০৬:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের দুই উপজেলায় ঝর্ণার সৌন্দর্যের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ

চট্টগ্রামের দুই উপজেলা সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড়ী এলাকায় ঝর্ণাগুলো যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝর্ণায় পানি বেশী থাকায় পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে যান পর্যটকরা। ঝর্ণায় পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত না করা, পর্যটকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ না করা, পাহাড়ী পথ সম্পর্কে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা না থাকা, পর্যটকরা নির্দেশনা না মানা, সাঁতার না জানা ও প্রশিক্ষিত গাইডের অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।

জানা যায়, দুই উপজেলার ঝর্ণাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝরঝরি ঝর্ণা, মধুখায়া ঝর্ণা, সহস্রধারা-১ ঝর্ণা, সহস্রধারা-২ ঝর্ণা, সুপ্তধারা ঝর্ণা, অগ্নিকাণ্ড ও বিলাসী ঝর্ণা, খৈইয়াছড়া ঝর্ণা, রূপসী ঝর্ণা, বাওয়াছড়া ঝর্ণা, মেলখুম গিরিপথ, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, সোনাইছড়ি ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্ণা, মহামায়া বুনো ঝর্ণা দেখতে আসেন দূরদূরান্তের পর্যটকরা। পাহাড়ের শরীর লেপ্টে টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে গিয়ে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা। অসতর্কতা ও সাঁতার না জানার কারণে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। এর অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রকৃতিপ্রেমিরা জীবনের ঝুঁকি নেন। নানা প্রতিকূলতা ও অব্যবস্থাপনায় গত আট বছরে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন ঝর্ণায় ২৫ জন আর সীতাকুণ্ডে গত দুই বছরে ৮ জন পর্যটক প্রাণ হারান, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এছাড়া গাইড ছাড়া বিভিন্ন ঝর্ণায় যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে যাওয়া শতাধিক পর্যটককে উদ্ধার করেছে সীতাকুণ্ড, জোরারগঞ্জ ও মিরসরাই থানা পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিস টিম। তবুও টনক নড়েনি ইজারাদার ও বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের। ইজারাদারের দাবী, ঝর্ণায় আসা পর্যটকদের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলেও তারা মানছেন না, ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত ১৫টি প্রাকৃতিক ঝর্ণার মধ্যে ৭টি ঝর্ণা ইজারা দেয় চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলো দেখাশোনা করা হয়। প্রত্যেক বছর ইজারামূল্য বাড়লেও পর্যটকদের জন্য এখনো নিরাপদ হয়ে উঠেনি ঝর্ণাগুলো। প্রত্যেক বছর এসব ঝর্ণা দেখতে এসে নিহত হচ্ছেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া গত চার বছরে ঝর্ণাগুলোর ইজারামূল্য বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। ২০২২ সালে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলোর ইজারা দেয় বন বিভাগ। ওই বছর ১২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে ২৯ লাখ টাকায় ইজারা নেন এএইচ এন্টারপ্রাইজ। ২০২৪ সালে ৩০ লাখ টাকায় ইজারা নেন সোমোশন এন্টারপ্রাইজ। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলো এক বছরের জন্য ভ্যাটসহ প্রায় ৪৮ লাখ টাকায় ইজারা নেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ.আর এন্টারপ্রাইজ।

স্থানীয়দের দাবী, ঝর্ণা দেখতে আসা সিংহভাগ পর্যটক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া। এদের মধ্যে অনেকে সাঁতার জানেন না। তাই ঝর্ণার নিচে থাকা কূপে পড়ে গেলে উঠতে না পারায় প্রাণ হারাচ্ছেন।

এই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের পাহাড়ে অবস্থিত বিলাসী ঝর্ণায় গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্রলি নাথ পাড়া এলাকার আবুল কাশেমের পুত্র ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র একেএম নাইমুল হাসান (২০) নামের এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। গত ২৮ আগস্ট বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগারহাটের পূর্ব পাশের পাহাড়ে অবস্থিত সহস্রধারা-২ ঝর্ণার হৃদে ডুবে নড়াইল জেলার লোহাগাড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামের আবুল হাসেমের পুত্র সোহানুর রহমান (২৬) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়।

