বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের ইচ্ছা অনুযায়ী ৯২–এর চুক্তির অনুসরণে এবারের চুক্তিটি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এই কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালের চুক্তি তারা অনুসরণ করতে চায়। সেভাবেই জিনিসটি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফিরিয়ে নেওয়া। এতে ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, এটা নাই সেটা নাই- এসব বলে লাভ নাই।’
মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া সংক্রান্ত কোনও সময়সীমা নেই- এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, ‘ফিরিয়ে নেওয়ার কোনও টাইমফ্রেম দেওয়া যায় না। প্র্যাকটিক্যাল ব্যাপার হলো, এরকম কোনও টাইমফ্রেম দিয়ে কোনও লাভও নেই।’
মন্ত্রী জানান, ‘মিয়ানমারে ফেরত নেওয়ার পর রোহিঙ্গাদের তাদের সাবেক আবাসস্থল বা পছন্দ অনুযায়ী কাছাকাছি কোনও স্থানে পুনর্বাসিত করা হবে। প্রাথমিকভাবে তাদের অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে সীমিত সময়ের জন্য রাখা হবে। এছাড়া যৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদের আগে পাঠানো হবে। আর এর আগে থেকেই যারা আছে (প্রায় তিন লাখের মতো) তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয় পরে বিবেচনা করা হবে।
মন্ত্রী জানান, যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ার জটিলতা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাই রোহিঙ্গাদের বর্ণনা করে আসছেন ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ ও ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে।
সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন ও গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের মত রোহিঙ্গা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। আর গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনে নতুন করে দমন অভিযান শুরুর পর ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে।
বেশ কিছুদিন কূটনৈতিক আলোচনার পর ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি করে, যেখানে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ওই চুক্তির আওতায় মিয়ানমার সে সময় দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়। চুক্তি নির্ধারিত যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও ২৪১৫ জন শরণার্থীকে সে সময় মিয়ানমার থেকে আসা বলে চিহ্নিত করা হলেও মিয়ানমার তাদের আর ফিরিয়ে নেয়নি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মধ্যে গত ১৯ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে সু চি বলেন, ১৯৯২ সালে করা প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় ‘যাচাইয়ের মাধ্যমে’ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রাখাইনের মুসলমানদের ফিরিয়ে নিতে তার দেশ প্রস্তুত।
এর ধারাবাহিকতায় সু চির দপ্তরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে অক্টোবরের শুরুতে ঢাকায় এলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দুই দেশ একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের বিষয়ে সম্মত হয়।
ওই বৈঠকেই ১৯৯২ সালের যৌথ বিবৃতির বদলে নতুন একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে চুক্তির একটি খসড়াও হস্তান্তর করা হয়।
গত ৯ অক্টোবর ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের ডেকে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, যে প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের চুক্তির নীতিমালা ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার তুলনায় অনেকটাই আলাদা। সুতরাং ওই চুক্তি অনুসারে এবার রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়।
২৫ আগস্ট ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে একযোগে হামলার পর রাখাইনে সামরিক অভিযান জোরদার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এ অভিযান শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আগে থেকেই বাংলাদেশে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা ছিল। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারকে আহ্বান জানাচ্ছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি ঘোষণা দেন, ১৯৯২ সালের যৌথ ঘোষণার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তি পরিবর্তনে খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।






















