো দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।

বিএনপির অন্যতম নীতি নির্ধারক নেতা হওয়া সত্ত্বেও দলটি থেকে একাধিকবার বহিস্কার আবার নিজেই পদত্যাগ করাসহ একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার রেকর্ড রয়েছে তার।

পলিটিক্যাল রিপোর্টার হিসেবে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে কাছ থেকে দেখেছেন শাজাহান সরদার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন: রাজনীতিতে তিনি একজন স্পষ্টবাদী লোক ছিলেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যা বিশ্বাস করতেন, বলতেন। তার বিশ্বাসের সঙ্গে দলের অস্থান সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেটা নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবতেন না। রাজনীতিতে আসার আগে ও পরে তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সর্বকনিষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। বিএনপির যে কয়জন নেতার সাক্ষরে নিবন্ধন পেয়েছিল তার মধ্যে তিনি অন্যতম।

১৯৯৬ সালে নাজমুল হুদা’র অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফর্মুলা নিয়ে আলোচিত সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন শাজাহান সরদার। তিনি সেসময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন: ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তখন তথ্যমন্ত্রী। একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন। সাক্ষাতে তিনি জানালেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে তার একটি সাক্ষাতকার তিনি দিতে চান! তখন তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগে এই ইস্যুতে আন্দোলন করছিল। সবকিছু বিবেচনায় আমি তখন তাকে সাক্ষাতকারটি টাইপ করে তাতে সাক্ষর করে দিতে বলি।

যোগ করেন: পরে তিনি আমার দাবি অনুযায়ীই তার সাক্ষাতকার টাইপ করে পাতায় পাতায় সাক্ষর দেন। অনেকে আমাকে বলেছিলো এই সাক্ষাতকার ছাপলে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হবে। আমি সেগুলো খুব একটা পাত্তা না দিয়ে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সরকারের চাপে আমার পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’ সেই সাক্ষাতকারটি ছাপায়নি। পরে অন্য একটি পত্রিকায় (ইনকিলাব) ‘যে সাক্ষাতকার ছাপা হয়নি…..’ শিরোনামে সাক্ষাতকারটি ছাপা হয়। ওই বক্তব্য তার বক্তব্য বলে তিনি তা স্বীকার করে নেন।

এ ঘটনায় নাজমুল হুদাকে সরকারের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন: সাক্ষাতকারটি ছাপা হওয়ার পরদিন তিনি পদত্যাগ করেন। সেদিন আমি সচিবালয়ে গিয়েছিলাম। নিজের মধ্যে কিছুটা অপরাধ বোধ হচ্ছিলো। পদত্যাগের পর নাজমুল হুদা সচিবালয় থেকে আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। তিনি স্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। পরে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে তিনি আমাকে মিষ্টিও খাইয়ে ছিলেন। আমি রিপোর্টার হিসেবে যে নাজমুল হুদাকে দেখেছি, সেই নাজমুল হুদা সোজাসুজি কথা বলতেন, প্যাঁচে যেতেন না।

পরবর্তীকালে তার জীবনে অনেক উত্থান পতন ঘটেছে। কিন্তু সেগুলো খুব একটা কাছ থেকে দেখা হয়নি।

যেসব কারণে আলোচিত
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর একদল সেনাসদস্য কর্তৃক নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জানা যায়, ওইদিন জিয়াউর রহমানের পাশের রুমে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী’র সঙ্গে একই রুমে অবস্থান করছিলেন নাজমুল হুদা। তাদের ভূমিকা নিয়ে পরে দলে অনেক বিতর্ক হয়। পরবর্তীকালে আরেক সেনা শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েও তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি। এ ঘটনায় ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসে তাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে থেকে বাদ দেন। ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করায় ১৯৮৭ সালে তাকে আবার দলের ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর নাজমুল হুদা তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তথ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি সংসদে এ বক্তৃতায় বলেছিলেন: বিএনপি এখন ক্ষমতায় আছে, কাজেই বিএনপি যা খুশি তাই করতে পারে। এছাড়া, ‘আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে তরুণদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলাম’- তার এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হন।

১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে (১৯৯৫) আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করছিলো তখন তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন নাজমুল হুদা। ৯৬- এ এসে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের ফর্মুলা দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করেন। নিজ দলের বিপক্ষে এমন অবস্থানের কারণে সেসময় তিনি দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃতও হন। পরে অবশ্য বিএনপি তাকে আবারও দলে ফিরিয়ে নেয়।

