৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর রাজনীতির কারণে আত্মগোপনে চলে যান অনেক জনপ্রতিনিধি। পরবর্তীতে অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অপসারণ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের। আবার কেউ বিভিন্ন মামলায় এখন কারাগারে।
জনপ্রতিনিধিবিহীন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন পরিষদের সকল প্রকার সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যথাসময়ে মিলছে না নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ ও জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সনদ। এ কারণে বিপাকে পড়েছেন সাতটি ইউনিয়নের তিন লাখ ১৫ হাজার ৬৩৯ বাসিন্দা। এসব ইউনিয়নে ২৮ দিন ধরে মিলছে না নাগরিক সেবা।
সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাকখালী এলাকার বাসিন্দা সম্রাট নাজিম উদ্দিন আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ছেলের জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি আর জন্মনিবন্ধন চেয়ারম্যানের সই ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। কখন এই জন্মনিবন্ধন তুলতে পারবো তা জানি না।
অবশ্য শুধু সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদ নয়। সীতাকুণ্ড উপজেলার বাকি ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চিত্রই এমন। সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের বাইরে বাকি ছয়টি ইউনিয়ন হলো- মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, সোনাইছড়ি ও সলিমপুর।
উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এই সাত ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই এসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কার্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এসব ইউনিয়নের আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। এরপর কিছুদিন ইউনিয়ন পরিষদের পরিসেবার কার্যক্রম চলে। তবে এই সাত ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের রিট পিটিশনের পরিপেক্ষিতে চলতি বছরের ২৩ জুন এই দায়িত্ব পালনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন উচ্চ আদালত। ফলে আবারও চেয়ারম্যানরা প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা ফিরে পান। তবু তারা পরিষদে ফিরছেন না। তাদের দাবী, পরিষদে ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। আর উপজেলা প্রশাসন বলছে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তারা কাজ করছেন।
সেবা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব অঞ্চলের নাগরিকেরা। মুরাদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ব্যবসায়ী অলি আহমেদ বলেন, ‘জুলাইয়ের শুরুতেই আমার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের প্রয়োজন হয়। আমি যথাসময়ে আবেদন করলেও চেয়ারম্যান না থাকায় ফাইল আটকে রয়েছে। ফলে নতুন অর্থবছরের দরপত্রে অংশ নিতে পারছি না। আমার মতো অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, অবিবাহিত সনদ, নাগরিক সনদ, চারিত্রিক সনদসহ অন্তত ২০ ধরনের সেবা সাধারণ মানুষ পেয়ে থাকেন। কিন্তু চেয়ারম্যানরা দায়িত্বে না ফেরায় পুরো সেবা ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবুল কাশেম বলেন, চেয়ারম্যান আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন না। ফলে কোনো সনদ ইস্যু করা যাচ্ছে না। সেবাপ্রার্থীদের বারবার বোঝালেও অনেকেই রাগ করছেন, তর্ক করছেন।’
সীতাকুণ্ডের চেয়ারম্যান সমিতির সভাপতি ও সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ এম তাজুল ইসলাম নিজামী বলেন, আমরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। আমরা জনগণকে সেবা দিতে চাই। কিন্তু পরিষদে যাওয়ার পরিবেশ নেই। সরকার আমাদের নিরাপত্তা দিলে আমরা কাজে ফিরবো।
এদিকে ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ পালিয়ে থাকায় পরিষদে না আসায় জনগণকে সেবা থেকে বঞ্চিত করে চরম ভোগান্তিতে ফেলার প্রতিবাদে এবং সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের সেবা নিশ্চিত এবং এ অবৈধ চেয়ারম্যানদেরকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবীতে গত মঙ্গলবার সকালে উপজেলা পরিষদের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে স্মারকলিপি দিয়েছে সাতটি ইউনিয়নের জনসাধারণ।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম বলেন, মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা সেভাবে কাজ করবো।
ডিএস./.




