২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর উপজেলার রূপসী ঝর্ণায় ছবি তুলতে গিয়ে কূপের পানিতে ডুবে মুশফিকুর রহমান আদনান (২১) ও মাহবুব রহমান মুত্তাকিম (২১) নামে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। মুশফিকুর রহমান আদনান ঢাকা ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও মাহবুব রহমান মুত্তাকিম নারায়ণগঞ্জ কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। গত ১৭ এপ্রিল বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগাহাট সুপ্তধারা ঝর্ণায় গোসল করতে নেমে রাউজান উপজেলার গহিরা এলাকার মৃত এরশাদ হোসেনের পুত্র ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুনতাসির চৌধুরী (১৮) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় ছয় জন ঘুরতে এসে পাথর পড়ে মাহবুব হাসান (৩০) নামে ওয়ান ব্যাংক কর্মকর্তা মারা যান ও গাজী আহমেদ বিন শামস (৩৫) নামে আরেকজন গুরুতর আহত হন। তারা সহকর্মী ছিলেন। এছাড়া গত ৩ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে সিফাতুর রহমান মজুমদার (২০) নামে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। তিনি ইউনির্ভাসিটি অব ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ২০ আগস্ট খৈইয়াছড়া ঝর্ণা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কুমিল্লার লালমাইয়ের ছোট শরিফপুর এলাকার বাসিন্দা অঞ্জন বড়ুয়া (২১) ও একই এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল হক (২২) নামে দুই পর্যটকের মৃত্যু হয়। অঞ্জন বড়ুয়া কুমিল্লা সরকারী কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ফয়সাল হক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারী খৈইয়াছড়া ঝর্ণা থেকে পা পিছলে কূপে পড়ে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার আনাস (২২) মারা যান। ২০২৩ সালে দুই জন নিহত ও একজন আহত হন। একই বছরের ২৭ জুন সোনাইছড়ি ঝর্ণা দেখতে এসে পথভ্রষ্ট হন ১৫ পর্যটক। এ সময় জরুরী সেবায় যোগাযোগ করে সাহায্য চান তারা। পরে মিরসরাই থানা-পুলিশ ও ফায়ার সাভির্সের কর্মীরা দুর্গম পাহাড় থেকে তাদের উদ্ধার করেন।

২০২২ সালের ১৯ জুন মিরসরাইয়ের নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) স্নাতকের ছাত্র মাসুদ আহম্মেদ তানভীর, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেধাবী ছাত্র তৌফিক আহম্মেদ তারেক ও চট্টগ্রাম ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেধাবী ছাত্র ইশতিয়াকুর রহমান প্রান্তের মৃত্যু হয়। এছাড়া ওই বছর আহত হন আরও তিন জন। ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে আহত হন একজন। ২০২০ সালে খৈইয়াছড়া ঝর্ণা ও নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় দুই জনের মৃত্যু ও চার জন আহত হন। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল খৈইয়াছড়া পাহাড়ী এলাকায় ঝর্ণার ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে মোঃ আশরাফ হোসেন (৩০) নামে এক যুবক মারা যান। ২৮ জুন খৈইয়াছড়া ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে মৃত্যু হয় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটকের। ১২ জুলাই বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখতে আসা ১৫ ছাত্রছাত্রী অসতর্কতার জন্য ঝর্ণার পথে ছরায় পানি বেড়ে যাওয়ায় আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকের পানিতে ডুবে মারা যান শাহাদাত হোসেন (২২)। ২৬ জুলাই অসতর্কভাবে ছবি তুলতে গিয়ে খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় আবু আলী আল হোসাই মেমোরী (৩০) নামে প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে আসা মেহেদী হাসান (২২) নামে একজন প্রকৌশল ছাত্রের মৃত্যু হয় রুপসী ঝর্ণায়। গত ২৯ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন নামে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। গত ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে আসা ফয়েজ আহমদ নামে এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে মারা যান। আহত হয়েছেন কমপক্ষে চার জন।

এছাড়া ২০১৮ সালে ১৫ আগস্ট নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। একই বছরের ১৫ জুলাই খৈইয়াছড়া ঝর্ণার পঞ্চম স্তরে ওঠার পর স্থানীয় এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরতে যান ওয়াসিম আসগর নামে অপর এক পর্যটক। ওই পর্যটক সামান্য আঘাত পেলেও ওয়াসিম পাহাড়ের নিচে পড়ে যান। এতে মারাত্মক আহত হন তিনি। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। একই বছরের ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখতে এসে আটকা পড়েন ১৫ পর্যটক। চার ঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এছাড়াও ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে আহত হন আরও শতাধিক পর্যটক।

