কক্সবাজারে লবণের বিক্রয়মূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় উপকূলীয় লবণ চাষীদের মাথায় হাত পড়েছে। এবছর লবণের রেকর্ড দরপতনে উঠছে না উৎপাদন খরচও। ফলে এই ভর মৌসুমে লবণ উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন অনেক চাষী।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) সূত্র জানায়, কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া,টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী-আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদন হয় লবণ।
চলতি মৌসুমে এসব এলাকা থেকে ১৮ লাখ টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছে বিসিকের। পুরো বছরের জন্য লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টন। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ টন লবণ উৎপাদন হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে এক মাস ধরে প্রতি ৫০ কেজি লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৭০-১৮০ টাকা দরে। অথচ এ পরিমাণ লবণ উৎপাদনে চাষীদের খরচ হয়েছে ৩৫০-৪০০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও লবণ বিক্রি করে পাচ্ছেন না চাষীরা।
লবণ চাষীরা জানান, লবণ চাষের জন্য ৪০ শতক জমি ইজারা নিতে হয় ৪০-৪৫ হাজার টাকায়। মাঠ তৈরিতে খরচ লাগে ৭ হাজার টাকা। সেচ দিতে খরচ হয় ৫ হাজার টাকা। প্রতি কানি জমিতে লবণ উৎপাদনে মজুরি খরচ পড়ে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা। আর জমিতে পলিথিন পেতে দিতে লাগে আরো ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এক কানি (৪০শতক)জমিতে লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৭০-৮০ হাজার টাকা। প্রতি কানি জমিতে লবণ উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০০ মণ। বর্তমানে ভালো মানের প্রতি মণ লবণের দাম ১৭০-১৮০ টাকা। সেই হিসাবে এক কানি জমিতে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৬-৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৮০ হাজার টাকা খরচে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা।
দিন রাত পরিশ্রম করেও লবণের উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে হতাশ উপকূলীয় লবণচাষীরা। পুরো মৌসুমে লবণের এই দাম অব্যাহত থাকলে বছরের বাকি সময় কেমনে কাটবে, এ আশঙ্কা কক্সবাজারের হাজার হাজার লবণচাষীর। তাদের দাবি, গরিব চাষীদের বাঁচাতে সরকার যেন লবণ আমদানি সীমিত করে। অন্যথায় তাদের উৎপাদন বন্ধ করে বিকল্প পেশা খুঁজতে হবে।
লবণের দাম কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে লবণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু আহমদ জানান, আমদানিকৃত লবণের মজুদ থাকায় ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে লবণ কিনছেন কম। এদিকে মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় উৎপাদন মৌসুমেই লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষীরা। ফলে বড় কোম্পানিগুলো চাষীদের ঠকিয়ে মাঠ থেকে লবণ কেনে। এতে লবণের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষীরা।
কোহিনূর সল্টের স্বত্বাধিকারী মো. ফরিদ উদ্দিন জানান, লবণ শিল্প বাঁচাতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এই লবণের ওপর উপকূলের হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে লবণ আমদানির কারণে আমদানিকারকরা লাভবান হলেও লোকসানে পড়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না উপকূলের চাষীরা। পুরো মৌসুমে যে পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়, তা দিয়ে একসময় তাদের সংসার চলত। আর এখন লবণ বিক্রি করে চাষীদের উৎপাদন খরচও উঠছে না। তাছাড়া বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মৌসুমের সময় কম দামে লবণ কিনে ৮-১০ গুণ বেশি দামে লবণ বিক্রি করছে বাজারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে এক কেজি লবণ ২ থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দামে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এখনো প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণের দাম ৩০-৩৮ টাকা।
শনিবার বাজার ঘুরে জানা যায়, বর্তমানে এসিআই, কনফিডেন্স, ফ্রেশ এসব প্যাকেটজাত লবণ প্রতি কেজি ৩৫-৩৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মাঝারি মানের মালেক, কিং, ঝিনুক এসব ব্র্যান্ডের লবণ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৬-৩০ টাকায়।
বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালে দেশে লবণের ঘাটতি ছিল ৮০ হাজার টন। ২০১৭-১৮ সালেও ১ লাখ ১ হাজার টন লবণের ঘাটতি দেখা দেয়। দুই অর্থবছরে লবণের মোট ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার টন। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার লবণ আমদানি করে তিন লাখ টন। এ হিসাবে দেশে বর্তমানে লবণ উদ্বৃত্ত আছে ১ লাখ ১৯ হাজার টন।
কক্সবাজারস্থ বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার দিলদার আহমদ চৌধুরী বলেন, গত মৌসুমে ৫৯ হাজার ৫৬৪ একর জমিতে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। গত বছর লবণের চাহিদা ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টন লবণ কম উৎপাদন হয়েছে গত বছর।
বিবি/রেআ




















