স্থানীয় বিএনপির অন্তঃকোন্দলের সুযোগে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৪ (আটঘরিয়া-ঈশ্বরদী) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা।
এক সময় প্রয়াত ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর হাত ধরে এই আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল দলটি।
তবে, ২০১৪ এর সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শামসুর রহমান শরীফ ডিলু ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবারের সদস্যদের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে ভাটা পড়ে তার জনপ্রিয়তায়। ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন, স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন বানিজ্য, কমিটি বানিজ্য, জমি দখল, বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি ভাঙচুর ও মারপিট, রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে টেন্ডারবাজিসহ প্রকাশ্য নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন ডিলুপত্নী কামরুন্নাহার শরীফ, ছেলে শিরহান শরীফ তমাল। এসব ঘটনা দেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রচার হলে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে আওয়ামীলীগ। ঐ সব ঘটনায় মামলা চলমান। অপকর্মের নানা তথ্য এখনও রয়েছে উইকিপিডিয়ায়।
২০১৮ সালেও দলীয় মনোনয়ন পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্বাচনী সভায় শামসুর রহমান শরীফের ছোট ছেলে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শিরহান শরীফের নেতৃত্বে হামলা হয়। এতে সন্ত্রাসীরা হাবিবকে ছুরিকাঘাত করলে সরকার বিতর্কের মুখে পড়ে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে শামসুর রহমান শরীফের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে আসনটিতে শামসুর রহমান শরীফের ২ ছেলে, মেয়ে, জামাই, ভাগ্নেসহ পরিবারের ৫ জন প্রার্থী হলে বিভক্ত হয়ে পড়েন শামসুর রহমান শরীফের অনুসারী আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরাও।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ডিলুর মৃত্যুর পর ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নুরুজ্জামান বিশ্বাস। এর পর থেকে নুরুজ্জামান ও প্রয়াত ভূমিমন্ত্রীর পরিবার ঘিরে বিভক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ। মন্ত্রী পরিবারেও আবার দুই ছেলে, মেয়ে ও জামাইয়ের অনুসারীরা আলাদা ভাবে কর্মসূচি ও ভোটের প্রচারণা চালান।
আসনটিতে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বিএনপিতে যোগ দেন। পরে সিরাজুল ইসলাম সরদারের সঙ্গে তাঁর বিরোধ দেখা দেয়। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে সিরাজুল ইসলাম মনোনয়ন পেলে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হন হাবিবুর। সেবার হাবিব-সিরাজের দ্বন্দ্বে নির্বাচনী মাঠে গোল দেন শামসুর রহমান শরীফ ডিলু।
তবে যাঁর হাত ধরে আসনটিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ, সেই প্রয়াত নেতার পরিবার থেকে এবার অন্তত পাঁচজন মনোনয়ন ফরম তুলবেন। তাঁরা হলেন ডিলুর দুই ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গালিবুর রহমান শরীফ; সদস্য সাকিবুর রহমান শরীফ; মেয়ে মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মাহজেবিন শিরিন পিয়া এবং জামাতা সাবেক পৌর মেয়র ও ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মিন্টু, খালাতো ভাই জেলা আওয়ামীলীগ নেতা বশির আহমেদ বকুল।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ডিলুর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনেও এই পাঁচজন মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তখন থেকেই তাদের পারিবারিক বিরোধ চরমে। নেতা-কর্মীরা আলাদা হয়ে অনুসারী হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আওয়ামীলীগের এক নেতা বলেন, পরিবারের সদস্যদের অপকর্ম আর সীমাহীন লোভের কারণে শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর সারা জীবনের রাজনৈতিক ত্যাগ ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে। তার সন্তানদের কারণে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তারা বাবার ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রচুর অবৈধ অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছে। এখন নির্বাচন সামনে রেখে টাকা ছড়িয়ে আবারো হারানো রাজত্ব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো তাদের অত্যাচারের কথা মনে করে আঁতকে ওঠে।
তবে, সবাই প্রার্থী হলেও তাদের পারিবারিক বিরোধ নেই বলে দাবি করেছেন শামসুর রহমান শরীফের কন্যা মাহজেবিন শিরিন পিয়া। তিনি বলেন, ‘এক পরিবার থেকে আমরা ভাইবোন মনোনয়ন চাইলে সমস্যা কী। এসব ধোয়া তুলে কোনো লাভ নাই। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। নৌকার জন্য কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী যাঁকে মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষে আমরা কাজ করব।’
ছেলে সাকিবুর রহমান শরীফ বলেন, ‘বাগানে শত ফুল ফুটবে। এর মধ্যে সেরাটা বেছে নেবেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা শুধু নৌকাকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এখানে আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রুপিং বা বিভেদ নেই, শুধু প্রতিযোগিতা আছে।’
জামাই আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন, আমি কোন পরিবারের পরিচয়ে রাজনীতি করিনা। ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে আওয়ামীলীগে এসেছি। ঈশ^রদী পৌরসভায় মেয়র হয়েছি, ডিলু সাহেবের মৃত্যুর পরে দলীয় কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছি। নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ে আমি প্রার্থী হবার যোগ্যতা রয়েছে বলে আমি মনে করি।
এদিকে, আবারো মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি বর্তমান এমপি নুরুজ্জামান বিশ্বাসও। তবে, উপনির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি নিজের গ্রহণ যোগ্যতা ধরে রাখতে পারেননি। মনোনয়ন পেয়েই তিনি জামায়াত মনোভাবাপন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আর আর পি গ্রুপের কাছ থেকে গাড়ি, আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তার ছেলে দোলন বিশ^াস টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সরকারী জমি জালিয়াতি ও রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের রডচুরি কান্ডে বিতর্কিত হয়েছেন। এমপি নিজেও অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন। নিজ বলয় তৈরী করে গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যের সুতোয় গাঁথতে না পারলে নির্বাচনে সংকট সৃ্িষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে বর্তমান এমপি নুরুজ্জামান বিশ্বাস বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটা বড় দল। অনেকে মনোনয়ন চাইবে। এ নিয়ে মতানৈক্য, মতবিরোধ থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রুপিং নেই।’
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশায় প্রচারণার মাঠে রয়েছেন জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি রেজাউল রহিম লাল, এডভোকেট রবিউল আলম বুদু, সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম লিটন, শ্রমিক নেতা মুক্তিযোদ্ধা রশিদুল্লাহ, আটঘরিয়া পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম রতনসহ এক ডজন প্রার্থী।




















