০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

চালের দাম বাড়লেও লাভবান হয়নি কৃষক

চলতি অর্থবছরে চাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা উঠে নেয়ার পর থেকেই বাজারে চালের দাম মান ভেদে তিন টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দাম বাড়লেও কৃষকরা আশানুরূপ লাভবান হচ্ছে না।

বগুড়ার খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ‘ভারত থেকে চাল আমদানি না হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় চালের ওপর চাপ পড়েছে। তাই সুযোগ বুঝে মিল মালিক ও আড়তদাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তবে কৃষকরা এক টাকাও পাচ্ছে না।’ এদিকে আমদানিমুখী চালের এজেন্সিগুলো অভিযোগ করছে, ‘রেয়াতি সুবিধা উঠিয়ে নেয়ার কারণে ভারতে কেনা চাল দেশে আনতে ২৮ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ছে।’

বৃহস্পতি ও শুক্রবার বগুড়া শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী, গোদারপড়া এবং কলনি বাজার সরজমিনে দেখা যায়, বাজেটে পাশের আগের দামের চেয়ে ইন্ডিয়ান কাঁটারি কেজিতে আট থেকে ১০টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি কাঁটারির দাম বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ টাকা। আবার মিনিকেট ও আটাশের দামে বেড়েছে দুই/পাঁচ টাকা। এছাড়া, পোলার চালেরও মানভেদে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। তবে বাজেটের পর চালের দাম বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম। এখনো ধান বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।

বগুড়ার সাবগ্রাম, মহাস্থান, ফুলবাড়ি ও পিরগাছা হাট ঘুরে দেখা যায়, মিনিকেট জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা মন। আর আটাশ ও উনত্রিশ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা মন। কৃষকরা বলছে, ‘বাজেটে কি আর কৃষকের কথা চিন্তা করা হয়! কই চালের দাম বাড়লেও তো ধানের দাম বাড়েনি?’ ফুলবাড়ি হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক শরিফুল সরদার বলেন, ‘ধান করা পুরোটাই লোকসানের। কারণ, প্রতিমন ধানে খরচ হয় প্রায় ১১ শ থেকে ১২ শ টাকা। সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৯শ থেকে সাড়ে ৯শ টাকায়। শুধু খড়ের জন্য ও নিজেদের খাওয়ার জন্য ধান করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে ঢাকায় পড়াশোনা করে, তাকে খরচ দিতে আজ ১০ মোন ধান নিয়ে হাটে এসেছি, কী করবো চলতে তো হবে?’

এদিকে গোদারপাড়া বাজারের চাল ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া জানান, ‘দামতো বাড়ায় বড় ব্যবসায়ীরা, আমরাতো চুনোপুঁটি!’ তিনি বলেন, ‘সরকার ভালোভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করলে আর রাস্তা ঘাটে পরিবহণ চাঁদাবাজি বন্ধ করলে কৃষকও লাভবান হবে।’

একটি বাস্তব চিত্রতুলে ধরে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘সারিয়াকান্দি উপজেলার ফুলবাড়ি হাট থেকে শহরের গোদারপাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার এই রাস্তায় ২০ বস্তা চাল আনতে পৌর টোলসহ নানা অজুহাতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা টোল দিতে হয়।’ বাবলু মিয়া বলেন, ‘এ রকম নানা চাঁদাবাজির কারণে চালসহ সব নিত্য প্রায়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘বাজারে দাম বাড়লে ক্রেতাদের মাধ্যে এর প্রভাব পড়ে। বেচা বিক্রি কমে যায়।

ভারতীয় কাঁটারির প্রতি আগ্রহ থাকলেও মানুষ কম কিনছে।’ রাজাবারের বিক্রেতা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ভাতের চালই মানুষ কিনতে চাচ্ছে না সেখানে পোলার চাল কিনবে কেমনে?’ তিনি বলেন, ‘বাজেটের পর থেকেই বাজরে মন্দা দেখা দিয়েছে।’

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ী চাল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। ঘোষণার পর সেটা আরো একগুণ বাড়ায়। ফলে তারা বাইরে থেকে চাল কিনে ভ্যাট দিয়েও লাভ করেছে।

দেশে পর্যাপ্ত চালের মজুদ আছে মন্তব্য করে হিলি চাল আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘বাজেটের আগে হিলিতে প্রতি কেজি স্বর্ণা চালের দাম ঝিল ৩৫ টাকা, যা এখন এখানেই ৪১ টাকা, একই ভাবে রতœা চালও ৪১ টাকা।’ তিনি ব্যবসায়ীদের সফাই গাইয়ে বলেন, ‘২৮ শতাংশ কর আরোপের পর চালের দাম বাড়াতো কেজিতে ১০ থেকে ১২টাকা সেখানে দাম বেড়েছে মাত্র পাঁচ টাকা। এটা শুধু দেশে চালের মজুদ আছে বলে।’ খাদ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে গত ৫ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ১০ লাখ ২ হাজার টন চাল মজুদ ছিল।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

শহীদ জহির রায়হান স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

চালের দাম বাড়লেও লাভবান হয়নি কৃষক

প্রকাশিত : ০৯:২২:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ জুলাই ২০১৮

