০২:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঈদের আমেজে টুং-টাং শব্দে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাটের কামার শিল্পীরা!

লালমনিরহাট জেলার গ্রামীণ প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প নানা সংকটে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরী বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রী বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টীল সামগ্রী আমদানি সহ চরম আর্থিক সংকট ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম থাকায় জেলার কামার শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।

তবে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এখন তাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে।

খোজ নিয়ে জানা যায়, আর মাত্র কয়েকদিন পরেই পবিত্র কোরবানীর ঈদ আর এই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাট জেলার কামার শিল্পীরা।
ঈদকে সামনে রেখে এখন দম ফেলারও সময় নেই কামার পাড়ার শিল্পীদের। দিনরাত সমান তালে লোহার টুং টাং শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে জেলা শহরের প্রতিটি উপজেলার কামার শিল্পগণ।

বিভিন্ন গ্রামে কামার পাড়া ঘুরে দেখা যায়, এখনও প্রায় ৫ শতাধিক কামার পরিবার খেয়ে না খেয়ে বাবা দাদাদের পৈতিক পেশা ধরে রেখেছে। সারা বছর অলস সময় পার করলেও কোরবানীর ঈদ আসলেই অধিক শ্রম দিয়ে বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখে কামার পরিবার গুলো। কিন্তু কয়লা ও লোহার দাম বেশি হওয়ায় সেই স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ছুরি, বটিসহ লোহার সরঞ্জামাদি তৈরিতে ব্যায় বেশি হলেও উপযুক্ত মূল্যে ক্রেতারা তা ক্রয় করবে কিনা তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।

ঈদকে সামনে রেখে কামার শিল্পীরা দা, বটি, চাকু, দাসা, চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি তৈরি করতে এখন ব্যস্ত।  স্থানীয় বাজার থেকে লোহা কিনে সেগুলো আগুনে পুড়ে দা, বঁটি, চাপাতি, চাকুসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারজাত করছেন। তৈরিকৃত সরজ্ঞামগুলো বর্তমানে বাজার মূল্য ছুরি ১ শত ৫০ থেকে ৪ শত টাকা, দা আকৃতির সরঞ্জাম ৩ শত থেকে ৬ শত টাকা, হাড় কোপানোর চাপাতি ৫ শত থেকে ১ হাজার ২শত টাকা। তবে লোহার আকৃতির কারণে এর দাম কম বেশি হয়ে থাকে।

এছাড়া পুরোনো দা, বটি, ছুড়ি শান দিতে বা লবণ পানি দিতে ৫০ টাকা থেকে ১ শত ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়ে থাকে। নতুন আধুনিক অনেক সরঞ্জাম আসাতে এই পণ্যর ক্রেতা আগের থেকে অনেক কমে গেছে। এসব ব্যবহার্য জিনিস স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি  নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

কামার শিল্পীরা জানান, বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও চাহিদানুযায়ী সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  পশুর হাট গুলোয় ঈদের আমেজ থাকলেও এখনও কামারদের দোকানে মানুষের পদচারণা নেই বললেই চলে। তবে শেষ মুহুর্তে কোরবানীর মাংস কাটার সরঞ্জাম  কিনতে কামারদের কাছে ভিড় জমাবে মানুষ এমন আশায় বুক বেধে আছে কামার পরিবার গুলো।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বিডিআর হাট খোলার কামার শিল্পি জেলহাস হোসেন বলেন, এক সময় কামারদের যে কদর ছিল বর্তমানে তা আর নেই। মেশিনের সাহায্যে বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে ফলে আমাদের তৈরি যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষ আকর্ষণ হারাচ্ছে। হয়তোবা এক সময় এই পেশা আর থাকবে না। তবে কুরবানির ঈদের সময় আমরা একটু আশাবাদী হই।

কামার শিল্পী রাজ্জাক আলী বলেন, বংশ পরসপর আমরা এই কাজ করে আসছি। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এ কাজ করতেন। আগে দেখতাম সারা বছর আমার বাব দাদারা এই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো কিন্তু এখন সারা বছর তেমন কোনো কাজ না থাকলেও কোরবানির ঈদ আসলে আমাদের কাজের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়।

কামার শিল্পিরা আরও জানান, আমাদের বাপ-দাদার মূল পেশা ছিল এটা। তারা গত হওয়ার পর ওই সূত্রে ধরে আমরাও জীবনের শেষ মূহুর্তে এই পেশা ধরে রেখেছি। আগামীদিনে হয়ত আমাদের ছেলেরা এই পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। কেননা এই পেশা ছেড়ে অন্য কোন ভাল পেশায় যাব এই রকম আর্থিক সংগতি আমাদের নেই। তবে সরকারি ভাবে এবং এনজিওর মাধ্যমে কামাদেরকে সুদ মুক্ত ঋন দিলে পাইকারি মূল্যে উপকরণ কিনতে পারলে অবশ্যই এই দেশীয় কামার শিল্প পূর্বের ন্যায় ঘুড়ে দাড়াবে।

ডিএস./

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

ঈদের আমেজে টুং-টাং শব্দে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাটের কামার শিল্পীরা!