সর্বশেষ গত ১৪ জুন সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগাহাট এলাকায় অবস্থিত সহস্রধারা-২ ঝর্ণার লেকে গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার হাউজিং ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের পুত্র তাহসিন আনোয়ার (১৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। পরদিন ১৫ জুন মিরসরাইয়ের রুপসী ঝর্ণার কূপে ডুবে চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ী কামাল গেইট এলাকার মোঃ সরওয়ার কামাল গোলাপের পুত্র আসিফ উদ্দিন (২৪) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

একের পর এক পর্যটকের মৃত্যুতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় বন বিভাগকে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তার অনেকগুলো পরামর্শ বাস্তবায়ন করেনি বন বিভাগ। ফলে আবারো ঘটছে দুর্ঘটনা।

ফায়ার সার্ভিস ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনায় পর্যটকদের হতাহতের বেশ কয়েকটি কারণ জানা গেছে। এর মধ্যে পর্যটকদের নির্দেশনা অমান্য করা, নিষিদ্ধ স্থানে গিয়ে ছবি তোলা, সাঁতার না জেনে ঝর্ণার কূপে নামা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, পর্যটন স্পটে নিরাপত্তার অভাব, অভিভাবকদের উদাসীনতা, পর্যটন স্পটে মাদক গ্রহণ ও ঝর্ণায় যাওয়ার পথে গাইড না নিয়ে যাওয়া অন্যতম। পর্যটকরা ঝর্ণায় গিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করেন। ফলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় দেখা গেছে, ঝর্ণার পাশে একটি গাছের সঙ্গে ফেস্টুন লাগানো আছে। সেখানে লেখা আছে, ‘বিপজ্জনক স্থান, সামনে যাওয়া নিষেধ’, ‘মাদককে না বলি, মাদক সেবনকারী ও বহনকারীকে পুলিশে সোপর্দ করা হবে। একই রকম কয়েকটি ফেস্টুন টিকিট কাউন্টারের পাশে লাগানো। পর্যটকরা ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। ইজারাদারের লোকজন টিকিট কেটে পর্যটকদের ভেতরে ঢোকাচ্ছেন।

সুপ্তধারা ঝর্ণায় বেড়াতে আসা সরকারী চাকরিজীবী আব্দুল আউয়াল বলেন, ঝর্ণার যে স্থানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে ইজারাদার অথবা বন বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন।

খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় আসা চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের ছাত্র সাকিব হোসেন বলেন, এখানে স্থানীয় দোকানদাররা পর্যটকদের হয়রানী করে। যেকোনো জিনিসের দাম বেশী রাখে। কিছু বলাও যায় না। স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টোশন অফিসার মোঃ সাইদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বন বিভাগকে আমাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বনবিভাগ এ বিষয়ে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। পদক্ষেপ গ্রহণ করলে হয়ত দুর্ঘটনা কমে আসত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন বলেন, বেশীরভাগ পর্যটক আসে সমতল থেকে। তাদের পাহাড় ও ঝর্ণার নিচের কূপের গভীরতা সর্ম্পকে ধারণা থাকে না। তাই না জেনে পর্যটকরা দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। ঝর্ণায় আসা সবাইকে আগে থেকে ধারণা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ঝর্ণার ইজারা নেওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ.আর এন্টারপ্রাইজের অন্যতম ইজারাদার ওহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ বছর তারা সাঁতার কাটতে পানিতে নামতে নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু পর্যটকরা শুনতে চান না। বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। গাইড নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তা তারা মানেন না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঝর্ণার দায়িত্বে থাকা বারৈয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, পর্যটকদের টিকিট দেওয়ার সময় বিপজ্জনক স্থানগুলোতে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বন বিভাগ থেকে ঝূঁকিপূর্ণ স্থানে না যেতে ঝর্ণা পথে ফেস্টুন দেওয়া হয়েছে।

ডিএস./.

