পোশাক কারখানায় চার বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর এলাকার রোজ ফ্যাশন লিমিটেডে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি নেন মোহাম্মদ লিয়াকত আলী। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে কারখানা থেকে বের করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এই কারখানায় যাদের চাকরির বয়স এক বছরের কম তাদেরও একইভাবে বের করে দেওয়া হয়। কারখানাটির শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
লিয়াকত আলী বলেন, মার্চের বেতন দিয়ে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ভাড়া ও সংসার খরচ করে এখন আমার হাত শূন্য। স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে পড়ে গেছি। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা আমার বাড়ি। সেখানে বাবা-মা থাকেন। চাকরি করে এ মাসে বাবা-মার জন্য টাকা পাঠাতে পারিনি; বরং বাসা ভাড়ার জন্য আটদিন আগে বাবার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিলাম। বাবা আমাকে টাকা পাঠানোর জন্য ধার করেছেন। কিন্তু বাড়ির আশপাশে বিকাশ, মোবাইল ব্যাংকিং বা অন্য কোনও সুযোগ না থাকায় টাকা পাঠাতে পারেননি। মনিপুরে ভাড়া বাসায় থেকে কাউকে কিছু বলতেও পারছি না।
তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ পরিচয়পত্র রেখে দেওয়ায়, আমি যে কোথাও গার্মেন্টসের স্টাফ ছিলাম এমন পরিচয়ও দিতে পারছি না। ফলে পোশাক শ্রমিকদের সরকারি সুবিধা দেওয়া হলেও সেখান থেকেও বাদ পড়তে হচ্ছে আমাকে। এভাবে আরও মাস খানেক দেশ লকডাউনে থাকলে করোনাভাইরাসের আক্রমণের আগে না খেয়ে সপরিবারে মরতে হবে।
তার অপর সহকর্মী কাটিং সহকারী স্থানীয় মনিপুর এলাকার বাসিন্দা জুয়েল বলেন, স্ত্রী, এক বছরের কন্যা, এক ভাই, দুই বোন ও মাসহ ৬ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করি আমি। বাবা মারা যায় দুই বছর আগে। চাকরির বয়স এক বছরের কম হওয়ায় এবং পরিচয়পত্র রেখে কারখানা থেকে বিদায় করে দেওয়ায় বেশি অসুবিধায় পড়েছি। দুটি ঘর পোশাক কর্মীদের কাছে ভাড়া দেওয়া। তারাও মার্চের ভাড়া পরিশোধ করে চলে গেছে। চাকরি ছাড়া জীবিকার অন্য কোনও উপায় নেই। এমন অবস্থায় কীভাবে চলবো তা নিয়ে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটছে।
একই কারখানার সিনিয়র সুইং অপারেটর রায়হানের বাড়ি রংপুর জেলায়। তিনি বলেন, সাড়ে আট বছর চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে ৫ মার্চ কারখানাটিতে যোগদান করি। আমার কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে মার্চের সাড়ে ৯ হাজার টাকা বেতন দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। বাড়িভাড়া দিয়ে গ্রামে এক বোন ও বাবা-মায়ের জন্য অল্প কিছু টাকা পাঠিয়ে জীবিন চলতো। এখন শুধুই
অন্ধকার দেখছি। পোশাক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা করোনা প্রাদুর্ভাব কেটে যাওয়ার পর নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু ওই পর্যন্ত বেঁচে থাকবো কিনা জানি না।
কর্তৃপক্ষ তাদের ২২ এপ্রিল বকেয়া বেতন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাড়িওয়ালা, দোকান মালিক বকেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে মানুষ থাকে ঘরে বন্দি, আর আমাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের সড়ক অবরোধ ও আন্দোলন করে মালিকদের কাছ থেকে পারিশ্রমিকের স্বীকৃতি আদায় করতে হয়।’
এ ব্যাপারে জানতে রোজ ফ্যাশন লিমিটেডের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক ফারহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বিজনেস বাংলা / আতিক


























