স্কুল শিক্ষার্থীরা যখন মাদক, প্রযুক্তির অতি ব্যবহার ও কিশোর গ্যাংয়ের মত নানা অপরাধ ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে আগামীর স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে, ঠিক তখনই একদল স্কুল শিক্ষার্থী টিফিনের টাকা জমিয়ে উদ্যোগ নিয়েছে তিন চাকার ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার পরিচালনার। উদ্দেশ্যে তরুণ সমাজকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে আলোর পথে ধাবিত করা। এতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও। এমন ঘটনা পাবনা বেড়া উপজেলায়।
জানা যায়, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে পাবনার বেড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বেড়া বিপিন বিহারী উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ৭/৮ শিক্ষার্থী টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে একদল শিক্ষার্থী নিয়ে গড়ে তোলে ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন। সেই সংগঠনই এ ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। এতে বাকি অর্থ সহায়তার যোগান দেন বর্তমান বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সবুর আলী। এমন উদ্যোগ প্রশংসা কুড়াচ্ছে সকল মহলে। শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে পাঠাগারের বই পড়ছে। প্রত্যাশার প্রহর গুণছে আলোর মুখ দেখার।
উদ্যোক্তারা জানান, চলতি বছরের আগস্ট মাসের ১৭ তারিখ দুপুরের দিকে প্রায় ৭০০ বই নিয়ে এই পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু হয়। তিন চাকার ভ্যানের এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারটিতে গল্প, উপন্যাস, ছোট গল্প, ইসলামিক, শিশুতোষ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক, বঙ্গবন্ধু আত্মজীবণীসহ বিভিন্ন বই রয়েছে। ৭ দিন করে উপজেলার এক একটি স্কুলের সব শিক্ষার্থীদের জন্য উম্মুক্ত থাকবে। যে বিদ্যালয়ে থাকবে সেখানকার শিক্ষার্থীরাই এর দায়িত্বে থাকবে। মূলত স্কুলের টিফিনের সময় এটি উন্মুক্ত থাকে এবং শিক্ষার্থীরা এসে পছন্দমতো বই পড়তে পারেন। পাঠাগার থেকে পছন্দমত বই ক্লাসে নিয়েও পড়া যায়। তবে টিফিন শেষ হওয়ার ঠিক ৫ থেকে ১০ মিনিট আগে বইগুলো জমা দিতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের মত শিক্ষর্থীরা ভ্রাম্যমাণ এই পাঠাগার থেকে বই পড়েন।

সরেজমিনে উপজেলার বেড়া স্কুল এন্ড কলেজে দেখা যায়, টিফিনের সময় শিক্ষার্থীরা এসে তাদের পছন্দমত বই নিয়ে পাঠাগারের চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে পড়ছে। আবার কেউ ভবনের বারান্দায় বসেই বই পড়ছে। অনেককে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে বই পড়তে দেখা গেছে।
বেড়া স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আহাদ সরকার বলেন, বর্তমানে আমি পাঠাগার দেখভালের দায়িত্বে আছি। টিফিনের সময় হলে আমি পাঠাগারটি খুলে দেই। তারপর সবাই সবার পছন্দের বই সংগ্রহ করে পড়া শুরু করে। এতে দেখা যাচ্ছে সবাই গল্প করে সময় নষ্ট না করে বই পড়ছে। এটি দেখভালের দায়িত্ব পালন দারুণভাবে উপভোগ করছি।
বেড়া বিপিন বিহারি উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবু সালেক বলেন, পড়ার ফাঁকে অবসর সময় মোবাইল ব্যবহার করে বা বাইরে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতাম। অপ্রয়োজনীয় আড্ডায় আমরা অন্যপথে যাচ্ছিলাম। এখন পাঠাগার থেকে বই বাড়িতে নিয়ে অনেক কিছু শিখছি। বাইরে অযথা সময় নষ্ট না করে বই পড়ি। কয়েকদিন হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি পড়ছি। আরও অনেক সাহিত্যের বইও পড়া শুরু করেছি।
শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মেহেরাব হোসেন (জিম) বলেন, টিফিনের টাকা জমিয়ে ভালো কিছু করার লক্ষ্যে আমরা ২০১৬ সালের দিকে পথচলা শুরু করেছিলাম। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ও ভালো মানুষ তৈরিতে পাঠাগারের বিকল্প নেই। টিফিনের সময় প্রতিটা শিক্ষার্থীর সময় কাটুক বইয়ের সাথে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের খারাপ কাজ, মাদকের নেশা, মোবাইল গেমিং থেকে দূরে রাখতে আমাদের এই আয়োজন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাঃ সবুর আলী জানান, ইতিমধ্যে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগ্রহ উদ্দীপনা বেড়ে যাওয়াতে সামনের মাসে আরও একটি ভ্রাম্যমান পাঠাগার তৈরি করা হবে। এভাবেই বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া তরুণ-তরুণীদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
পাবনা জেলা গণগ্রন্থাগারের সহকারী লাইব্রেরিয়ান মো: এনামুল হক জানান, এটি দারুণ একটি উদ্যোগ। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব। সরকারি সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবধরণের সহায়তা দেবার চেষ্টা করব।




