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

চট্টগ্রামের দুই উপজেলায় ঝর্ণার সৌন্দর্যের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশিত : ০১:৪৫:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ জুন ২০২৫

চট্টগ্রামের দুই উপজেলা সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের পাহাড়ী এলাকায় ঝর্ণাগুলো যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝর্ণায় পানি বেশী থাকায় পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে যান পর্যটকরা। ঝর্ণায় পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত না করা, পর্যটকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ না করা, পাহাড়ী পথ সম্পর্কে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা না থাকা, পর্যটকরা নির্দেশনা না মানা, সাঁতার না জানা ও প্রশিক্ষিত গাইডের অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।

জানা যায়, দুই উপজেলার ঝর্ণাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝরঝরি ঝর্ণা, মধুখায়া ঝর্ণা, সহস্রধারা-১ ঝর্ণা, সহস্রধারা-২ ঝর্ণা, সুপ্তধারা ঝর্ণা, অগ্নিকাণ্ড ও বিলাসী ঝর্ণা, খৈইয়াছড়া ঝর্ণা, রূপসী ঝর্ণা, বাওয়াছড়া ঝর্ণা, মেলখুম গিরিপথ, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, সোনাইছড়ি ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্ণা, মহামায়া বুনো ঝর্ণা দেখতে আসেন দূরদূরান্তের পর্যটকরা। পাহাড়ের শরীর লেপ্টে টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে গিয়ে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা। অসতর্কতা ও সাঁতার না জানার কারণে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। এর অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রকৃতিপ্রেমিরা জীবনের ঝুঁকি নেন। নানা প্রতিকূলতা ও অব্যবস্থাপনায় গত আট বছরে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন ঝর্ণায় ২৫ জন আর সীতাকুণ্ডে গত দুই বছরে ৮ জন পর্যটক প্রাণ হারান, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এছাড়া গাইড ছাড়া বিভিন্ন ঝর্ণায় যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে যাওয়া শতাধিক পর্যটককে উদ্ধার করেছে সীতাকুণ্ড, জোরারগঞ্জ ও মিরসরাই থানা পুলিশসহ ফায়ার সার্ভিস টিম। তবুও টনক নড়েনি ইজারাদার ও বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের। ইজারাদারের দাবী, ঝর্ণায় আসা পর্যটকদের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলেও তারা মানছেন না, ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত ১৫টি প্রাকৃতিক ঝর্ণার মধ্যে ৭টি ঝর্ণা ইজারা দেয় চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলো দেখাশোনা করা হয়। প্রত্যেক বছর ইজারামূল্য বাড়লেও পর্যটকদের জন্য এখনো নিরাপদ হয়ে উঠেনি ঝর্ণাগুলো। প্রত্যেক বছর এসব ঝর্ণা দেখতে এসে নিহত হচ্ছেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া গত চার বছরে ঝর্ণাগুলোর ইজারামূল্য বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। ২০২২ সালে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলোর ইজারা দেয় বন বিভাগ। ওই বছর ১২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে ২৯ লাখ টাকায় ইজারা নেন এএইচ এন্টারপ্রাইজ। ২০২৪ সালে ৩০ লাখ টাকায় ইজারা নেন সোমোশন এন্টারপ্রাইজ। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অধীনে ঝর্ণাগুলো এক বছরের জন্য ভ্যাটসহ প্রায় ৪৮ লাখ টাকায় ইজারা নেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ.আর এন্টারপ্রাইজ।

স্থানীয়দের দাবী, ঝর্ণা দেখতে আসা সিংহভাগ পর্যটক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া। এদের মধ্যে অনেকে সাঁতার জানেন না। তাই ঝর্ণার নিচে থাকা কূপে পড়ে গেলে উঠতে না পারায় প্রাণ হারাচ্ছেন।

এই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের পাহাড়ে অবস্থিত বিলাসী ঝর্ণায় গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্রলি নাথ পাড়া এলাকার আবুল কাশেমের পুত্র ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র একেএম নাইমুল হাসান (২০) নামের এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। গত ২৮ আগস্ট বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগারহাটের পূর্ব পাশের পাহাড়ে অবস্থিত সহস্রধারা-২ ঝর্ণার হৃদে ডুবে নড়াইল জেলার লোহাগাড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামের আবুল হাসেমের পুত্র সোহানুর রহমান (২৬) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়।