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি সেসময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সেসময় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ৭১’এ জামায়াত পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়ে ‘অপরাধ করেনি’ বলে মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেন। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানকে অবমূল্যায়ন ও বিএনপির মূল ভিত্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য মন্ত্রিসভা থেকে নাজমুল হুদাকে অপসারণ ও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন দলেরই অপর সংসদ সদস্য মাহী বি চৌধুরী।

২০০৬ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাসকে ‘স্টুপিড’ ও ‘চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী’ আখ্যা দিয়ে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার লঙ্ঘণের দায়ে অভিযুক্ত হন নাজমুল হুদা।

২০১০ সালের ২২ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চোরপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে একত্রে বসানোর উদ্যোগ নেন নাজমুল হুদা।

নাজমুল হুদার রাজনৈতিক জীবন
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করলে ওই দলে যোগ দেন ব্রিটেন থেকে আইনের বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে আসা নাজমুল হুদা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে সেই দলেও স্থায়ী কমিটিতে স্থান হয় নাজমুল হুদার। এর পর দীর্ঘকাল ছিলেন বিএনপিতেই।

খালেদা জিয়ার সরকারে ১৯৯১ সালে তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০১০ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা নাজমুল হুদার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করলে তখন তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃত হলেও তিনি দলীয় কাজ করতে থাকেন। এক বছর পর ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল সদস্যপদ ফিরে পান তিনি।

এর পরের বছর ২০১২ সালেই আবার বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। নাজমুল হুদা পদত্যাগ করে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। নিজেই গঠন করেন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ)।

পরে সেই দল থেকেও তাকে বহিষ্কৃত হতে হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ প্রতিষ্ঠাতাকে বহিষ্কার করে নিজেই নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনএফের। ২০১৪ সালে সেই দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবুল কালাম আজাদ।

এরপর নাজমুল হুদা বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ) এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি (বিএমপি) নামে দুটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়েন, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের জোটের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন।

কিন্তু সেই চেষ্টা তার সফল হয়নি। এরপর ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর গঠন করেন তৃণমূল বিএনপি নামে নতুন রাজনৈতিক দল। যদিও এ দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তিনি শুরু করতে পারেননি। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন তৃণমূল বিএনপিকে নিবন্ধন দেয়।

দীর্ঘদিন পর আবারও আলোচনায় আসেন নাজমুল হুদা।

নামজুল হুদার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
২০০৭ সালের ২১ মার্চ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নাজমুল হুদাকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, ২০০১-২০০৬ সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ৩০ কোটি টাকার সরকারি কাজ পাইয়ে দিতে মীর জহির হোসেন নামক একজন ব্যবসায়ীর কাছ ঘুষ নিয়েছিলেন।

ওই মামলায় তাকে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আপিলের ভিত্তিতে, হাইকোর্ট ২০১১ সালে তাকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের খালাস বাতিল করে দেয়। ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর, হাইকোর্ট কারাদণ্ডের মেয়াদ ৪ বছরে কমিয়ে দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে তিনি জামিন পায়।

২০০৭ সালে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ নামে একজন বিএনপির রাজনীতিবিদ এবং ক্যাব এক্সপ্রেস লিমিটেডের মালিক নাজমুল হুদা এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০০৩ সালে দুটি মারুতি গাড়ির জন্য চাঁদাবাজি করার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। ঢাকার একটি আদালত ২০০৮ সালে ওই মামলায় তাকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেয়।

২০০৮ সালে সম্পদের তথ্য গোপন করা এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে হুদাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে তিনি খালাস পান। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট বেকসুর খালাসে এ রায় বাতিল করে দেয়।

২০০৮ সালে নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদার বিরুদ্ধে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা হয়। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করলেও ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন।

২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নাজমুল হুদা এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬.৭৩ কোটি টাকা পাচারের জন্য দু’টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে।

সবশেষ একই বছর ফেব্রুয়ারিতে দুদক তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার জন্য একটি মামলা দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছিল।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh

ট্যাগ :

ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তপু রায়হানের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় দায়িত্ববোধ, উত্তরাধিকার ও নাগরিক প্রত্যাশার রাজনীতি

