দূর থেকে দেখলে মনে হয়, রাস্তার ধারে যেন সাদা বস্তায় ছাইয়ের দীর্ঘ সারি। কৃষকের কাছে একসময় ফেলে দেওয়া বর্জ্য হিসেবে পরিচিত এই ছাই এখন পেঁয়াজ চাষের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপকরণ। পাবনার বেড়া- সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এই ছাইভর্তি বস্তা। পেঁয়াজের বীজতলা তৈরিতে রাসায়নিক সার (ডিএপি ও টিএসপি) ব্যবহার কমিয়ে ছাই ও গোবর (জৈব সার) ব্যবহার শুরু করেছে কৃষক।
পেঁয়াজ চাষিদের আগাম চাহিদা মাথায় রেখে মৌসুম শুরুর আগেই ছাই সংগ্রহ, বস্তাবন্দী ও মজুদ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বেড়া-সাঁথিয়ার কৃষির সঙ্গে পেঁয়াজের সম্পর্ক বহুদিনের। শীত এলেই উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শুরু হয় পেঁয়াজের আবাদ। জমি প্রস্তুত, বীজ বা চারা রোপণ, পরিচর্যা থেকে শুরু করে পেঁয়াজ তোলা পর্যন্ত পুরো মৌসুমজুড়ে ব্যস্ত থাকেন কৃষকেরা। পেঁয়াজকে ঘিরে মাঠের শ্রমিক, বীজ-সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার ও হাটবাজারের ব্যবসায়ীদেরও কর্মব্যস্ততা বাড়ে। তাই অনেক কৃষকের কাছে পেঁয়াজ শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়, সংসারের আয়ের অন্যতম ভরসা।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পেঁয়াজ চাষে প্রতিবছরই বাড়ছে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ। উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে তারা জমিতে সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম দামের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ছাইও বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ছাইকে তাঁরা সারের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সারের পাশাপাশি অতিরিক্ত উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের পেঁয়াজচাষি শহিদুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজের বীজতলায় ছাই ব্যবহার করলে দ্রুত চারা বৃদ্ধি পায় ও চারার শেকড় মজবুদ হয়। এতে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয় ও উৎপাদন খরচ কম হয়। পেঁয়াজ রোপণের পূর্বে নিজেই বীজতলা তৈরি করি। ছাই ব্যবহারে পূর্বের চেয়ে বীজতলায় চারা ভালো হয়।
বেড়া-সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজের মৌসুম শুরু না হলেও ছাই সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কোথাও বড় বড় স্তুপ করে রাখা হয়েছে ছাইয়ের বস্তা। বিভিন্ন স্থান থেকে ছাই সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরা তা পরিবহনের মাধ্যমে এই সব এলাকায় এনে মজুত করছেন। পরে পেঁয়াজচাষিদের কাছে বস্তা কিংবা পরিমাণ অনুযায়ী বিক্রি করা হবে।
সাঁথিয়ার হুইখালি গ্রামের ছাই ব্যবসায়ী মো. কাওছার জানান, পেঁয়াজের মৌসুমে ছাইয়ের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই মৌসুম শুরুর আগেই ছাই সংগ্রহ করে রাখতে হয়। আমরা বিভিন্ন অটো রাইস মিল, ধানের চাতাল ও ইটভাটা থেকে ছাই সংগ্রহ করি। পেঁয়াজের চাষ শুরু হলে কৃষকেরা এসে আমাদের কাছ থেকে ছাই কিনে নিয়ে যান। তখন একসঙ্গে অনেক ছাইয়ের প্রয়োজন হয়, তাই আগে থেকেই মজুত না করলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা কঠিন।
একসময় যে ছাইকে প্রায় মূল্যহীন বর্জ্য হিসেবে দেখা হতো, পেঁয়াজের আবাদকে কেন্দ্র করে সেটিরও বাজার তৈরি হয়েছে পেঁয়াজের ভান্ডার এই সব অঞ্চলে। মৌসুম যত এগিয়ে আসে, ততই বাড়ে ছাইয়ের চাহিদা। ফলে পেঁয়াজ চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও ছাই সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রির মাধ্যমে কিছু মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজিব আল মারুফ বলেন, বীজতলায় ব্যবহৃত ছাই ও গোবর প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। পেঁয়াজের চারাকে ক্ষতিকর পোকা থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও এগুলো (জৈব সার) অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে কমতে থাকা জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে।
_Rakib_






