২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর উপজেলার রূপসী ঝর্ণায় ছবি তুলতে গিয়ে কূপের পানিতে ডুবে মুশফিকুর রহমান আদনান (২১) ও মাহবুব রহমান মুত্তাকিম (২১) নামে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। মুশফিকুর রহমান আদনান ঢাকা ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও মাহবুব রহমান মুত্তাকিম নারায়ণগঞ্জ কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। গত ১৭ এপ্রিল বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগাহাট সুপ্তধারা ঝর্ণায় গোসল করতে নেমে রাউজান উপজেলার গহিরা এলাকার মৃত এরশাদ হোসেনের পুত্র ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুনতাসির চৌধুরী (১৮) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় ছয় জন ঘুরতে এসে পাথর পড়ে মাহবুব হাসান (৩০) নামে ওয়ান ব্যাংক কর্মকর্তা মারা যান ও গাজী আহমেদ বিন শামস (৩৫) নামে আরেকজন গুরুতর আহত হন। তারা সহকর্মী ছিলেন। এছাড়া গত ৩ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে সিফাতুর রহমান মজুমদার (২০) নামে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। তিনি ইউনির্ভাসিটি অব ডেভলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ২০ আগস্ট খৈইয়াছড়া ঝর্ণা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কুমিল্লার লালমাইয়ের ছোট শরিফপুর এলাকার বাসিন্দা অঞ্জন বড়ুয়া (২১) ও একই এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল হক (২২) নামে দুই পর্যটকের মৃত্যু হয়। অঞ্জন বড়ুয়া কুমিল্লা সরকারী কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ফয়সাল হক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারী খৈইয়াছড়া ঝর্ণা থেকে পা পিছলে কূপে পড়ে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার আনাস (২২) মারা যান। ২০২৩ সালে দুই জন নিহত ও একজন আহত হন। একই বছরের ২৭ জুন সোনাইছড়ি ঝর্ণা দেখতে এসে পথভ্রষ্ট হন ১৫ পর্যটক। এ সময় জরুরী সেবায় যোগাযোগ করে সাহায্য চান তারা। পরে মিরসরাই থানা-পুলিশ ও ফায়ার সাভির্সের কর্মীরা দুর্গম পাহাড় থেকে তাদের উদ্ধার করেন।

২০২২ সালের ১৯ জুন মিরসরাইয়ের নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) স্নাতকের ছাত্র মাসুদ আহম্মেদ তানভীর, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেধাবী ছাত্র তৌফিক আহম্মেদ তারেক ও চট্টগ্রাম ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেধাবী ছাত্র ইশতিয়াকুর রহমান প্রান্তের মৃত্যু হয়। এছাড়া ওই বছর আহত হন আরও তিন জন। ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খৈইয়াছড়া ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে আহত হন একজন। ২০২০ সালে খৈইয়াছড়া ঝর্ণা ও নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় দুই জনের মৃত্যু ও চার জন আহত হন। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল খৈইয়াছড়া পাহাড়ী এলাকায় ঝর্ণার ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে মোঃ আশরাফ হোসেন (৩০) নামে এক যুবক মারা যান। ২৮ জুন খৈইয়াছড়া ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে মৃত্যু হয় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটকের। ১২ জুলাই বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখতে আসা ১৫ ছাত্রছাত্রী অসতর্কতার জন্য ঝর্ণার পথে ছরায় পানি বেড়ে যাওয়ায় আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকের পানিতে ডুবে মারা যান শাহাদাত হোসেন (২২)। ২৬ জুলাই অসতর্কভাবে ছবি তুলতে গিয়ে খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় আবু আলী আল হোসাই মেমোরী (৩০) নামে প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে আসা মেহেদী হাসান (২২) নামে একজন প্রকৌশল ছাত্রের মৃত্যু হয় রুপসী ঝর্ণায়। গত ২৯ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন নামে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। গত ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে আসা ফয়েজ আহমদ নামে এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে মারা যান। আহত হয়েছেন কমপক্ষে চার জন।

এছাড়া ২০১৮ সালে ১৫ আগস্ট নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। একই বছরের ১৫ জুলাই খৈইয়াছড়া ঝর্ণার পঞ্চম স্তরে ওঠার পর স্থানীয় এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরতে যান ওয়াসিম আসগর নামে অপর এক পর্যটক। ওই পর্যটক সামান্য আঘাত পেলেও ওয়াসিম পাহাড়ের নিচে পড়ে যান। এতে মারাত্মক আহত হন তিনি। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর নাপিত্তাছড়া ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। একই বছরের ১২ জুলাই উপজেলার বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখতে এসে আটকা পড়েন ১৫ পর্যটক। চার ঘণ্টা চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করে মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এছাড়াও ঝর্ণার ওপর থেকে পড়ে আহত হন আরও শতাধিক পর্যটক।

