জমে উঠেছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নেমেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন মহাজোট নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার আগের দিন থেকেই শুরু হয়েছে তিনশ আসনে প্রচার-প্রচারণা।
আওয়ামী লীগ বিগত ১০ বছরে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়ন-কর্মকাণ্ডে প্রতিটি ভোটারের কাছে তুলে ধরছে। দলটির নেতাকর্মীরা অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সে কাজটি করে আসছেন। তারপরও মানুষ এবারো নৌকায় কেন ভোট দেবেন তা বোঝানোর জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নানামুখী প্রচার-প্রচারণা চলছে। নির্বাচনী প্রচারণায় গঠিত দলটির প্রচার উপকমিটি এর আগে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। বৈঠকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নানামুখী কৌশল নির্ধারণ করে। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও এবার প্রচারণায় আছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ।
জানা গেছে, এবার নির্বাচনে গতানুগতিক প্রচারণার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারণার ব্যাপকতার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সে লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়েছে প্রচার-উপকমিটি। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও ক্রীড়া, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বিনোদন জগতের একঝাঁক তারকা নৌকার পক্ষে প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন। তারকাদের প্রচারণা হচ্ছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যেই কিছুটা নমুনাও দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও প্রচারণায় যাচ্ছেন তারা।
গত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের দুই প্রখাত চিত্রনায়ক রিয়াজ ও ফেরদৌস। কোটালীপাড়া ও রাজবাড়ির পাটুরিয়া ঘাটে বক্তব্য দিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চান তারা। এ ছাড়া রাজধানীতেও কয়েক দফা নৌকার পক্ষে প্রচারণায় মাঠে নামেন তারা।
আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমরা প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছি। ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসআপ, ইমো, ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন-কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষও যেন সরকারের উন্নয়ন সম্পর্কে অবহিত হতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। বিভিন্ন লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের মধ্যেমেও সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরা হচ্ছে তাদের কাছে। ব্যানার-পোস্টার, ফেস্টুনেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
শেখ হাসিনার সরকার জনগণের কল্যাণে কি কি কাজ করেছে সেগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি ২০০১ থেকে ২০০৬ ও ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে সারা দেশে যে জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়েছে তার সিডি করা হয়েছে। যা তিনশ আসনেই মহাজোটের প্রার্থীদের দেয়া হয়েছে। সেগুলো বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে। প্রতিটি ভোটারের কাছে সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। এ ছাড়া মহাজোটের প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনের ভোটারদের কাছে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমেও তাদের প্রচারণা চালাবেন।
তিনি জানান, আমাদের দলীয় ও মহাজোটের নেতাকর্মীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যাদের মধ্যে আছেন ক্রীড়া, সংস্কৃতি, ছোট-বড় পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, গুণীজন, সাহিত্যিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক। তারাও স্বপ্রণোদিত হয়ে নৌকার প্রচারণায় নেমেছেন। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন ভিডিও, শর্টফিল্ম তৈরি করেছেন। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এতে মানুষ অনুপ্রাণিত হচ্ছে। এরইমধ্যে এফডিসির সামনে থেকে চলচ্চিত্র অঙ্গনের তারকারা কয়েকটি ট্রাকে করে প্রচারণা চালিয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তারা। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনেই রাজধানী ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে তারকারা যাচ্ছেন নৌকার প্রচারণায়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে নৌকার পক্ষে তারকাদের ভিডিওসমৃদ্ধ ডিজিটাল প্রচারণা। ফেসবুকে ৪৭ সেকেন্ডের এক ভিডিওতে দেখা গেছে, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে বিশিষ্ট সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলন ভোট দেবেন নৌকায়, তার আস্থা শেখ হাসিনায়। সেখানে ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি সবাই মিলে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধশালী আগামীর বাংলাদেশ গড়তে নৌকায় ভোট দেয়ার আহবান জানান।
ভিডিওতে দেখা গেছে, বিশিষ্ট এই কথাসাহিত্যিক বলেন, লেখালেখির কাজে ঢাকার বাইরে গেলে দেশটাকে আমি দেখতে পাই, দেশের উন্নয়নটাকে দেখতে পাই। দেশ নিয়ে আমরা যা স্বপ্ন দেখেছি, বঙ্গবন্ধুকন্যা সেই স্বপ্ন ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো একটি কাজ করেছেন তা হলো, পদ্মা সেতু নির্মাণ। পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে বদলে দেবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বদলে দেবে। ইতোপূর্বে কখনো বাংলাদেশ এই উন্নয়নের সামান্যতম দেখাতে পারেনি। উন্নয়নের এই যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রত্যেক বাংলাদেশপ্রেমী মানুষকে অনুরোধ করব আপনার ভোটটি নৌকায় দিন, কারণ আমি আমার ভোট নৌকায় দেব।
ক্রিকেটের বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের দুই মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় দেখা গেছে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা। সেই ভিডিও বার্তায় সাকিব জানান, ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল। আমরা ৭২টি ম্যাচের বেশিরভাগে হেরেছি। কিন্তু আমরা জিততে চেয়েছি। কারণ এটা আমাদের কাছে কেবল খেলা নয়, এটা দেশ। কাজেই আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। আমি এখনো যখন ক্রিজে গিয়ে দাঁড়াই, আমার সঙ্গে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। আমি যখন শুরু করেছিলাম, আমার বয়স ছিল তখন ১৯। আর তোমরা যারা তরুণ, তাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের মতো করে নিশ্চিত স্বপ্ন আছে।
কিন্তু স্বপ্ন থাকলেই তো হয় না। সেই স্বপ্নকে দেশের স্বপ্ন করতে হয়। এগিয়ে আসতে হয় তৈরি করতে হয় নিজেকে, চিনে নিতে হয় সঠিক পথ। আমি কোনো সুপারম্যান নই, এদেশেরই একজন সাধারণ সন্তান। আমি জানি সবাই যার যার মতো আলাদা। কিন্তু একটা বিষয়ে আমরা সবাই এক, সেটা হলো আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। এদেশকে আমরা মা বলি। নিজের মাকে নিয়ে আমরা যেভাবে ভাবি, দেশকে নিয়ে কি সেভাবে ভাবি? অথচ দেশ আমাদের নিয়ে ভাবছে। নজর রাখছে ভালো-মন্দের। তার ভালো থাকায় আমাদের ভালো থাকা।
আর সবার ভালো থাকা মানে দেশের ভালো থাকা। তাকে নিয়ে এবার ভাবার সময় এসেছে। কারণ দেশ মানে আর কিছু নয়, তুমি, আমি, আমরা। এই আমরাই দেশ। সবাইকে ভালো রাখার, এগিয়ে যাওয়ার এক দুর্বার যাত্রায় এখন আমরা আছি। বিদ্যুৎ, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, খাদ্যে, নারীর ক্ষমতায়নে, সামাজিক ও মানব উন্নয়ন তো বটেই অবকাঠামো, যোগাযোগ আর ডিজিটাল অগ্রগতিতে বাংলাদেশ এখন বিশে^র উদাহরণ হতে চলেছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দেশকে জেতানোর লড়াইয়ে আছেন। বাংলাদেশ এখন তার পরিবার।
সবাইকে নিয়ে সবার ভালো থাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে। সবক্ষেত্রেই সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ তৈরির নীতি গ্রহণ করেছেন তিনি। সেখানে চাই তোমার সক্রিয় সমর্থন। এই অগ্রযাত্রা আরো এগিয়ে নিতে প্রয়োজন তোমাকে। আমার বিশ্বাস আমরা দাঁড়ালে, হারবে না দেশ। কারণ তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ এবার তোমার পালা।
এ ছাড়া ৪৭ সেকেন্ডের এক ভিডিও বার্তায় দেখা গেছে চিত্রনায়ক রিয়াজকে। তিনিও একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নৌকায় ভোট চান। ভিডিও বার্তায় আরো যাদের দেখা গেছে, তারা হলেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফা, চিত্র নায়িকা অপু বিশ্বাসকে। এ ছাড়া আরো অনেকেই এ ধরনের প্রচারণায় থাকছেন বলে জানা গেছে।
বিবি/রেআ
