যেসব কারণে আলোচিত ছিলেন নাজমুল হুদা

প্রকাশিত : ০৯:৫৫:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত একটি নাম ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি সরকার যে দুইবার ক্ষমতায় ছিল সে দু’বারই মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে দলীয় প্রধানের সমালোচনা, কখনো বিদেশি কূটনীতিকদের কটাক্ষ, নয়তো দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।

বিএনপির অন্যতম নীতি নির্ধারক নেতা হওয়া সত্ত্বেও দলটি থেকে একাধিকবার বহিস্কার আবার নিজেই পদত্যাগ করাসহ একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার রেকর্ড রয়েছে তার।

পলিটিক্যাল রিপোর্টার হিসেবে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে কাছ থেকে দেখেছেন শাজাহান সরদার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন: রাজনীতিতে তিনি একজন স্পষ্টবাদী লোক ছিলেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যা বিশ্বাস করতেন, বলতেন। তার বিশ্বাসের সঙ্গে দলের অস্থান সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেটা নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবতেন না। রাজনীতিতে আসার আগে ও পরে তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সর্বকনিষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। বিএনপির যে কয়জন নেতার সাক্ষরে নিবন্ধন পেয়েছিল তার মধ্যে তিনি অন্যতম।

১৯৯৬ সালে নাজমুল হুদা’র অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফর্মুলা নিয়ে আলোচিত সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন শাজাহান সরদার। তিনি সেসময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন: ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তখন তথ্যমন্ত্রী। একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন। সাক্ষাতে তিনি জানালেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে তার একটি সাক্ষাতকার তিনি দিতে চান! তখন তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগে এই ইস্যুতে আন্দোলন করছিল। সবকিছু বিবেচনায় আমি তখন তাকে সাক্ষাতকারটি টাইপ করে তাতে সাক্ষর করে দিতে বলি।

যোগ করেন: পরে তিনি আমার দাবি অনুযায়ীই তার সাক্ষাতকার টাইপ করে পাতায় পাতায় সাক্ষর দেন। অনেকে আমাকে বলেছিলো এই সাক্ষাতকার ছাপলে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হবে। আমি সেগুলো খুব একটা পাত্তা না দিয়ে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সরকারের চাপে আমার পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’ সেই সাক্ষাতকারটি ছাপায়নি। পরে অন্য একটি পত্রিকায় (ইনকিলাব) ‘যে সাক্ষাতকার ছাপা হয়নি…..’ শিরোনামে সাক্ষাতকারটি ছাপা হয়। ওই বক্তব্য তার বক্তব্য বলে তিনি তা স্বীকার করে নেন।

এ ঘটনায় নাজমুল হুদাকে সরকারের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন: সাক্ষাতকারটি ছাপা হওয়ার পরদিন তিনি পদত্যাগ করেন। সেদিন আমি সচিবালয়ে গিয়েছিলাম। নিজের মধ্যে কিছুটা অপরাধ বোধ হচ্ছিলো। পদত্যাগের পর নাজমুল হুদা সচিবালয় থেকে আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। তিনি স্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। পরে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে তিনি আমাকে মিষ্টিও খাইয়ে ছিলেন। আমি রিপোর্টার হিসেবে যে নাজমুল হুদাকে দেখেছি, সেই নাজমুল হুদা সোজাসুজি কথা বলতেন, প্যাঁচে যেতেন না।

পরবর্তীকালে তার জীবনে অনেক উত্থান পতন ঘটেছে। কিন্তু সেগুলো খুব একটা কাছ থেকে দেখা হয়নি।

যেসব কারণে আলোচিত
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর একদল সেনাসদস্য কর্তৃক নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জানা যায়, ওইদিন জিয়াউর রহমানের পাশের রুমে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী’র সঙ্গে একই রুমে অবস্থান করছিলেন নাজমুল হুদা। তাদের ভূমিকা নিয়ে পরে দলে অনেক বিতর্ক হয়। পরবর্তীকালে আরেক সেনা শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় এলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েও তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি। এ ঘটনায় ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসে তাকে স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে থেকে বাদ দেন। ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করায় ১৯৮৭ সালে তাকে আবার দলের ভাইস-চেয়ারম্যান করা হয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর নাজমুল হুদা তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তথ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি সংসদে এ বক্তৃতায় বলেছিলেন: বিএনপি এখন ক্ষমতায় আছে, কাজেই বিএনপি যা খুশি তাই করতে পারে। এছাড়া, ‘আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে তরুণদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিলাম’- তার এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হন।