প্রকাশিত : ০৫:১৫:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ মে ২০২৫

লালমনিরহাট জেলার গ্রামীণ প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প নানা সংকটে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরী বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রী বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টীল সামগ্রী আমদানি সহ চরম আর্থিক সংকট ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম থাকায় জেলার কামার শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।

তবে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এখন তাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে।

খোজ নিয়ে জানা যায়, আর মাত্র কয়েকদিন পরেই পবিত্র কোরবানীর ঈদ আর এই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাট জেলার কামার শিল্পীরা।
ঈদকে সামনে রেখে এখন দম ফেলারও সময় নেই কামার পাড়ার শিল্পীদের। দিনরাত সমান তালে লোহার টুং টাং শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে জেলা শহরের প্রতিটি উপজেলার কামার শিল্পগণ।

বিভিন্ন গ্রামে কামার পাড়া ঘুরে দেখা যায়, এখনও প্রায় ৫ শতাধিক কামার পরিবার খেয়ে না খেয়ে বাবা দাদাদের পৈতিক পেশা ধরে রেখেছে। সারা বছর অলস সময় পার করলেও কোরবানীর ঈদ আসলেই অধিক শ্রম দিয়ে বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখে কামার পরিবার গুলো। কিন্তু কয়লা ও লোহার দাম বেশি হওয়ায় সেই স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ছুরি, বটিসহ লোহার সরঞ্জামাদি তৈরিতে ব্যায় বেশি হলেও উপযুক্ত মূল্যে ক্রেতারা তা ক্রয় করবে কিনা তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।

ঈদকে সামনে রেখে কামার শিল্পীরা দা, বটি, চাকু, দাসা, চাপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি তৈরি করতে এখন ব্যস্ত।  স্থানীয় বাজার থেকে লোহা কিনে সেগুলো আগুনে পুড়ে দা, বঁটি, চাপাতি, চাকুসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারজাত করছেন। তৈরিকৃত সরজ্ঞামগুলো বর্তমানে বাজার মূল্য ছুরি ১ শত ৫০ থেকে ৪ শত টাকা, দা আকৃতির সরঞ্জাম ৩ শত থেকে ৬ শত টাকা, হাড় কোপানোর চাপাতি ৫ শত থেকে ১ হাজার ২শত টাকা। তবে লোহার আকৃতির কারণে এর দাম কম বেশি হয়ে থাকে।

এছাড়া পুরোনো দা, বটি, ছুড়ি শান দিতে বা লবণ পানি দিতে ৫০ টাকা থেকে ১ শত ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়ে থাকে। নতুন আধুনিক অনেক সরঞ্জাম আসাতে এই পণ্যর ক্রেতা আগের থেকে অনেক কমে গেছে। এসব ব্যবহার্য জিনিস স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারি  নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

কামার শিল্পীরা জানান, বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও চাহিদানুযায়ী সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  পশুর হাট গুলোয় ঈদের আমেজ থাকলেও এখনও কামারদের দোকানে মানুষের পদচারণা নেই বললেই চলে। তবে শেষ মুহুর্তে কোরবানীর মাংস কাটার সরঞ্জাম  কিনতে কামারদের কাছে ভিড় জমাবে মানুষ এমন আশায় বুক বেধে আছে কামার পরিবার গুলো।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বিডিআর হাট খোলার কামার শিল্পি জেলহাস হোসেন বলেন, এক সময় কামারদের যে কদর ছিল বর্তমানে তা আর নেই। মেশিনের সাহায্যে বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে ফলে আমাদের তৈরি যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষ আকর্ষণ হারাচ্ছে। হয়তোবা এক সময় এই পেশা আর থাকবে না। তবে কুরবানির ঈদের সময় আমরা একটু আশাবাদী হই।

কামার শিল্পী রাজ্জাক আলী বলেন, বংশ পরসপর আমরা এই কাজ করে আসছি। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এ কাজ করতেন। আগে দেখতাম সারা বছর আমার বাব দাদারা এই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো কিন্তু এখন সারা বছর তেমন কোনো কাজ না থাকলেও কোরবানির ঈদ আসলে আমাদের কাজের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়।

কামার শিল্পিরা আরও জানান, আমাদের বাপ-দাদার মূল পেশা ছিল এটা। তারা গত হওয়ার পর ওই সূত্রে ধরে আমরাও জীবনের শেষ মূহুর্তে এই পেশা ধরে রেখেছি। আগামীদিনে হয়ত আমাদের ছেলেরা এই পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। কেননা এই পেশা ছেড়ে অন্য কোন ভাল পেশায় যাব এই রকম আর্থিক সংগতি আমাদের নেই। তবে সরকারি ভাবে এবং এনজিওর মাধ্যমে কামাদেরকে সুদ মুক্ত ঋন দিলে পাইকারি মূল্যে উপকরণ কিনতে পারলে অবশ্যই এই দেশীয় কামার শিল্প পূর্বের ন্যায় ঘুড়ে দাড়াবে।

ডিএস./