আজ থেকে ৪৪ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর যে শিশুটি জন্মেছিল, আজ সে জীবনের মধ্যগগনে বয়সের সবচেয়ে সুন্দর সময়ে অবস্থান করছে। তার জন্মের মাত্র চার বছর আট মাস আগে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় এ দেশে। পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে মাত্র নয় মাসে যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এখানে যোগসূত্র স্থাপনের জন্য একটুখানি পেছনে ফিরে দেখা প্রয়োজন। আমরা জানি, ১৯৪৭-এর পর থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মানুষদের শাসন করেছে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে। শোষণ করেছে ঔপনিবেশিক কায়দায় প্রজা ও প্রভুর মতো আচরণ করে।
কিন্তু এ দেশের সচেতন মানুষ এবং তরুণ সমাজ এ আচরণ মেনে নিতে পারেনি। ফলে সব মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য শুরু হয় বহুমাত্রিক চিন্তাভাবনা ও আন্দোলন। বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২৩ বছরে স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয় বাংলার মানুষের প্রাণের সংগ্রাম। এ দীর্ঘ সময়ে বাঙালির মুক্তির প্রশ্নে বহু মানুষের বিচক্ষণ কর্মতৎপরতা, নেতৃত্ব, চিন্তাভাবনার অসামান্য ভূমিকা বিশেষ অবদান রেখেছে। এ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালির কণ্ঠস্বর। তিনি ও তার দল আওয়ামী লীগ ভরসার স্থল হিসেবে বাংলার মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

১৯৬৬ সালে বাংলার মানুষের বাঁচার দাবি ৬ দফা পেশ করেন বঙ্গবন্ধু মুজিব। নেমে আসে জেল-জুলুমসহ নানা রকম ষড়যন্ত্র। মানুষ তখন ঐক্যবদ্ধ। বুঝে ফেলেছে, দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসকদের বুঝিয়ে দেয়, মানুষ জাগ্রত। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয় ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন দিতে। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ। স্বাভাবিক নিয়মে বিজয় অর্জনকারী দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়ার জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে পাকিস্তানের সেনাশাসকরা শুরু করে ষড়যন্ত্র। দেখাতে থাকে যুক্তিহীন বিভিন্ন অজুহাত।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ উত্তাল ঐক্যবদ্ধ জনতা এবং দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সামনে সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি তুলে ধরে তার ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সমন্বয়ে চলতে থাকে আলোচনা, যেন নির্বাচনী রায় মেনে নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
২৩ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম-আন্দোলনে সারা দেশে যেমন, তেমনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কিছু নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশ্বস্ত সহচর সহকর্মী। তাদের মধ্যে সেই সময় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড হিসেবে সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ (যিনি পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম) পরিচিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যখন সফল আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, একইসঙ্গে চলছে আলোচনা, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহতম নজির স্থাপন করে গণহত্যার এক পূর্বপরিকল্পিত কর্মসূচি নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে নিরীহ সাধারণ মানুষ হত্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
১৯৭১-এর সেই চরম মুহূর্তে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা মুক্তির কণ্ঠস্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে জনগণের পবিত্র আমানত হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদায় গ্রহণ করে আইনানুগভাবে রাজনৈতিক সরকার গঠন করে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন করার অসামান্য দক্ষতা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন বিশেষভাবে জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান।
পকিস্তান বাহিনীর তাণ্ডবে দেশ ছেড়ে এক কোটি মানুষ আশ্রয় নেয় ভারতে। তাদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্র, খাদ্য, পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রচার-প্রচারণা, প্রতি মুহূর্তের বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভিন্ন দেশ ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণ করেও নিজ দেশের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা, দেশের ভেতরের মানুষের মনোবল আটুট রাখতে, বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে প্রচার ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সমর্থনসহ যুদ্ধকে সফল করতে আরও খুঁটিনাটি যেসব ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হয়- তার সব কৃতিত্ব গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের।
এ সরকারকে মোকাবেলা করতে হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তও। দলের ভেতরে থাকা খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং অন্য আরও কয়েকজন পদে পদে মুক্তিযুদ্ধকে বানচাল করতে চেয়েছেন। পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্য এতটাই বেশি ছিল যে, সারা বাংলার মাঠ-প্রান্তর যখন এ দেশের নিরীহ মুক্তিপাগল মানুষের রক্তে রঞ্জিত, তখন তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ধি করতে চেয়েছেন। কিন্তু সৌভাগ্য, সেসব ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে যায়। যারা মানুষের মঙ্গল চায় না, তারা স্তুতি-চাটুকারিতায় ভালো পারদর্শী হয়।
স্পর্শকাতর বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে যে, মনে হবে তার কথাই সঠিক। খন্দকার মোশতাক তেমনই এক খেলা খেলতে সচেষ্ট ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে যুদ্ধের চরম মুহূর্তে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন, মুজিবকে ফিরে পেতে চাইলে স্বাধীনতা নয়। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকেও চাই, স্বাধীনতাও চাই। স্বাধীনতা পেলেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাব।
বিজনেস বাংলাদেশ-বি/এইচ


