চলতি অর্থবছরে চাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা উঠে নেয়ার পর থেকেই বাজারে চালের দাম মান ভেদে তিন টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দাম বাড়লেও কৃষকরা আশানুরূপ লাভবান হচ্ছে না।

বগুড়ার খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ‘ভারত থেকে চাল আমদানি না হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় চালের ওপর চাপ পড়েছে। তাই সুযোগ বুঝে মিল মালিক ও আড়তদাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তবে কৃষকরা এক টাকাও পাচ্ছে না।’ এদিকে আমদানিমুখী চালের এজেন্সিগুলো অভিযোগ করছে, ‘রেয়াতি সুবিধা উঠিয়ে নেয়ার কারণে ভারতে কেনা চাল দেশে আনতে ২৮ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ছে।’

বৃহস্পতি ও শুক্রবার বগুড়া শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী, গোদারপড়া এবং কলনি বাজার সরজমিনে দেখা যায়, বাজেটে পাশের আগের দামের চেয়ে ইন্ডিয়ান কাঁটারি কেজিতে আট থেকে ১০টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি কাঁটারির দাম বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ টাকা। আবার মিনিকেট ও আটাশের দামে বেড়েছে দুই/পাঁচ টাকা। এছাড়া, পোলার চালেরও মানভেদে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। তবে বাজেটের পর চালের দাম বাড়লেও বাড়েনি ধানের দাম। এখনো ধান বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।

বগুড়ার সাবগ্রাম, মহাস্থান, ফুলবাড়ি ও পিরগাছা হাট ঘুরে দেখা যায়, মিনিকেট জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা মন। আর আটাশ ও উনত্রিশ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা মন। কৃষকরা বলছে, ‘বাজেটে কি আর কৃষকের কথা চিন্তা করা হয়! কই চালের দাম বাড়লেও তো ধানের দাম বাড়েনি?’ ফুলবাড়ি হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক শরিফুল সরদার বলেন, ‘ধান করা পুরোটাই লোকসানের। কারণ, প্রতিমন ধানে খরচ হয় প্রায় ১১ শ থেকে ১২ শ টাকা। সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৯শ থেকে সাড়ে ৯শ টাকায়। শুধু খড়ের জন্য ও নিজেদের খাওয়ার জন্য ধান করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে ঢাকায় পড়াশোনা করে, তাকে খরচ দিতে আজ ১০ মোন ধান নিয়ে হাটে এসেছি, কী করবো চলতে তো হবে?’

এদিকে গোদারপাড়া বাজারের চাল ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া জানান, ‘দামতো বাড়ায় বড় ব্যবসায়ীরা, আমরাতো চুনোপুঁটি!’ তিনি বলেন, ‘সরকার ভালোভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করলে আর রাস্তা ঘাটে পরিবহণ চাঁদাবাজি বন্ধ করলে কৃষকও লাভবান হবে।’

একটি বাস্তব চিত্রতুলে ধরে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘সারিয়াকান্দি উপজেলার ফুলবাড়ি হাট থেকে শহরের গোদারপাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার এই রাস্তায় ২০ বস্তা চাল আনতে পৌর টোলসহ নানা অজুহাতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা টোল দিতে হয়।’ বাবলু মিয়া বলেন, ‘এ রকম নানা চাঁদাবাজির কারণে চালসহ সব নিত্য প্রায়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘বাজারে দাম বাড়লে ক্রেতাদের মাধ্যে এর প্রভাব পড়ে। বেচা বিক্রি কমে যায়।

ভারতীয় কাঁটারির প্রতি আগ্রহ থাকলেও মানুষ কম কিনছে।’ রাজাবারের বিক্রেতা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ভাতের চালই মানুষ কিনতে চাচ্ছে না সেখানে পোলার চাল কিনবে কেমনে?’ তিনি বলেন, ‘বাজেটের পর থেকেই বাজরে মন্দা দেখা দিয়েছে।’

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ী চাল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। ঘোষণার পর সেটা আরো একগুণ বাড়ায়। ফলে তারা বাইরে থেকে চাল কিনে ভ্যাট দিয়েও লাভ করেছে।

দেশে পর্যাপ্ত চালের মজুদ আছে মন্তব্য করে হিলি চাল আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘বাজেটের আগে হিলিতে প্রতি কেজি স্বর্ণা চালের দাম ঝিল ৩৫ টাকা, যা এখন এখানেই ৪১ টাকা, একই ভাবে রতœা চালও ৪১ টাকা।’ তিনি ব্যবসায়ীদের সফাই গাইয়ে বলেন, ‘২৮ শতাংশ কর আরোপের পর চালের দাম বাড়াতো কেজিতে ১০ থেকে ১২টাকা সেখানে দাম বেড়েছে মাত্র পাঁচ টাকা। এটা শুধু দেশে চালের মজুদ আছে বলে।’ খাদ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে গত ৫ জুন পর্যন্ত সরকারি গুদামে ১০ লাখ ২ হাজার টন চাল মজুদ ছিল।