১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে (১৯৯৫) আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করছিলো তখন তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন নাজমুল হুদা। ৯৬- এ এসে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের ফর্মুলা দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করেন। নিজ দলের বিপক্ষে এমন অবস্থানের কারণে সেসময় তিনি দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃতও হন। পরে অবশ্য বিএনপি তাকে আবারও দলে ফিরিয়ে নেয়।

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি সেসময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সেসময় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ৭১’এ জামায়াত পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়ে ‘অপরাধ করেনি’ বলে মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেন। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানকে অবমূল্যায়ন ও বিএনপির মূল ভিত্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য মন্ত্রিসভা থেকে নাজমুল হুদাকে অপসারণ ও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন দলেরই অপর সংসদ সদস্য মাহী বি চৌধুরী।

২০০৬ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাসকে ‘স্টুপিড’ ও ‘চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী’ আখ্যা দিয়ে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার লঙ্ঘণের দায়ে অভিযুক্ত হন নাজমুল হুদা।

২০১০ সালের ২২ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চোরপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে একত্রে বসানোর উদ্যোগ নেন নাজমুল হুদা।

নাজমুল হুদার রাজনৈতিক জীবন
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করলে ওই দলে যোগ দেন ব্রিটেন থেকে আইনের বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে আসা নাজমুল হুদা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে সেই দলেও স্থায়ী কমিটিতে স্থান হয় নাজমুল হুদার। এর পর দীর্ঘকাল ছিলেন বিএনপিতেই।

খালেদা জিয়ার সরকারে ১৯৯১ সালে তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০১০ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা নাজমুল হুদার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করলে তখন তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃত হলেও তিনি দলীয় কাজ করতে থাকেন। এক বছর পর ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল সদস্যপদ ফিরে পান তিনি।

এর পরের বছর ২০১২ সালেই আবার বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। নাজমুল হুদা পদত্যাগ করে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। নিজেই গঠন করেন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ)।

পরে সেই দল থেকেও তাকে বহিষ্কৃত হতে হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ প্রতিষ্ঠাতাকে বহিষ্কার করে নিজেই নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনএফের। ২০১৪ সালে সেই দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবুল কালাম আজাদ।

এরপর নাজমুল হুদা বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ) এবং বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি (বিএমপি) নামে দুটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়েন, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের জোটের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন।

কিন্তু সেই চেষ্টা তার সফল হয়নি। এরপর ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর গঠন করেন তৃণমূল বিএনপি নামে নতুন রাজনৈতিক দল। যদিও এ দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তিনি শুরু করতে পারেননি। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন তৃণমূল বিএনপিকে নিবন্ধন দেয়।

দীর্ঘদিন পর আবারও আলোচনায় আসেন নাজমুল হুদা।

নামজুল হুদার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
২০০৭ সালের ২১ মার্চ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নাজমুল হুদাকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, ২০০১-২০০৬ সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ৩০ কোটি টাকার সরকারি কাজ পাইয়ে দিতে মীর জহির হোসেন নামক একজন ব্যবসায়ীর কাছ ঘুষ নিয়েছিলেন।

ওই মামলায় তাকে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আপিলের ভিত্তিতে, হাইকোর্ট ২০১১ সালে তাকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়। ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের খালাস বাতিল করে দেয়। ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর, হাইকোর্ট কারাদণ্ডের মেয়াদ ৪ বছরে কমিয়ে দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে তিনি জামিন পায়।

২০০৭ সালে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ নামে একজন বিএনপির রাজনীতিবিদ এবং ক্যাব এক্সপ্রেস লিমিটেডের মালিক নাজমুল হুদা এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০০৩ সালে দুটি মারুতি গাড়ির জন্য চাঁদাবাজি করার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। ঢাকার একটি আদালত ২০০৮ সালে ওই মামলায় তাকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তাকে খালাস দেয়।

২০০৮ সালে সম্পদের তথ্য গোপন করা এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে হুদাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে তিনি খালাস পান। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট বেকসুর খালাসে এ রায় বাতিল করে দেয়।

২০০৮ সালে নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদার বিরুদ্ধে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা হয়। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট মামলাটি বাতিল করলেও ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন।

২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নাজমুল হুদা এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬.৭৩ কোটি টাকা পাচারের জন্য দু’টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে।

সবশেষ একই বছর ফেব্রুয়ারিতে দুদক তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার জন্য একটি মামলা দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছিল।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh