০৯:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আস্থা হারাচ্ছে সালিশ ব্যবস্থা

একসময়ে সারা দেশে গ্রামীণ পর্যায়ে সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত ৯০ ভাগ মানুষের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা গুলো সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করতো। সমাজের পরিচ্ছন্ন ও মেধাবীরা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশির মাধ্যমে অনেক বড় বড় ঘটনাও সমাধান করে শান্তি ও সোহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। যদিও তাদের শিক্ষা দীক্ষার চেয়েও বিচক্ষণতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল প্রখর। ফলে যেকোনো কঠিন সমস্যাকেও সমাজপতিরা নিমিষেই সুরাহা করতে সক্ষম হতো। তাদের বিচারিক সিদ্ধান্তে উভয়পক্ষ সন্তুষ্ট থাকতো। কিন্তু বিগত দুই যুগ ধরে ভেড়ামারাতে সালিশের নামে বাণিজ্য অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিরা সমাজের নেতৃত্বে থাকা রাজনৈতিক বিবেচনায় সমাজ গতি নির্বাচিত করা সালিশদারদের পক্ষপাতিত্ত মূলক আচরণ সহ নানা কারণে এখন সালিশ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এতে করে একদিকে সামাজিক সোহার্দ্য নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে আদালতে মামলার পরিমাণ বাড়ছে। আগেকার গ্রাম্য সালিশি বিচার সাধারণত সাদা দাড়িওয়ালা বয়স্ক মুরব্বিরা করতেন। যাদের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি আছে। বিচারের আসরে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে থাকতো বিভিন্ন ধরনের হুক্কা, চুরট, বিড়ি মিক্সার, সিগারেট প্রভৃতি। মোড়লরা আয়েশার সঙ্গে হুক্কায় গুড়ুম গুড়ুম টান দিতেন আর বিশাল বিচার কার্য পরিচালনা তথা বাতচিৎ করতেন ভেবেচিন্তে।
সেসব আচার বিচারে এখনকার মত কম বয়সী ছেলেপেলে মুরুব্বীদের দাপটে ও সুযোগ তেমন একটা ছিল না এবং ঘুষের প্রচলন তেমন ছিল না বললেই চলে। তবে বিচার কার্য যথেষ্ট সততা ছিল, তাই মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায় বিচার পেতো। তবে আগেকার মত বংশ এবং টাকার স্তর হয়তোবা এখনো বহাল আছে। আগেকার সালিশি বিচারকার্য যারা পরিচালনা করতেন তাদের কথার মূল্য ও ওজন ছিল। এখানে এক কথা আবার ওখানে আরেক কথা বলতেন না। এক কাপ চা বা পান খেয়ে বিক্রি হয়ে যেতেন না। দাওয়াত দিয়ে আসলেই নির্দিষ্ট সময়েই চলে আসতেন বিচারের আসরে। বারবার গিয়ে তেল মর্দন ও তোষামদ করতে হতো না। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো সালিশ। সালিশ দেখে মানুষের মনের মধ্যে ভয় ঢুকতো। মানুষ অপরাধ করার সাহস পেত না। কিন্তু এখনকার সালিশে মুরুব্বিদের তেমন গুরুত্ব নেই। মাঝ বয়সীরা এখন সালিশে প্রধান্য পেয়ে থাকে। গ্রামীণ জনপদের বেশিরভাগ সালিশদার বিচার আচারের নামে টাকা গ্রহণ করে একতরফা রায় দিয়ে অপর পক্ষকে মিনিমাইজ করে রাখেন। এসব কারণে এখন গ্রাম গঞ্জের সালিশ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এতে করে সামর্থ্যবানরা থানা ও কোর্ট কাচারি পর্যন্ত আসতে পারলেও তুলনামূলক নিরীহ স্বভাবের ব্যক্তিরা পুলিশ মামলা হামলার ভয়ে থানা ও আদালত পর্যন্ত যেতে সাহস পায় না। এতে করে সমাজে এক ধরনের অবিচার ও অসমতা প্রাতিষ্ঠানিক আকার ধারণ করছে। আবার কোথাও কোথাও গ্রামের সালিশ ব্যবস্থাকে শোষণের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, বিচার প্রার্থীদের অর্থনৈতিক বৈষম্যতা ন্যায় পরায়ন গ্রহণযোগ্য মানুষের সংকট দীর্ঘমেয়াদি সালিশ (বার বার বসা) বাদী-বিবাদী কর্তৃক পৃথকভাবে সালিশ কারী নিয়োগ বংশ/এলাকা/ভোটার প্রীতি নেতৃত্ব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রতিনিধি না থাকা মিথ্যা সাক্ষী সালিশে অতিঃ পর জামানত নেওয়া অনভিজ্ঞ/অযোগ্য লোক দ্বারা সালিশ করা, চূড়ান্ত মীমাংসা না করে সমাধান করা এখন নিত্য সমস্যা। এছাড়াও বাহুবল দেখিয়ে মারামারি করা। সালিশ থেকে উঠে চলে যাওয়া হুমকি ধামকি দেওয়া এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে পড়েছে। অথচ এ সালিশ ব্যবস্থাকে যথাযথ ভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলে সামাজিক সহিংসতা নির্মূল ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গ্রামে মানুষের আদালতে যাওয়ার বিকল্প হচ্ছে সালিশ। সর্বোপরি আস্থা অনাস্থার দোটানা না হয়ে গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থাই হতে পারে আদর্শিক ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত। বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবনা চিন্তার সময় আছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/bh

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

আস্থা হারাচ্ছে সালিশ ব্যবস্থা

প্রকাশিত : ০৪:৪৪:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০২৩

একসময়ে সারা দেশে গ্রামীণ পর্যায়ে সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত ৯০ ভাগ মানুষের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা গুলো সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করতো। সমাজের পরিচ্ছন্ন ও মেধাবীরা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সালিশির মাধ্যমে অনেক বড় বড় ঘটনাও সমাধান করে শান্তি ও সোহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। যদিও তাদের শিক্ষা দীক্ষার চেয়েও বিচক্ষণতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল প্রখর। ফলে যেকোনো কঠিন সমস্যাকেও সমাজপতিরা নিমিষেই সুরাহা করতে সক্ষম হতো। তাদের বিচারিক সিদ্ধান্তে উভয়পক্ষ সন্তুষ্ট থাকতো। কিন্তু বিগত দুই যুগ ধরে ভেড়ামারাতে সালিশের নামে বাণিজ্য অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিরা সমাজের নেতৃত্বে থাকা রাজনৈতিক বিবেচনায় সমাজ গতি নির্বাচিত করা সালিশদারদের পক্ষপাতিত্ত মূলক আচরণ সহ নানা কারণে এখন সালিশ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এতে করে একদিকে সামাজিক সোহার্দ্য নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে আদালতে মামলার পরিমাণ বাড়ছে। আগেকার গ্রাম্য সালিশি বিচার সাধারণত সাদা দাড়িওয়ালা বয়স্ক মুরব্বিরা করতেন। যাদের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি আছে। বিচারের আসরে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে থাকতো বিভিন্ন ধরনের হুক্কা, চুরট, বিড়ি মিক্সার, সিগারেট প্রভৃতি। মোড়লরা আয়েশার সঙ্গে হুক্কায় গুড়ুম গুড়ুম টান দিতেন আর বিশাল বিচার কার্য পরিচালনা তথা বাতচিৎ করতেন ভেবেচিন্তে।
সেসব আচার বিচারে এখনকার মত কম বয়সী ছেলেপেলে মুরুব্বীদের দাপটে ও সুযোগ তেমন একটা ছিল না এবং ঘুষের প্রচলন তেমন ছিল না বললেই চলে। তবে বিচার কার্য যথেষ্ট সততা ছিল, তাই মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায় বিচার পেতো। তবে আগেকার মত বংশ এবং টাকার স্তর হয়তোবা এখনো বহাল আছে। আগেকার সালিশি বিচারকার্য যারা পরিচালনা করতেন তাদের কথার মূল্য ও ওজন ছিল। এখানে এক কথা আবার ওখানে আরেক কথা বলতেন না। এক কাপ চা বা পান খেয়ে বিক্রি হয়ে যেতেন না। দাওয়াত দিয়ে আসলেই নির্দিষ্ট সময়েই চলে আসতেন বিচারের আসরে। বারবার গিয়ে তেল মর্দন ও তোষামদ করতে হতো না। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো সালিশ। সালিশ দেখে মানুষের মনের মধ্যে ভয় ঢুকতো। মানুষ অপরাধ করার সাহস পেত না। কিন্তু এখনকার সালিশে মুরুব্বিদের তেমন গুরুত্ব নেই। মাঝ বয়সীরা এখন সালিশে প্রধান্য পেয়ে থাকে। গ্রামীণ জনপদের বেশিরভাগ সালিশদার বিচার আচারের নামে টাকা গ্রহণ করে একতরফা রায় দিয়ে অপর পক্ষকে মিনিমাইজ করে রাখেন। এসব কারণে এখন গ্রাম গঞ্জের সালিশ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এতে করে সামর্থ্যবানরা থানা ও কোর্ট কাচারি পর্যন্ত আসতে পারলেও তুলনামূলক নিরীহ স্বভাবের ব্যক্তিরা পুলিশ মামলা হামলার ভয়ে থানা ও আদালত পর্যন্ত যেতে সাহস পায় না। এতে করে সমাজে এক ধরনের অবিচার ও অসমতা প্রাতিষ্ঠানিক আকার ধারণ করছে। আবার কোথাও কোথাও গ্রামের সালিশ ব্যবস্থাকে শোষণের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, বিচার প্রার্থীদের অর্থনৈতিক বৈষম্যতা ন্যায় পরায়ন গ্রহণযোগ্য মানুষের সংকট দীর্ঘমেয়াদি সালিশ (বার বার বসা) বাদী-বিবাদী কর্তৃক পৃথকভাবে সালিশ কারী নিয়োগ বংশ/এলাকা/ভোটার প্রীতি নেতৃত্ব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রতিনিধি না থাকা মিথ্যা সাক্ষী সালিশে অতিঃ পর জামানত নেওয়া অনভিজ্ঞ/অযোগ্য লোক দ্বারা সালিশ করা, চূড়ান্ত মীমাংসা না করে সমাধান করা এখন নিত্য সমস্যা। এছাড়াও বাহুবল দেখিয়ে মারামারি করা। সালিশ থেকে উঠে চলে যাওয়া হুমকি ধামকি দেওয়া এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে পড়েছে। অথচ এ সালিশ ব্যবস্থাকে যথাযথ ভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলে সামাজিক সহিংসতা নির্মূল ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গ্রামে মানুষের আদালতে যাওয়ার বিকল্প হচ্ছে সালিশ। সর্বোপরি আস্থা অনাস্থার দোটানা না হয়ে গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থাই হতে পারে আদর্শিক ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত। বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবনা চিন্তার সময় আছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/bh