সর্বশেষ গত ১৪ জুন সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগাহাট এলাকায় অবস্থিত সহস্রধারা-২ ঝর্ণার লেকে গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার হাউজিং ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের পুত্র তাহসিন আনোয়ার (১৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। পরদিন ১৫ জুন মিরসরাইয়ের রুপসী ঝর্ণার কূপে ডুবে চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার পূর্ব মাদারবাড়ী কামাল গেইট এলাকার মোঃ সরওয়ার কামাল গোলাপের পুত্র আসিফ উদ্দিন (২৪) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

একের পর এক পর্যটকের মৃত্যুতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় বন বিভাগকে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তার অনেকগুলো পরামর্শ বাস্তবায়ন করেনি বন বিভাগ। ফলে আবারো ঘটছে দুর্ঘটনা।

ফায়ার সার্ভিস ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনায় পর্যটকদের হতাহতের বেশ কয়েকটি কারণ জানা গেছে। এর মধ্যে পর্যটকদের নির্দেশনা অমান্য করা, নিষিদ্ধ স্থানে গিয়ে ছবি তোলা, সাঁতার না জেনে ঝর্ণার কূপে নামা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, পর্যটন স্পটে নিরাপত্তার অভাব, অভিভাবকদের উদাসীনতা, পর্যটন স্পটে মাদক গ্রহণ ও ঝর্ণায় যাওয়ার পথে গাইড না নিয়ে যাওয়া অন্যতম। পর্যটকরা ঝর্ণায় গিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করেন। ফলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় দেখা গেছে, ঝর্ণার পাশে একটি গাছের সঙ্গে ফেস্টুন লাগানো আছে। সেখানে লেখা আছে, ‘বিপজ্জনক স্থান, সামনে যাওয়া নিষেধ’, ‘মাদককে না বলি, মাদক সেবনকারী ও বহনকারীকে পুলিশে সোপর্দ করা হবে। একই রকম কয়েকটি ফেস্টুন টিকিট কাউন্টারের পাশে লাগানো। পর্যটকরা ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। ইজারাদারের লোকজন টিকিট কেটে পর্যটকদের ভেতরে ঢোকাচ্ছেন।

সুপ্তধারা ঝর্ণায় বেড়াতে আসা সরকারী চাকরিজীবী আব্দুল আউয়াল বলেন, ঝর্ণার যে স্থানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে ইজারাদার অথবা বন বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন।

খৈইয়াছড়া ঝর্ণায় আসা চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের ছাত্র সাকিব হোসেন বলেন, এখানে স্থানীয় দোকানদাররা পর্যটকদের হয়রানী করে। যেকোনো জিনিসের দাম বেশী রাখে। কিছু বলাও যায় না। স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টোশন অফিসার মোঃ সাইদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বন বিভাগকে আমাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু বনবিভাগ এ বিষয়ে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। পদক্ষেপ গ্রহণ করলে হয়ত দুর্ঘটনা কমে আসত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন বলেন, বেশীরভাগ পর্যটক আসে সমতল থেকে। তাদের পাহাড় ও ঝর্ণার নিচের কূপের গভীরতা সর্ম্পকে ধারণা থাকে না। তাই না জেনে পর্যটকরা দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। ঝর্ণায় আসা সবাইকে আগে থেকে ধারণা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ঝর্ণার ইজারা নেওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ.আর এন্টারপ্রাইজের অন্যতম ইজারাদার ওহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ বছর তারা সাঁতার কাটতে পানিতে নামতে নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু পর্যটকরা শুনতে চান না। বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। গাইড নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তা তারা মানেন না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঝর্ণার দায়িত্বে থাকা বারৈয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, পর্যটকদের টিকিট দেওয়ার সময় বিপজ্জনক স্থানগুলোতে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বন বিভাগ থেকে ঝূঁকিপূর্ণ স্থানে না যেতে ঝর্ণা পথে ফেস্টুন দেওয়া হয়েছে।

ডিএস./.