একজন সরকারি কর্মকর্তা চাইলেই যে একটা এলাকার চেহারা পালটে দিতে পারেন, অসহায় মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন-তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মাহমুদা জাহান। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত আছেন। ৩৬তম বিসিএসের এ নবীন কর্মকর্তার হাত ধরেই যেন বদলে যাচ্ছে ব্রাহ্মণপাড়ার প্রতিটি অলিগলি, রাস্তা ঘাট, পাড়া মহল্লা, স্কুল – কলেজের চিত্র।
সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি কর্মকর্তাই মানে বিশাল কিছু । কথায় বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চেয়ারে বসলেই বড়ো স্যার! কিন্তু ব্রাহ্মণপাড়া যেন সেই চিত্র ভিন্ন। ব্রাহ্মণপাড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে মাহমুদা জাহান যোগদানের পর থেকে গত কয়েক মাসে বদলে গেছে এখানকার উপজেলার চিত্র। সাধারণ মানুষকে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা করে দিয়েছেন তিনি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা একটি অবহেলিত এবং নিম্নাঞ্চল, নিচু ভূমির উপজেলা। এটা সীমান্তবর্তী এলাকা ঘেসা। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা একটি পৌরসভা (ব্রাহ্মণপাড়া পৌরসভা) এবং আটটি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত: মাধবপুর, শিদলাই, চান্দলা, শশীদল, দুলালপুর, ব্রাহ্মণপাড়া সদর, সাহেবাবাদ এবং মালাপাড়া। এই ইউনিয়নগুলো আবার মৌজা ও গ্রামে বিভক্ত,এ নিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। এখানকার প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি অফিসে সেবা নিতে যাওয়া সেবাগ্রহীতারা আগে হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিছু কিছু ইউনিয়নের অফিসে টাকা ছাড়া কোনো কাজই করাতে পারেননি। অনেক সময় টাকা নিয়েও সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছেন উলটো। কিন্তু একজন নারী ইউএনও যেন মানুষের চোখের জল মুছে দিয়েছেন তার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, সাহস আর কর্মের প্রতি একাগ্রতার মধ্য দিয়ে। সাধারণ জনগণ মনে করেন তাদের আস্থার যায়গা ইউএনও।
মাহমুদা জাহান ব্রাহ্মণপাড়ায় যোগদানের পর থেকে গত কয়েক মাসে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন অফিসে ছুটে গিয়েছেন।কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন এই বলে যে, ‘সেবাগ্রহীতাদের কোনো রকম হয়রানি করা যাবে না। তাৎক্ষণিক মানুষের সমস্যার সমাধান করে দিতে হবে। আর অবৈধ আর্থিক লেনদেন যেন কেউ না করেন। কারও বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেলে পরিণতি ভালো হবে না।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এ বার্তা যেন টক্সিনের মতো কাজ করেছে। ইতোমধ্যে তিনি তার কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন।
সাধার মানুষের পারিবারিক সমস্যার সমাধানে মাহমুদা যেন দেবদূত : ব্রাহ্মণপাড়ায় বছরের পর বছর নারীরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পারিবারিক কলহের কারণে কোন সমস্যার সমাধান খোজে পাননা। বছরের পর বছর এভাবেই অতি সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হলেও মাহমুদা জাহান যেন সেখানে দেবদূত হয়ে হাজির হয়েছেন বঞ্চিতদের পাশে। এমনকি এই এলাকার মানুষ সামাজিক ও কল্যানমূলক কাজ থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করা হতো। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সকল কর্মকর্তাদের যার যার কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন আইনানুযায়ী। মাহমুদার এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সর্বসাধারণ সন্তোষজনক সেবা পাচ্ছেন।
এছাড়া মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযান, ডেজার উদ্ধার, তদারকি ও মোবাইল কোর্ট, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, পরিবেশ বান্ধব রাস্তা -ঘাট, ড্রেনেজ, খাল পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, সচেতনতা মূলক সভা সেমিনার, গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে পরামর্শসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন মাহমুদা জাহান।
দালাল, ঘুস, চাঁদামুক্ত অঙ্গীকার: মাহমুদা জাহান ইউএনও হিসেবে যোগদানের পর থেকে ব্রাহ্মণপাড় উপজেলা অফিসকে ঘুস ও দালালমুক্ত করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সহজে সেবা দিতে বেশকিছু ভালো উদ্যোগ নেন। এর ফলে সেবাগ্রহীতারা অল্প সময়ে সহজেই সেবা পেতে শুরু করেন। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সহকারী কর্মকর্তাদের ডেকে কাজের অবহেলা এবং অনিয়ম না করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দালালচক্র যেন কোন অফিসের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে কড়া নির্দেশ দেন তিনি।
সবার কথা শুনেন ইউএনও: সাধারণত দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে অনুমতি ছাড়া সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারেন না; কিন্তু মাহমুদা তার দপ্তরকে উন্মুক্ত করে রেখেছেন। যে কেউ তার যে কোনো সমস্যা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তার সামনে হাজির হতে পারেন। সপ্তাহে ৭ দিনই তিনি ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতাদের সমস্যার কথা শুনেন, তাদের সমস্যা দ্রুত সমাধানেরও চেষ্টা করেন।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা জাহান বলেন, আমি এখানে যোগদানের পর থেকে দিন রাত- নারী পুরুষ এটা চিন্তা করে নয়, একজন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে এখন পর্যন্ত কোন রকম সমস্যার মোখাপক্ষি হতে হয় নাই, সবাই আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। আমি এখানে সরকারের কল্যানে বসেছি,আমার কাছে নিরপেক্ষতা এবং আইন মেনে সামনে চলা আমার মূল্য লক্ষ। অন্যান্য উপজেলার তুলনায় এখানের প্রেক্ষাপটা একটু ভিন্ন, যেমন পারিবারিক কলহ হলে প্রথমে যাওয়ার কথা থানায়, মারামারি হলে যাওয়ার কথা হাসপাতালে কিন্তু এরা প্রথমে আসে ইউএনও এর কাছে, তারা মনে করেন যে ইউএনও এর কাছে আসলে তারা ন্যায় বিচার পাবে, এসে বলে আপনি একটু থানায় বলে দেন। এতে করে যেনো সাধারণ ভুক্তভোগীরা স্বস্তি পায়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারী থেকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন বিসিএস ৩৬ ব্যাচের মাহমুদা জাহান ।
ডিএস./




















